kalerkantho


রেমন্ডের মালিকানা নিয়ে বাবা-ছেলের লড়াই

বাণিজ্য ডেস্ক   

৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৩:২১



রেমন্ডের মালিকানা নিয়ে বাবা-ছেলের লড়াই

বাবা বিজয়পাত সিংহানিয়া ও ছেলে গৌতম সিংহানিয়ার সেই মধুর সম্পর্ক এখন আর নেই

পোশাক ও ফ্যাশন কম্পানি রেমন্ডের বিশ্বজোড়া খ্যাতি কারো অজানা নয়। ভারতের পারিবারিক ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়া এ প্রতিষ্ঠানের বাজার রয়েছে বাংলাদেশেও। সেই প্রতিষ্ঠানটিতেই এবার কলঙ্কের তিলক লাগতে যাচ্ছে বাপ-ছেলের দ্বন্দ্বের জেরে।

বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শতকোটি ডলারের টেক্সটাইল সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ পরিবারেই রাখতে চেয়েছিলেন ভারতীয় শিল্পপতি বিজয়পাত সিংহানিয়া। সে কারণেই তিন বছর আগে নিজ পরিশ্রমে গড়া রেমন্ড গ্রুপের কর্তৃত্ব ছেলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এটি ছিল সন্তানের জন্য বাবার উপহার। কিন্তু এর পর থেকেই বাপ-ছেলের সম্পর্কে ফাটল ধরে। বাবা অভিযোগ করেন, ছেলে তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তাঁকে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট থেকে এবং শিষ্টাচারবহির্ভূতভাবে কম্পানি থেকেও বের করে দিয়েছে।

বিজয়পাত এখন নিজের সিদ্ধান্তের জন্য অনুতাপ করছেন। তাঁর দাবি সন্তানকে প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব দিয়েছিলেন আবেগতাড়িত হয়ে। এ ঘটনা ভারতের করপোরেট জগতে দীর্ঘ সময় থেকে হয়ে আসা পারিবারিক দ্বন্দ্বের আরেকটি চিত্র। ৮০ বছর বয়সী বিজয়পাত একটি ছোট টেক্সটাইল ব্যবসাকে ভারতের পারিবারিক ব্র্যান্ডে পরিণত করেছিলেন। এমনকি রেমন্ড গ্রুপের দাবি অনুযায়ী বর্তমানে পশমি সুতার স্যুট উৎপাদনের দিক থেকে তাঁরাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান।

দক্ষিণ এশিয়ায় ঐতিহ্যগতভাবে গড়ে ওঠা পারিবারিক ব্যবসার আরেকটি সাফল্যগাথা রচনা করেছিল এ প্রতিষ্ঠান। সিংহানিয়া পরিবারের ব্যবসা এখন সিমেন্ট, দুগ্ধপণ্য এবং প্রযুক্তি খাতেও বিস্তৃত। ক্রেডিট সুইসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী পারিবারিক মালিকানাধীন শিল্প গ্রুপের দিক থেকে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে ভারত। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পরই ভারতের অবস্থান। কিন্তু পরিবারগুলোর মধ্যে ন্যায্য অংশীদারত্বের দ্বন্দ্ব এবং নতুন প্রজন্মের কর্তৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা। এসব বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্যে আরো বেশি বৈশ্বিক করপোরেট মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি, যা করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করবে। এতে এ ধরনের দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলা সম্ভব হবে।

ভারতের আরো অনেক পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে অংশীদারত্বের লড়াই হয়েছিল। যার অন্যতম আম্বানি পরিবার। বর্তমানে শুধু ভারতের নয়, এশিয়ার শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানিও তাঁর ভাই অনিল আম্বানির সঙ্গে কয়েক বছর রিলায়েন্স গ্রুপের কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলেন। তাঁদের বাবা ধীরুভাই কোনো উইল ছাড়া মৃত্যুবরণ করায় এ সমস্যা তৈরি হয়।

