kalerkantho

১১ বছরে পুঁজিবাজারে আসেনি ব্যাংক

রফিকুল ইসলাম    

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৩:০২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১১ বছরে পুঁজিবাজারে আসেনি ব্যাংক

পুঁজিবাজারে ব্যাংক মৌল ভিত্তির কম্পানি হিসেবে পরিচিত। কারণ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক থেকে ন্যূনতম ১০ শতাংশ লভ্যাংশ পায় শেয়ার গ্রাহক। একের পর এক সংখ্যা বাড়লেও নতুন ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে আসার আগ্রহ কম। ব্যাংক পরিচালনায় লাইসেন্স নেওয়ার সময় আইনের বাধ্যবাধকতা দিয়েও পুঁজিবাজারে আনা যাচ্ছে না। কিন্তু এই খাতের কম্পানির শেয়ারে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীর আস্থা বেশি থাকায় ব্যাংকের তালিকাভুক্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বর্তমানে দেশে ব্যাংকের সংখ্যা ৬২টি। কিন্তু কার্যক্রম চালু থাকা ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে সরকারি ব্যাংক ছয়টি, বিশেষায়িত ব্যাংক দুটি, বিদেশি ৯টি, বেসরকারি ৩২টি আর ইসলামী ব্যাংক আটটি। বাকি পাঁচটি ব্যাংক অনুমোদন পেলেও এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। সর্বশেষ ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনটি ব্যাংককে অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্র জানায়, দেশে ব্যাংকের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়লেও পুঁজিবাজারে আসার প্রবণতা খুবই কম। যদিও পুঁজিবাজারে ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীর আস্থা অন্যান্য কম্পানির তুলনায় বেশি। কারণ হিসেবে জানা যায়, বছর শেষে ব্যাংকগুলো ন্যূনতম ১০ শতাংশ বা কোনো কোনো ব্যাংক ১৫-২০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়ে থাকে। ব্যাংকে বর্তমানে সুদ হার কম হওয়ায় বছর শেষে আমানতকারী ৫-৬ শতাংশ মুনাফা পায়।

জানা যায়, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে পুঁজিবাজারে ৩০টি ব্যাংক তালিকাভুক্ত রয়েছে। এই ব্যাংকের মধ্যে মাত্র দুটি সরকারি ব্যাংক, এখনো সরকারি ও বিশেষায়িত মিলে ছয়টি ব্যাংক পুঁজিবাজারে আসেনি। সর্বশেষ ২০০৮ সালে একটি মাত্র ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়, অর্থাৎ এই সময়ের পর গত ১১ বছরে আর কোনো ব্যাংক পুঁজিবাজারে আসেনি। ২০০৭ সালে চারটি, ২০০৬ সালে একটি, ২০০৪ সালে তিনটি, ২০০১ সালে একটি, ২০০০ সালে পাঁচটি ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বাকি ১২টি ব্যাংক আশি ও নব্বইয়ের দশকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, নতুন ব্যাংক অনুমোদনের সময় কার্যক্রম শুরু করার তিন বছর পর পুঁজিবাজারে আসা বাধ্যতামূলক শর্ত রয়েছে। কিন্তু এই সময় পার হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদনের মাধ্যমে তিন বছর করে দুই দফায় ছয় বছর সময় বাড়িয়েছে ব্যাংকগুলো। বর্ধিত এই সময় চলতি বছরেই শেষ হবে। এ বছরই ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। ব্যাংকগুলোকে আর সময় বাড়িয়ে দেবে না বলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এক ডজনেরও বেশি নতুন ব্যাংক বাজারে এসেছে। ২০১২ সালে ৯টি নতুন ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন পায়। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০১৩ সালের বিভিন্ন সময়ে কার্যক্রম শুরু করে অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, নতুন ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরুর পর তিন বছরের মাথায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়। সেই হিসাবে ২০১৬ সালে নতুন ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে আসার কথা, কিন্তু অপারগতা প্রকাশ করে প্রথম দফায় তিন বছর সময় বাড়ানোর অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্ধিত এই তিন বছর শেষ হওয়ার মাথায় আবারও সময় বাড়ানোর আবেদন জানালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরো তিন বছর সময় বাড়িয়ে দেয়। সেই হিসাবে চলতি বছরের মধ্যেই বর্ধিত সময় শেষ হবে। আর এতে ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে আসার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পাবলিক রুলস-২০১৫ আইন অনুযায়ী, তিন বছর কার্যক্রম পরিচালনা বা উৎপাদনে রয়েছে এমন কম্পানি পুঁজিবাজার থেকে মূলধন উত্তোলন করতে পারবে। তবে কম্পানিকে মুনাফায় থাকতে হবে। তিন বছরের মধ্যে সর্বশেষ বছরেও কম্পানিটি মুনাফায় থাকলে মূলধন উত্তোলনে আবেদন করতে পারবে। কোনো কম্পানি পরিচালনা বা চালু করার পর তিন বছর না হলেও সর্বশেষ হিসাবে মুনাফা হয়েছে আর এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি কিন্তু মুনাফা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন কম্পানিও মূলধন উত্তোলনে আগ্রহ প্রকাশ করতে পারবে। কম্পানির পরিশোধিত মূলধন থাকতে হবে ৩০ কোটি টাকা।

ব্যাংক সূত্র জানায়, দেশে নতুন ব্যাংক পরিচালনা করতে হলে ৪০০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন থাকতে হয়। কিন্তু সর্বশেষ নতুন তিনটি ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার পর ব্যাংকগুলোর পরিশোধিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু নতুন ব্যাংকগুলোর কয়েকটি এখনো মুনাফার ধারায় ফিরতে পারেনি। আর্থিক অনিয়ম আর খেলাপি ঋণে ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে এগুলোর কয়েকটি ব্যাংক।

স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা যায়, পুঁজিবাজারে বাজার মূলধনে শীর্ষে রয়েছে ব্যাংক খাত। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত একক খাত হিসেবে ৩০টি ব্যাংকের বাজার মূলধন রয়েছে ৫৮ হাজার ৩১০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা মোট মূলধনের ১৭.৫৬ শতাংশ। দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে টেলিকম খাত। এই খাতে তালিকাভুক্ত কম্পানির বাজার মূলধন ৫১ হাজার ১৩৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যা মোট মূলধনের ১৫.৪০ শতাংশ। আর ওষুধ ও রসায়ন খাতের বাজার মূলধন ১৫.৩২ শতাংশ।

সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে ২৯টিই মুনাফা করেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকে বিনিয়োগকারীর আস্থা বেশি। আর্থিক খাতে মুদ্রাবাজারের সঙ্গে ব্যাংক সম্পর্কিত হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের যেকোনো সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজার প্রভাবিত হয়। ব্যাংক ভালো মুনাফা করলে ভালো লভ্যাংশও দেয়, যার জন্য বিনিয়োগকারীর আগ্রহ বেশি। নতুন ব্যাংক তালিকাভুক্ত হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু তাদের মুনাফায় ফিরতে হবে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মোস্তাক আহমেদ সাদেক বলেন, ‘পুঁজিবাজারে ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীর চাহিদা ভালো। নতুন ব্যাংকগুলো অনেকেই মুনাফায় যেতে পারেনি। এমনকি কয়েকটি ব্যাংক ব্রেক ইভেন পয়েন্টেও যায়নি, লোকসানেই রয়েছে। কিন্তু পুঁজিবাজারে আসতে হলে মুনাফার ধারায় থাকতে হবে। মুনাফা হওয়ার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারী ও পুঁজিবাজারের জন্যই ভালো হবে।’

মন্তব্য