kalerkantho


অনেক কিছুর নওরীন

নওরীন মনির প্রমা বিতর্কে সেরা হয়েছেন, গানেও তা-ই। ছবি তুলে সাফল্য পেয়েছেন। কয়েকটি ভাষা জানেন। রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে ঘুরে এসেছেন ভারত। তাঁদের বন্ধুদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্কুলশিশুদের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দেয়। অনেক কিছুতে জড়িয়ে থাকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রীর গল্প শোনাচ্ছেন মুতাসিম বিল্লাহ নাসির। ছবি : শাটারবাগ

২৫ নভেম্বর, ২০১৫ ০০:০০



অনেক কিছুর নওরীন

জীবনের শুরুটাই হয়েছিল অন্যভাবে। মা-বাবা পিএইচডি করতে গিয়েছিলেন গ্রিসে।

সেখানেই প্রথম চারটি বছর কেটেছে। ফুটফুটে পুতুলের মতো একটি মেয়ে, কিন্ডারগার্র্টেন স্কুলে সবার আদরের। বাংলা নয়, আধো আধো গ্রিক বলে। সেই বন্ধুরা আজ অনেক বড়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। তাঁদের সঙ্গে ই-মেইল চালাচালি হয়, ফেসবুকেও কথা হয়। গ্রিক ভাষার কয়েকটি শব্দ এখনো মনে আছে। নতুন ভাষার প্রতি ভালোবাসাটিও আছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি ভাষার সার্টিফিকেট কোর্স করেছেন। এখন জার্মান শিখছেন।

নওরীন মনির প্রমা পড়েন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফার্মাসি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। মা-বাবা দুজনই শিক্ষক। বাবা ড. মনির উদ্দিন রসায়ন বিভাগে, মা ড. নুসরাত জাহান দর্শন বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁরা মেয়েকে নিজের মতো বেড়ে উঠতে দিয়েছেন। ফলে অনেক কিছুতে জড়িয়ে গেছেন নওরীন। ক্লাস টু থেকে নাইন পর্যন্ত টানা সাত বছর গান শিখেছেন। সবই গেয়েছেন, ভালোবেসেছেন রবীন্দ্রনাথের গান। ২০০৫ সালে হাটহাজারীতে জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতার ফোক গানে প্রথম হয়ে তাক লাগিয়ে দেন। গান এখনো গান, তবে প্রতিযোগিতায় নিয়মিত নন। গিটারও শিখেছেন।

ছবি তোলার শুরু ছোটবেলায়। তখন ক্লাস ফাইভ কি সিক্সে পড়েন। সামনের দেখা জিনিসটাকে কী অদ্ভুতভাবে চিরকালের মতো বন্দি করে রাখা যায়Ñব্যাপারটি অবাক করে দিত। মায়ের পুরনো অ্যানালগ ক্যামেরা নিয়ে ছবি তোলার শুরু। এসএসসি পাসের পর বৃত্তির টাকা দিয়ে একটি সনি সাইবার শট কিনলেন। এখনো সেই ক্যামেরাটি আছে। আর তোলা ছবিগুলোর মধ্যে বিশেষ কয়েকটি প্রদর্শিত হয়েছে দৃক, শিল্পকলা, ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটে। ২০১১ সালে দৃক গ্যালারিতে যে ইকোরাপস নামের প্রদর্শনী হয়েছিল, সেখানে ৮ নম্বর ছবিটি ছিল নওরীনেরÑআহারের জন্য মায়ের দিকে ঠোঁট ফাঁক করে আছে কয়েকটি ক্ষুধার্ত পাখির ছানা।  

খেলায়ও ভালো করেছেন নওরীন। চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। খেলা নিয়ে একটি কুইজেও প্রথম হয়েছেন। বিতর্ক করেন নিয়মিত। সে আগ্রহটি তৈরি করেছেন কলেজের ড. উদিতি দাস ম্যাডাম। প্রিয় ছাত্রীকে সব প্রতিযোগিতায় নিয়ে যেতেন, উৎসাহ দিতেন। ২০১০ সালে চট্টগ্রামে দৃষ্টি আয়োজিত আঞ্চলিক বিতর্কে সেরা বিতার্কিক হয়েছেন। বারোয়ারিতে দ্বিতীয়। এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং অর্গানাইজেশনের সক্রিয় সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুন শাখায়ও [মডেল ইউনাইটেড নেশন] কাজ করছেন। ফার্মাসি বিভাগের বন্ধুরা মিলে গড়ে তুলেছেন এইড অ্যান্ড ইন্সপিরেশন টু প্রোমোট সায়েন্স [এআইপিএস] নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার আশপাশের স্কুলে গেছেন। ছোট শিশুদের বিজ্ঞান ও গণিতের পাঠ্য বইয়ের মজার মজার বিষয় বোঝান তাঁরা। পরে কুইজের আয়োজন করেন, ছোট ছোট গবেষণা করেন সবাই মিলে। বিজ্ঞানের প্রতি ছেলেমেয়েদের ভালোবাসা বেড়ে যায়। ফিরে আসার সময় মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে আসেন, যাতে কোনো কিছু বুঝতে না পারলে তারা ফোন করতে পারে। ১০ জনের এই দলের একমাত্র উদ্দেশ্য-বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়া।

গেল মাসে ভারতের রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে সরকারি সফরে সে দেশ ঘুরেছেন। দেখা করেছেন প্রণব মুখার্জির সঙ্গে, ঘুরে বেড়িয়েছেন তাঁর বাসভবন। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে মরুভ‚মি আর উটের দেশ রাজস্থান। বিশাল পাগড়ি পরা, চওড়া গোঁফের মানুষগুলো খুব প্রাণখোলা, ফুর্তিবাজ। তারা উটকে জীবনের অংশ মনে করে, প্রেমিকার মতো সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখে। এই সফর তাঁর চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এত সব নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও অবসর ঠিকই বেরিয়ে আসে। তখন গল্পের বই পড়েন, কার্টুন আঁকেন।

লেখাপড়ায়ও ভীষণ ভালো নওরীন। শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৃত্তি পেয়েছেন। থার্ড ইয়ারে তাঁর সিজিপিএ ৩.৯৭। মা-বাবা এর কারণ, বললেন তিনি, ‘তাঁরা আমাকে শিখিয়েছেন, সব কিছুই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। কোনো কিছুতেই কখনো বারণ করেননি। ফলে যেকোনো কিছুই মন দিয়ে করার চেষ্টা করি। আর নানা আজহার উদ্দিন আহমেদ তো খুবই উৎসাহ দেন। ’ লেখাপড়া শেষে তিনি ক্যান্সার গবেষক হবেন।


মন্তব্য