kalerkantho


কলেজ লাইফ

জয়নুল আবেদিন বললেন, ‘যেটা আমি পারি নাই, তোমরা পেরেছ।’

হাশেম খান

২৫ নভেম্বর, ২০১৫ ০০:০০



জয়নুল আবেদিন বললেন, ‘যেটা আমি পারি নাই, তোমরা পেরেছ।’

 

চারুকলায় আমাদের সঙ্গে মেয়ে ছিল তিনজন-আফরোজা, এডরিন মালাকার ও গুলশান। ছেলেমেয়েদের ভিন্ন ভিন্ন ক্লাস হতো।

এটা হলো ১৯৫৬ সালের কথা। বর্তমান যে চারুকলা ভবনটি, তখন তৈরি হয়নি। আমরা ভর্তি হয়েছিলাম সেগুনবাগিচায়, একটি ভাড়া বাড়িতে। সেখানে ছয় মাস ক্লাস করলাম। মেয়েদের ক্লাস ভিন্ন ছেলেদের ক্লাস ভিন্ন। ভাবলাম, একই ক্লাসে পড়ি, এটা কী করে হয়! আমি আর আমার বন্ধু সুরঞ্জন দত্ত মিলে একটা ফন্দি আঁটলাম। পাশের কামরাতেই হচ্ছে মেয়েদের ক্লাস। আমরা ছেলে বিশ জন আর তিনটি মাত্র মেয়ে। দুই রুমের মাঝখানে একটা দরজা ছিল। দরজাটা একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ওদের চেহারা কিছু দেখি না, কোনো আলাপও হয় না। অথচ একই শিক্ষক ক্লাস নেন। আমি আর সুরঞ্জন দরজার কড়াটি ছুরি দিয়ে কেটে কেটে দীর্ঘ এক মাসে একেবারে বড় করে ফেললাম। একদিন টিফিন আওয়ারে সবাই যখন ক্লাস থেকে চলে গেল, তখন আমি আর সুরঞ্জন ওই ক্লাসেই টিফিন করব এমন ভাব দেখিয়ে থেকে গেলাম। চোখ রাখলাম ওই ছিদ্রটিতেÑমেয়েরা ক্লাসে কী করে দেখার জন্য। কিছু দেখা যায় না। হঠাৎ দেখি কী পিটপিট করছে। মানে ওপাশে আরেকটা চোখ। তখন আমিও সরলাম, সেও আমার আগে একটু সরে গেল। একটা মেয়ে বলে উঠলÑ‘এইরে, দেখ দেখ ওরা দেখতেছে। ’ আমি আর সুরঞ্জন তখন পড়িমড়ি করে পালাচ্ছি। রুম থেকে বের হতেই একই বেলকনি। দেখলাম ওরাও বের হয়েছে। ওরাও হেসে ফেলল, আমরাও। বলল, ‘ও, তোমরা দুজন। ’ ওদের হাসিতে আমাদের ভয়টা চলে গেল। যাক, কমপ্লেন হবে না। এরপর ওরাই বলল, ‘কী অবস্থা দেখ তো! আমরা কেউ কাউরে চিনি না অথচ একই ক্লাসে পড়ি, কোনো আলাপ হয় না। ’ আমি বললাম, ‘আমরা কিন্তু অনেক দিন ধরে এটা ভাবছি যে তোমরা কী করো। ’ খুব মজা হলো ওই অভিজ্ঞতায় এবং পরবর্তী সময়ে আমরা খানিকটা এগোলাম বন্ধুত্বের দিকে।

