kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এশিয়ার সেরা সামাজিক উদ্যোক্তা

আমাদের ওসামা

আমাদের ওসামা বিন নূর ফোর্বস ম্যাগাজিনের বিচারে এশিয়ার ষষ্ঠ তরুণ সামাজিক উদ্যোক্তা নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁকে নিয়ে বিবিসি প্রামাণ্যচিত্র বানিয়েছে। জুন মাসে তিনি ব্রিটেনের রানির হাত থেকে ‘কুইনস ইয়াং লিডার অ্যাওয়ার্ড’ নেবেন। সবই তাঁর একটি অনন্য উদ্যোগের ফল। সেটিই জানাচ্ছেন নাদিম মজিদ। ছবি তুলেছেন তারেক আজিজ নিশক

২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আমাদের ওসামা

মাত্রই ঘুম ভেঙেছে। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে মোবাইলে ফেসবুক খুললেন।

খুলেই অবাক হয়ে গেলেন ওসামা বিন নূর। শুভেচ্ছাবাণীতে ভরে গেছে তাঁর টাইমলাইন—ফোর্বস ম্যাগাজিনের অনূর্ধ্ব-৩০ ৩০ জন সামাজিক উদ্যোক্তার একজন হয়েছেন তিনি! ২৪ ফেব্রুয়ারি ফোর্বসের ওয়েবসাইটের শিক্ষা বিভাগে প্রকাশিত সেই নিবন্ধের শিরোনামটির বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘বিশ্বকে বাঁচাতে প্রস্তুত ৩০ বছরের কম বয়সী এশিয়ার ৩০ সামাজিক উদ্যোক্তার সঙ্গে পরিচিত হোন। ’ তাঁদের সম্পর্কে ফোর্বস আরো লিখেছে, ‘এই তরুণরা যেভাবে তাঁদের কাজের মাধ্যমে এশিয়া ও সারা বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছেন, সে জন্য তাঁদের সম্মান জানাচ্ছি। ’ সেই তালিকায় আমাদের ওসামা ৬ নম্বরে!

যে কাজের জন্য আপডেট ডেন্টাল কলেজের ২৫ বছরের এই তরুণের এমন স্বীকৃতি, সেটি একটি ওয়েবসাইট। নাম ‘ইয়ুথ অপরচুনিটিজ’। বছর তিনেক আগে শুরু হওয়া এ সাইটের প্রাণপুরুষ হিসেবে তাঁকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছে বিবিসি। তিনি ‘কুইনস ইয়াং লিডার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। এ বছরের জুনে বার্মিংহাম প্রাসাদে তাঁর হাতে সম্মাননাটি তুলে দেবেন ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ।

অথচ কোনো দিনও অনলাইনে কাজ করবেন ভাবেননি ওসামা। চেয়েছিলেন, বিমান চালাবেন। তবে সেটি হলো না বলে ডেন্টালে ভর্তি হলেন। আড্ডা, লেখাপড়া নিয়ে ভালোই কাটছিল। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন সংস্থায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতেন। কাজ করতে করতে তাঁর মনে হলো, নিজেকে আরো দক্ষ করে তুলতে হবে, যোগাযোগদক্ষতা বাড়াতে হবে, নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরি করতে হবে। সে জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিলের অ্যাকটিভ সিটিজেন প্রোগ্রামে অংশ নিলেন। বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের চার মাসের প্রশিক্ষণও নেওয়া হলো। এর বাইরে ২০১১ সালে ভারতে সাউথ এশিয়ান ইয়ুথ কনফারেন্সে গিয়েও তরুণদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হলো। দেখলেন, বিশ্ব সম্পর্কে তারা কতটা জানে, ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য তাদের কত দারুণ দারুণ পরিকল্পনা আছে! তখনই তাঁর খেয়াল হলো, ‘আমি জানতামই না অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলে উচ্চ মাধ্যমিকে গণিত থাকতে হয়। সেটি না থাকায় তো আবেদনই করতে পারিনি। ’

