kalerkantho


একুশ বছরে রাজকীয় সাফল্য

খুব অল্প সময়ের মধ্যে দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে স্কুলটি। অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলে এই সাফল্য রহস্যের উন্মোচন করেছেন শান্ত শাহরিআর

২৫ নভেম্বর, ২০১৫ ০০:০০



একুশ বছরে রাজকীয় সাফল্য

১৯৯৪ থেকে ২০১৫ সাল। সাফল্যের মুকুট এই একুশ বছরের পথচলাকে জাঁকজমকে ভরিয়ে রেখেছে রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের।

১৯৯৪ সালে অধ্যক্ষ কর্নেল (অব.) নুরুন নবীর নেতৃত্বে একজন উপাধ্যক্ষ এবং ২০ জন অনুষদ সদস্য নিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটি সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জমি দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। মাত্র ১৬৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু। বর্তমানে শিক্ষার্থী পাঁচ হাজার ৭৪০ জন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় দেশসেরা বিদ্যাপীঠ হয়েছে অনেকবার। প্রতিষ্ঠানের এই সাফল্য আর পাঠদান বিষয়ে জানালেন রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এম সালেহীন, এনডিসি, পিএসসি।

 

ভালো ফলের পেছনে

ভালো ফলের জন্য অন্য সব বিদ্যালয় বিভিন্ন স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপত্রের কথা বলে। তবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এম সালেহীন জানালেন, রাজউকের ভালো ফলের পেছনে অন্য কোনো রহস্য নেই।

রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মান তুলনামূলক ভালো। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকমণ্ডলীর সমন্বিত প্রচেষ্টা, কলেজের পরিবেশ, শৃঙ্খলা, পাঠদান পদ্ধতি, পরিচালনা পর্ষদের দিকনির্দেশনা ইত্যাদি ভালো ফলের পেছনে অবদান রাখছে। এ ছাড়া পূর্বসূরিদের ভালো ফল বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। ভালো ফলের কৃতিত্ব এই কলেজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার।

শুধু শিক্ষার্থীর মানই যথেষ্ট নয়

অনেকেই বলেন, ঢাকার নামি স্কুলগুলোতে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা পড়ে বলেই সেগুলোর ফল ভালো। এ ব্যাপারটা পুরোপুরি নাকচ করে দিলেন না ব্রিগেডিয়ার সালেহীন। তবে শুধু ভালো শিক্ষার্থী আর কোচিং কিংবা প্রাইভেট টিচিংই যদি ভালো ফলের জন্য যথেষ্ট হতো, তাহলে সবাই কেন ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হতে চায়। এখানে প্রতিযোগিতা করে ভর্তি হওয়ার কোনো দরকার ছিল না। যেকোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলেই হতো। ভালো ফলের জন্য আরো অনেক ব্যাপার আছে, যা একটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দিতে পারে। অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকদের ফলপ্রসূ পাঠদান, মানসম্মত প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্রের সঠিক মূল্যায়ন, দিকনির্দেশনা, নিবিড় পর্যবেক্ষণসহ অনেক বিষয় আছে, যা ভালো ফলের সহায়ক। আর রাজউক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সব শিক্ষার্থীই যে মেধাবী তা নয়। এখানে কোটার ভিত্তিতে কম মেধাবী শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়। তারাও ভালো ফল করছে। আরেকটা ব্যাপার উলে­খ করা প্রয়োজন। ছাত্রছাত্রীদের কোচিং সেন্টারে যাওয়ার প্রবণতাটা সম্পূর্ণ তাদের মনস্তাত্তি¡ক চাহিদা। নিয়মিত ক্লাস করে যদি কেউ বাড়িতে পড়াশোনা করে, তবে তার কোচিং সেন্টারে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। একটা কথা স্বীকার করতে হবে। বাংলাদেশের কোচিং সেন্টারগুলোতে পড়া বোঝানোর চেয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয় বেশি। এমনকি উত্তরপত্রগুলোও সঠিকভাবে বোর্ডের নিয়মানুযায়ী মূল্যায়ন করা হয় না।


পাঠদানে আধুনিক পদ্ধতি

স্কুল-কলেজে পাঠদানের আন্তর্জাতিক মান সামনে রেখে নিজের কর্মপদ্ধতি ঠিক করেছে রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিটি ক্লাসে শিক্ষাসহায়ক আধুনিক উপকরণ আছে। মাল্টিমিডিয়া বা অডিও ভিজুয়াল ডিভাইসের যথাযথ ব্যবহার শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগ্রহী করে তোলে। শ্রেণিকক্ষের যথাযথ ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কোনো বিষয়ের উপস্থাপনায় একজন শিক্ষার্থী কতটা বুদ্ধিদীপ্ত এবং সাবলীল তা লক্ষ রাখা হয়। মূল্যায়নের বিষয়টি এখানে দেখা হয় খুব সতর্কতার সঙ্গে।

বাড়তি বইয়ের চাপ নয়

ঢাকার অনেক স্কুলেই বোর্ড নির্ধারিত সিলেবাসের বাইরেও অনেক বই পড়তে দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের। বিষয়টিতে ঘোর আপত্তি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এম সালেহীনের। বাড়তি বই চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তিনি। তাঁর মতে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে দেওয়া পাঠ্য বইগুলোই যথেষ্ট। তিনি কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপে বিশ্বাস করেন না। তাঁর মতে, পড়াশোনার বাড়তি চাপে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রতিভা ব্যাহত হয়।