ভারতের আরেক শিল্পপতি ওয়েভ গ্রুপের মালিক পন্টি চাধাকে তাঁর ভাই হারদিপ সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ২০১২ সালে গুলি করে হত্যা করেন। পারিবারিক ফার্মাসিউটিক্যাল কম্পানির মালিকানা নিয়ে বিলিয়নেয়ার শিভিন্দর এবং মলভিন্দর সিংহের মধ্যে একে অপরের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে।

বিজয়পাত সিংহানিয়ার ব্যাবসায়িক সাম্রাজ্যে সমস্যা শুরু হয় ২০১৫ সালে যখন তিনি ছেলে গৌতমের হাতে তাঁর ৩৭ শতাংশ অংশীদারত্ব হস্তান্তর করেন। যেটাকে তিনি ‘সবচেয়ে বড় নির্বুদ্ধিতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিজয়পাতের মতে, পারিবারিক দ্বন্দ্ব নিরসনে ২০০৭ সালের একটি চুক্তি অনুযায়ী তিনি মুম্বাইয়ের মালাবার হিল এলাকায় সিংহানিয়া পরিবারের ৩৬ তলার জেকে ভবনে একটি অ্যাপার্টমেন্ট পেয়েছিলেন। এর মূল্য ধরা হয়েছিল বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক কম। কিন্তু গৌতম র‌্যামন্ডের বোর্ডকে পরামর্শ দিয়েছেন ফ্ল্যাটটিকে যেন প্রতিষ্ঠানের মূল্যবান সম্পদ বিক্রি হিসেবে ধরা হয়।

তিক্ততা বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে রেমন্ড বোর্ড বিজয়পাতের ‘চেয়ারম্যান ইমেরিটাস’ উপাধি কেড়ে নেয়, কম্পানিকে দেওয়া চিঠিতে তিনি অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছেন এমন অভিযোগে। তিনি দাবি করেন, তাঁকে শারীরিকভাবে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর পদ ও ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিও চুরি করা হয়েছে।

বিজয়পাত বলেন, দুই বছর ধরে তিনি তাঁর ছেলের সঙ্গে কথা বলেন না। এখন আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার চিন্তা করছেন ছেলেকে দেওয়া সম্পত্তি ফিরিয়ে নিতে। ভারতের ২০০৭ সালের আইন অনুযায়ী সন্তান যদি মা-বাবার মৌলিক চাহিদা পূরণ না করে তবে তাঁদের দেওয়া উপহার ফিরিয়ে নিতে পারবেন। তিনি বলেন, ৯৩ বছরের পুরনো ব্যবসা রেমন্ড ছেলে গৌতমের হাতে তুলে দেওয়া ছিল তাঁর ‘সবচেয়ে বড় নির্বুদ্ধিতা’, যা থেকে এখন তাঁকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি সব মা-বাবাকে পরামর্শ দেব জীবদ্দশায় কখনো নিজের সব সঞ্চয় সন্তানের হাতে তুলে দেওয়ার মতো ভুল করবেন না।’ বাবার এসব অভিযোগের জবাবে রেমন্ডের চেয়ারম্যান ও সিইও গৌতম সিংহানিয়া বলেন, তিনি শুধু তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। ‘আমি সঠিক কাজটিই করেছি। সন্তান হিসেবে আমার যে দায়িত্ব রেমন্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব তা থেকে ভিন্ন। একজন বোর্ড সদস্য (বিজয়পাত) যিনি নিজের পদ ব্যবহার করে কম্পানির সম্পদ নিয়েছেন। আমি তার ভুক্তভোগী। তাহলে আমি কী দোষ করলাম?’

এ দ্বন্দ্বের প্রভাব অবশ্য রেমন্ডের ব্যবসায় এখনো পড়েনি। ২০১৮ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কম্পানির মুনাফা ৫০ শতাংশ বেড়েছে। সম্প্রতি ইথিওপিয়াতে একটি বড় কারখানাও চালু করেছে। বর্তমানে বিশ্বের ৫৫ দেশে পণ্য রপ্তানি করছে প্রতিষ্ঠানটি। এএফপি।



মন্তব্য