দেশে ফেরার পরই জীবনের লক্ষ্য তাঁর বদলে গেল। অনেকের সঙ্গে তরুণদের নিয়ে কাজ করার কথা শেয়ার করলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর ছাত্র মাকসুদুল আলম, ভারতের কয়েকজন বন্ধু সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। তাঁদের সবার দেওয়া তথ্য সহায়তা নিয়ে ২০১২ সালে চালু হলো ‘ইয়ুথ অপরচুনিটিজ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ, যেখানে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘেঁটে তাঁরা শিক্ষা বৃত্তি, সেমিনার-কনফারেন্স, সম্মাননা ইত্যাদি শিক্ষামূলক তথ্য দিতে শুরু করলেন। কাজ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে দেখলেন, ফেসবুকে তাঁদের পোস্টগুলো খুব শেয়ার হচ্ছে। পেজ চালু করার দেড় বছরের মাথায় ৫০ হাজার লাইক হলো। তবে ওসামা খেয়াল করলেন, লাইকারদের মধ্যে বেশির ভাগই ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার; বাংলাদেশ আছে ৭ নম্বরে। এর পর থেকে কোনো একটি বিশেষ দেশের ছেলেমেয়েদের জন্য কোনো সুযোগ এলে সেটি না দিয়ে বরং কয়েকটি দেশের ছেলেমেয়েরা অংশ নিতে পারবে—এমন সব তথ্য দিতে লাগলেন। ফলে পেজটি আরো জনপ্রিয় হয়ে গেল। একটি ওয়েবসাইট তৈরির কথাও ভাবতে শুরু করলেন ওসামা। পাঁচ হাজার টাকা ধার করে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে চালু করলেন www.youthop.com| । সেটিও কিছুদিনের মধ্যে খুব জনপ্রিয়তা পেয়ে গেল। ভিজিটরদের চাপ সামলাতে না পেরে সাইট ডাউন হয়ে গেল এবং পরে সেটি ঠিকঠাক করে চালু করতে হলো। কিছুদিনের মধ্যে ভিজিটরের চাপ সামলাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই আশরাফুল আমিনের সাহায্যে এটির নিজস্ব সার্ভার কেনা হলো। এর পরের গল্প কেবল সাফল্যের। গুগল অ্যাডসেন্সের তিন মাসের পর্যবেক্ষণের পর তাদের দেওয়া টাকায় ওয়েবসাইট বানানোর খরচ, সার্ভারের টাকা—সব শোধ করে দিলেন ওসামা। এই শিক্ষাবিষয়ক ওয়েবসাইটের লক্ষ্য কী? ওসামা বিন নূর বলেন, ‘আমাদের এই সাইট আসলে সারা বিশ্বের তরুণদের নানা ধরনের সুযোগ নেওয়ার একটি মঞ্চ, যেখানে তাঁরা নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রকাশ ঘটাতে পারবেন। পাশাপাশি ক্যারিয়ারের উন্নতি করার জন্য নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মাধ্যমে তাঁদের তৈরি হওয়ারও সুযোগ থাকছে। মোট কথা, আমরা তরুণ ও আগামী দিনের সুন্দর পৃথিবীর মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করি। কারণ তাদের হাত ধরেই তো বিশ্বটি বদলে যাবে। ’

www.youthop.com ওয়েবসাইটে গেলে দেখবেন, সেখানে মোট আটটি বিভাগ আছে। এগুলো হলো, কম্পিটিশনস, কনফারেন্স, এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামস, ফেলোশিপস, ইন্টার্নশিপস, স্কলারশিপস ও অন্যান্য। বিভাগগুলোতে গেলে জানবেন বিস্তারিত। যেমন, ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ লিডারশিপ কনফারেন্স ২০১৬ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে হবে—এই খবরের শুরুতেই আছে কোন সময়ের মধ্যে আবেদন করতে হবে, পরে আছে সেটি কোন জায়গায় হবে সে কথা। এরপর আছে এতে অংশ নিলে কী লাভ হবে, যেমন—সারা বিশ্বের তরুণদের সপ্তাহব্যাপী একটি অভিজ্ঞতা বিনিময়ের এই কনফারেন্সে নেতৃত্বের দক্ষতা, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়, বক্তব্যদান, সম্পর্ক তৈরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নতি হবে। এরপর আছে সেখানে অংশ নেওয়ার জন্য কী কী যোগ্যতা লাগবে। তারপর আছে কিভাবে আবেদন করতে হবে। এরপর আয়োজক কারা, সব শেষে আয়োজকদের ওয়েবসাইটের ঠিকানা। এভাবে বিশ্বের যেখানে তরুণদের জন্য যা কিছু সুযোগ আছে, সেটি তুলে ধরছেন তাঁরা। যেমন—পর্তুগালের লিসবনে সামার ভলান্টিয়ার প্রোগ্রামের আবেদনপত্র চাওয়া হয়েছে—এই খবরটি এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামস বিভাগে আছে। ইন্টার্নশিপস বিভাগে আছে ইউরোপিয়ান কমিশন তাদের প্রতিষ্ঠানে পাঁচ মাস ট্রেইনি হিসেবে কাজ করার আবেদনপত্র চেয়েছে। সেখানে তারা প্রশিক্ষণার্থীদের টাকাও দেবে। স্কলারশিপস বিভাগে আছে, আজারবাইজানের খাজার বিশ্ববিদ্যালয়ে যেকোনো দেশের শিক্ষার্থীরা স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডির জন্য আবেদন করতে পারবেন। সারা বিশ্বের ছাত্রছাত্রী ও তরুণদের মধ্যে সাড়া ফেলে দেওয়া এই ওয়েবসাইটের নেপথ্য নায়ক তিনজন—ওসামা তো আছেনই, বাকি দুজন হলেন আইবিএর গ্র্যাজুয়েট মাকসুদুল আলম ও লন্ডন স্কুল অব ল থেকে এলএলবি পাস করা মুনতাকা খান।   ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ওসামা বলেন, ‘পড়ালেখা শেষ করে তরুণদের নিয়ে আরো কাজ করতে চাই। ’ এর বাইরে তিনি কালারস এফএমের রেডিও শো ‘টিন টেক্কা’র উপস্থাপক। সেখানেও তিনি তরুণদের সমস্যা ও সমাধান নিয়ে কথা বলেন।


মন্তব্য