দুর্বল শিক্ষার্থী তত্ত্বাবধান

ক্লাসের ভালো ছেলেটিকে টার্গেট করে স্কুলে ভালো ফল নিয়ে আসা-এমন কাজের বিপক্ষে রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। মেধাবী শিক্ষর্থীকে টার্গেট না করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা কম মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিবিড়ভাবে পরিচর্যা করা হয়। এ ছাড়া নির্দিষ্টসংখ্যক কিছু শিক্ষার্থী একজন করে শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে থাকে। এতে করে দুর্বল শিক্ষার্থীরা যেকোনো সমস্যা জানাতে পারে শিক্ষককে। এভাবে ওরা উপকৃত হয়। তবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর চেষ্টাটা হতে হবে নিজের।

দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা

উত্তরার মতো ব্যয়বহুল আবাসিক এলাকার নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এটি। তাই বলে রাজউক উত্তরা স্কুল অ্যান্ড কলেজে শুধু ধনী পরিবারের ছেলেমেয়েরাই পড়ে তা নয়। এ স্কুলে অনেক শিক্ষার্থী আছে, যারা নিæ আয়ের পরিবার থেকে এসেছে। তাদের আর্থিক সহায়তা এবং শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হয় স্কুল থেকে।

সফলতা সবার

সফলতা ব্যাপারটা ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে দেখেন না ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এম সালেহীন। তাঁর মতে, সফলতা প্রতিষ্ঠানের। আর প্রতিষ্ঠান বলতে এখানে মূলত শিক্ষার্থী, শিক্ষকমণ্ডলী, অভিভাবক আর এসব কিছুর পেছনে বা পর্দার অন্তরালে যাঁরা কাজ করছেন অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় আজ প্রতিষ্ঠান সফল। আর সেই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হিসেবে এই সফলতাকে তিনি সবার গর্ব হিসেবে দেখেন। ভালো ফল করার জন্য এগুলোই যথেষ্ট। এ বছর এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রস্তুতিমূলক ক্লাসের পরিকল্পনা করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এতে করে শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারের পেছনে দৌড়িয়ে সময় ও অর্থ অপচয় করবে না বলে তাঁর বিশ্বাস। তিনি নিজেকে একজন সফল প্রিন্সিপাল তখনই মনে করবেন, যখন দেখবেন তাঁর ছাত্রছাত্রীরা একেকজন সুনাগরিক হিসেবে দেশ ও জাতির জন্য অবদান রাখছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বর্তমান মানকে ধরে রেখে অতীতের ভুলত্রুটিগুলো সংশোধন করে সামনে এগোতে চান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এম সালেহীন। এ কাজ ভালোভাবে করতে পারলে ফল আরো ভালো হবে বলে আশাবাদ তাঁর। আজকের এই শিক্ষার্থীরা জাতি ও সমাজের কাছে নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত ও সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলে দেশকে যাতে ভালো কিছু দিতে পারে এমন মানুষ গড়ার দিকেই নজর তাঁর। ছাত্রছাত্রীদের প্রতি তাঁর পরামর্শ হলো-মানুষ হওয়ার জন্য শুধু পড়াশোনাই সব কিছু নয়। নিজের বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ খুব গুরুত্বপূর্ণ। সহশিক্ষা কার্যক্রমকে একইভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। একজন শিক্ষার্থীর মেধাকে শুধু পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তার প্রতিভার যথাযথ বিকাশ ঘটানোর জন্য সব সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। তিনি চান শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ বিকশিত হোক। যেহেতু সামনে এসএসসি আর এইচএসসি পরীক্ষা, সে জন্য অভিভাবকদের ছোট একটি পরামর্শ দিতে চান তিনি। একাধিক কোচিং সেন্টারে সন্তানদের না পাঠিয়ে বাসায় পড়াশোনার সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া উচিত। অভিভাবকরা নিজেরা ছেলেমেয়েদের গাইড করলে ভালো হয়। শিক্ষার্থীরা নিজেরা মডেল টেস্টের প্রশ্ন তৈরি করে পরীক্ষা দিতে পারে। কোচিং সেন্টারে পাঠানোর মাধ্যমে ভালো ফল করার জন্য সন্তানকে প্রতিযোগিতায় না নামিয়ে নিবিড় পরিচর্যা করা উচিত। সন্তানের মেধাই ভালো ফলের জন্য যথেষ্ট।

অধ্যক্ষ সালেহীন মনে করেন, একটি ভালো পরিকল্পনা যেকোনো কাজে সফলতা এনে দিতে পারে। রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এ ক্ষেত্রে ভালো উদাহরণ। বাংলাদেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্বেও সেগুলোর শিক্ষার্থীদের ফলাফল ভালো হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় বিষয়ের প্রতি লক্ষ রেখে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করলে পিছিয়ে পড়া স্কুল-কলেজও হতে পারবে রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো সফল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।


মন্তব্য