১৯৫৭ সালে যখন আমরা বর্তমান চারুকলা ইনস্টিটিউটে চলে এলাম, তখন প্রথম দিন আমাদের ক্লাস নিলেন বিখ্যাত শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া। খুব সহজ-সরল মানুষ। এখানে দুই রুম পাওয়া গেল না। তিনি একটা রুমকেই ব্ল্যাকবোর্ড দিয়ে আলাদা করে দিলেন। মেয়েরা একদিকে কাজ করবে, আমরা অন্যদিকে। ব্ল্যাকবোর্ডে ড্রয়িং ক্লাস ছিল। সেখানে আমরা একেকটা ব্ল্যাকবোর্ডে দুইজন কাজ করি আর ওরা তিনজন। ব্ল্যাকবোর্ড আস্তে আস্তে চাপিয়ে চাপিয়ে ওদেরকে দেয়ালের দিকে চাপিয়ে দিতাম। ওরা দেয়ালে প্রায় ঠেকে যেত। বলত, ‘তোরা, কী করিস?’ বলতাম, ‘কী করব, ব্ল্যাকবোর্ডটা সরে যাচ্ছে। ’ এটা আবার কিবরিয়া স্যারকে বলত, ‘প্রবলেম হয় স্যার, একসঙ্গে ক্লাস হোক না। ’ স্যার বলতেন, ‘না না, একসঙ্গে ক্লাস হবে না। নিয়ম যা, তাই হবে। ’ এর পরের ক্লাসেও তেমন হলো। দেখে আঁকার জন্য আমাদের কোনো একটা মডেল দিতেন স্যার। সেটার চারপাশ ঘিরে আঁকতে হতো। দুটো মডেল দিলেন স্যার। একটা ছেলেদের জন্য আরেকটা মেয়েদের। আমরা ছেলেমেয়েরা মিলে ফন্দি করলাম পরদিন এক ঘণ্টা আগে আসব ক্লাসে। সব সরিয়ে ফেলে ছবি আঁকার ডঙ্কিগুলো এমনভাবে সাজাব যেন ছেলে আর মেয়েদের একসঙ্গে কাজ করতে হয়। কিবরিয়া স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। দেখলেন কোথায় পার্টিশন, কোথায় কী! ওগুলো আমরা দেয়ালের সঙ্গে লাগিয়ে রেখেছি। মেয়েরা একদিকে আমরা আরেকদিকে-একসঙ্গে বসে আছি। স্যার বললেন, ‘এটা কে করল?’ সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। স্যার নিজেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে অফিসে চলে গেলেন। চারুকলার বিল্ডিংগুলো একটু অন্যরকম। নিচের দিকে একটু ফাঁকা। আমরা দেখলাম চার জোড়া পা খুব দ্রুত ক্লাসের দিকে আসছে। পা দেখেই বুঝলাম প্রথমটা আনোয়ারুল হক, খুব কড়া শিক্ষক। এরপর জয়নুল আবেদিন, শফিকুল আমিন, এরপর একটু পেছনে কিবরিয়া স্যার। আনোয়ার সাহেব খুব রেগে বললেন, ‘কী ব্যাপার, এসব কে করল? তোমরা শিক্ষকদের কাজে হাত দিচ্ছ কী জন্য? তোমাদের সবার শাস্তি হবে। ’ আমরা স্তব্ধ। জয়নুল আবেদিন অন্যরকম মানুষ। তিনি একটু নরম গলায় বললেন, ‘আনোয়ার সাহেব, ঠিক আছে, আমি একটু দেখি। ’ আনোয়ার স্যার খুব কড়া ছিলেন। বললেন, ‘দেখেন, কিন্তু আশকারা দিয়েন না। ’ জয়নুল স্যার বললেন, ‘দেখ, এখন তো ধর্মভিত্তিক দেশ। আমাদের আর্ট কলেজের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। শাসকরাও চায় না যে আর্ট কলেজ হোক। এরপর ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে ক্লাস করছে এই খবরটা যদি তাদের কাছে যায়, শেষে কি না আর্ট কলেজই বন্ধ করে দেয়। তোমরা এটা আমাদের জানালে না কেন? আমরা বিষয়টা অন্যভাবে অ্যারেঞ্জ করতাম। ’ তখন আনোয়ার স্যার বললেন, ‘কে করেছে বল, তোমাদের লিডার কে?’ তখন তিনজন মেয়ে এগিয়ে বলল, ‘এখানে কেউ লিডার নেই। আমরা তিনজনই চেয়েছি, এই ভাইদের সঙ্গে মিলেমিশে একসঙ্গে কাজ করব। ’ জয়নুল আবেদিন বললেন, ‘বাহ্, ব্যাপারটা খুব ভালো। যাই হোক, আমরা আগে বিষয়গুলো জানলে সবদিক সামাল দেওয়া যায়। এখন এক কাজ করুন আনোয়ার সাহেব, ঠিক আছে ওরা যখন এটা করেই ফেলেছে, কী আর করা। ’ আনোয়ার স্যার বললেন, ‘না না না, শাস্তি দিতে হবে। নিজেরা নিজেদের হাতে ডিসিপ্লিন নেবে এটা হয় না। চারুকলা চালানো কী এত সহজ ব্যাপার! পুরো পুরুষসমাজ আমাদের বিরুদ্ধে, প্রশাসন আমাদের বিরুদ্ধে। ’ তখন মেয়েরা আবার বলল, ‘স্যার, ছেলেদের কোনো দোষ নেই। সব আমরা চেয়েছি। ’ তিনি বললেন, ‘তোমরা চাইলেই তো হবে না। এখন যদি তোমাদের আমরা শাস্তি দিই?’ ওরা বলল, ‘আমাদের শাস্তি দিন স্যার। ওরা আমাদের ভাই, আমরা ওদের বোন। ভাই-বোন মিলে কাজ করব, কোনো অসুবিধা হবে না, কোনো বদনাম হবে না, আমরা কথা দিচ্ছি। ’

সেই তিনটি মেয়ে সত্যি সত্যি অসাধারণ ভ‚মিকা রেখেছিল। পরে জয়নুল আবেদিন বিকেলে একা এসে বললেন, ‘যেটা আমি পারি নাই, সেটা তোমরা পেরেছ। ’ আমরা ক্ষমা চেয়ে নিলাম। সেই থেকে একসঙ্গে ক্লাস শুরু হয়ে গেল চারুকলায়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে ক্লাস হতো না, আমরা শুরু করেছিলাম এবং যেখানে আশীর্বাদ ছিল শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের।

শ্রুতলিখন : চন্দন চৌধুরী


মন্তব্য