kalerkantho


‘সুশাসন নিশ্চিত না হলে রাজস্ব আদায়ের হার বাড়বে না’

ফ্ল্যাট বাড়িতে করদাতার সন্ধান চলছে এনবিআর চেয়ারম্যান

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ১৫:৫৫



‘সুশাসন নিশ্চিত না হলে রাজস্ব আদায়ের হার বাড়বে না’

সিপিডির সংলাপে এনবিআর চেয়ারম্যানসহ অন্য অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না। আর সুশাসন নিশ্চিত না হলে রাজস্ব আদায়ের হারও বাড়বে না। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশে নিযুক্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আবাসিক প্রতিনিধি রাগনার গুডমান্ডসন এবং মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি নিহাদ কবির।

অনুষ্ঠানে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। 

এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘কর আদায়ের হার বাড়ানোর চেষ্টা করছে এনবিআর। এর অংশ হিসেবে করদাতা বাড়াতে ঢাকার ফ্ল্যাট বাসায় খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।’

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দেশে সুশাসন জরুরি। সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন নেই। এ অবস্থায় সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না করে কর আদায়ে ন্যায়বিচারের কথা বলে কোনো লাভ নেই। দেশে বিদেশি সহায়তা নিয়ে কথা আসছে। বিদেশি ঋণ নেওয়া হবে না; এটি বলার সময় এখনো আসেনি। কারণ দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু করায় দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ স্থির হয়ে আছে।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশে বিদেশি সহায়তার বেশির ভাগই ব্যবহার হচ্ছে ভৌত অবকাঠামো খাতে। সে তুলনায় সামাজিক অবকাঠামো খাতে সহায়তার ব্যবহার একেবারে কমে গেছে। বিশেষ করে শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বিদেশি সহায়তার ব্যবহার কম।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিবছর বাজেটের আকার বাড়ছে। তার জন্য করের আওতা বাড়াতে হচ্ছে। করের আওতা বাড়ানোর একটি পরিকল্পনা নিয়েছে। ঢাকা শহরের যত ফ্ল্যাট ও বাড়ি আছে, এগুলো জরিপ করা হবে। এই ফ্ল্যাট ও বাড়ির মধ্যে থাকা ভাড়াটে ও ফ্ল্যাটের মালিকদের সবাইকে রিটার্নের মাধ্যমে আগামী ছয় মাসের মধ্যে করের আওতায় নিয়ে আসা হবে। তার জন্য একটি টিম কাজ করছে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে অফিসগুলো উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে। উপজেলার ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় লোকজনকে করের আওতায় আনা হবে।

তিনি বলেন, সরকার কাস্টমস, ভ্যাট এবং ট্যাক্স এই তিনটি উৎস থেকে রাজস্ব আহরণ করে। কিন্তু বিশ্বায়নের ফলে আগামীতে কাস্টমস ডিউটি কমবে। তাই আয়করের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আর করের আওতা বাড়ানোর জন্য রিটার্নধারীদের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, সারা দেশে এখন ই-টিআইয়েনের সংখ্যা ৩৫ লাখের বেশি। কিন্তু তার মধ্যে ২০ লাখ রিটার্ন দিচ্ছে না। কারণ, কর নিয়ে এক ধরনের ভয় আছে। তাই করদাতাবান্ধব এনবিআর গড়ে তোলার চেষ্টা করছি।

রাগনার গুডমান্ডসন বলেন, মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) বিপরীতে বাংলাদেশে কর আদায় একেবারে কম। জিডিপির অনুপাতে মাত্র ৯ শতাংশ কর আদায় হয়। দক্ষিণ এশিয়াতে এটি সর্বনিম্ন। ফলে কর আদায় বাড়াতে হবে।

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার এ বছর ৭.৮৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের কথা বলছে। কিন্তু দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি। আবার শ্রমশক্তির জরিপ বলছে, কর্মসংস্থান বেড়েছে। এতে অর্থনীতির স্বাভাবিক হিসাবের মিল পাওয়া যায় না’।

তিনি বলেন, কর আদায়ে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। নেপালের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দেশটি কম আয় করেও বেশি কর আদায় করতে পারছে। ফলে এখানে নজর দিতে হবে। বিশেষ করে কর আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। এ সময়ে কর নীতি ও কাঠামোয় পরিবর্তন আনার সুপারিশ করেন তিনি।

মূল প্রবন্ধে সিপিডি সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, কর ব্যবস্থা নিয়ে এক হাজার মানুষের মধ্যে জরিপ চালিয়েছে সিপিডি। এর মধ্যে ৩২ শতাংশ মানুষ আয়কর দিচ্ছে। ৫০ শতাংশ মানুষ মনে করে, এনবিআরের কর ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। উচ্চ আয়ের ২৫ শতাংশ মানুষের এক-তৃতীয়াংশ গত বছর আয়কর দেয়নি। যাঁরা দিয়েছেন, তাঁরাও পুরোপুরি দেননি। কর ফাঁকি দিয়েছেন।

জরিপে দেখানো হয়, ৭৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন, কর ব্যবস্থায় ধনী-গরিবের মধ্যে পক্ষপাতদুষ্ট। ৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এনবিআরের সেবা ও তার গুণগতমান বাড়ালে জনগণ কর দিতে উৎসাহী হবে।

সিপিডির সুপারিশে বলা হয়, কর অফিসকে একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করে মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ধনী অথচ কর ফাঁকি দেন এমন ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সমতাভিত্তিক কর ব্যবস্থা বিকশিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অধিকতর ন্যায্য এবং আধুনিক সম্পত্তি ও সম্পদ কর চালু করতে হবে।



মন্তব্য