kalerkantho


বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে বক্তাদের দাবি

ব্যাংক বাঁচাতে ইচ্ছাকৃত খেলাপির কালো তালিকা করতে হবে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৮ নভেম্বর, ২০১৮ ১২:৪৩



ব্যাংক বাঁচাতে ইচ্ছাকৃত খেলাপির কালো তালিকা করতে হবে

বিআইবিএম আয়োজিত বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির

ঋণ নিয়ে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ফেরত দেয় না তাদের কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে। যাতে তারা নতুন করে ঋণগ্রহণ, জমি ক্রয়, সম্পদ অধিগ্রহণ করে সমাজে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে না পারে এবং প্রমোদভ্রমণ বা ভোগ-বিলাস করে বেড়াতে না পারে।

এশিয়ার মধ্যেই এমন দেশের উদাহরণ পাওয়া যায়। চীনের সর্বোচ্চ আদালত সে দেশের ৬১ লাখ ৫০ হাজার ঋণখেলাপি ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ২২ লাখ ২০ হাজার ঋণখেলাপিকে উচ্চ গতিসম্পন্ন ট্রেনের টিকিট দেওয়া হয়নি, কারণ সেগুলো অনেক ব্যয়বহুল। প্রায় ৭১ হাজার ঋণখেলাপিকে তাদের করপোরেট চাকরি বা নির্বাহী পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে।

চীনের একটি বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে পাওয়া পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের আবেদন ফিরিয়ে দিয়েছে। দেশটির আদালত আমলা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং কংগ্রেস প্রতিনিধিদেরও কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এর ফলে কেউ কেউ দল থেকে বহিষ্কার বা দলীয় পদ থেকে ছিটকে পড়েছে। ঋণখেলাপিদের আইডি কার্ড নম্বরের ভিত্তিতে তাদের বড় বড় হোটেলে থাকা বা বিমান বা ট্রেনের টিকিট কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই কালো তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের পুরো নাম ও আইডি কার্ড নম্বর তুলে দেওয়া হয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে, যাতে যে কেউ ওই সব খেলাপির সম্পর্কে জানতে পারে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলন-২০১৮’ এর প্রথম দিনের প্রথম অধিবেশনের একটি উপস্থাপনায় খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার কৌশল নির্ধারণে এশিয়ার এ রকম কয়েকটি দেশের উদাহরণ দেন প্রবন্ধ উপস্থাপক। এর আগে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। উদ্বোধনী সেশনে ২০১৭ সালের ব্যাংকিং কার্যক্রমের ওপর একটি পর্যালোচনা তুলে ধরেন বিআইবিএমএর মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধূরী।

এরপর সারা দিনে দুটি আলোচনা সেশনে মোট ৯টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ওই পত্রটি উপস্থাপন করেন ব্যাংক এশিয়ার কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওমর ফারুক। উপস্থাপনায় তিনি দেখান মালয়েশিয়ার সরকার এশিয়ার আর্থিক সংকট-পরবর্তী সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে এবং সর্বোচ্চ পরিমাণ আদায় নিশ্চিত করতে একটি ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেছিল। কম্পানিটি বিভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করে সব অ-নগদ সম্পদকে নগদ সম্পদে পরিণত করে এবং ধীরে ধীরে সর্বোচ্চ পরিমাণ আদায় নিশ্চিত করে।

মালয়েশিয়ার মতো থাইল্যান্ডও একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিল ২০০১ সালে। এমনিভাবে শ্রীলঙ্কাও তাদের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। গত বছর বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যে পাওয়া গিয়েছিল নেপালের খেলাপি ঋণের তথ্য। সেখানেও বলা হয়েছিল, তাদের দেশে খেলাপিদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। যে কারণে তাদের দেশের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩ শতাংশের ঘরে।

গতকালও সম্মেলনে বাংলাদেশ, চীন, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার খেলাপি ঋণের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। তাতে দেখা যায়, ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সব সময়ই বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ বেশি ছিল। সর্বশেষ ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিতরণ করা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণ ছিল ৯.৩০ শতাংশ (জুন ২০১৮ পর্যন্ত ১০.৪১ শতাংশ), যেখানে চীনের খেলাপি ঋণ ১.৭৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার খেলাপি ঋণের হার ২.৫০ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩.০৭ শতাংশ।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক মঈনউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় প্রতিবন্ধকতা খেলাপি ঋণ। অনেক দেশ খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে অনেক ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারলেও আমরা কেন পারছি না?’ তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ইচ্ছাকৃত খেলাপি গ্রহীতা শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে এমন কোনো ব্যবস্থা নিতে তাগিদ দেন, যাতে খেলাপিরা সামাজিকভাবে অপদস্থ হয়। তিনি অবশ্য প্রকৃত খেলাপিদের প্রতি এমন আচরণ না করার কথাও বলেন। এ ছাড়া আইটি নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও কথা বলেন তিনি।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘শুধু আমাদের দেশেই খেলাপি বাড়ছে এমন নয়, ভারতেও বাড়ছে। তবে এর একটি বড় কারণ হলো এ খাতে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। ব্যাংকগুলোর উচিত হবে ঋণ দেওয়ার পর সেই ঋণটা কোথায় ব্যবহার হচ্ছে তার খোঁজ রাখা। প্রত্যেক ব্যাংককে বাজার বিশ্লেষণ করে ঋণ দিতে হবে। তা না হলে ব্যাংক একসময় আর্থিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়তে পারে।’

অধিবেশনটি সঞ্চালনকালে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি আনিস এ খান বলেন, ‘এখন নভেম্বর মাস চলছে, সামনে ডিসেম্বর। প্রতিটি ব্যাংককেই সংগ্রাম করতে হচ্ছে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। এই ঋণের আবার প্রায় ৮৪ শতাংশই মন্দ ঋণ। অর্থাৎ এই ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম। এনআরবি ব্যাংকের এমডি মেহমুদ হোসেন ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ঋণ নিয়মাচারসহ সব পরিপালনীয় বিষয়গুলো মেনে চলার তাগিদ দেন।

এ ছাড়া প্রথম দিনের অধিবেশনগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন এবং ইসলামিক ব্যাংকের পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা করা হয়। অন্য একটি পত্রে ভারতীয় ব্যাংকের বাজার কাঠামো এবং মুনাফা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা হয়। পত্রটি বলেছে, ভারতে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক অনেক বেশি স্থিতিশীল তা বলা যাবে না। বরং বিদেশি ব্যাংকগুলো বেশি স্থিতিশীল।

আজ বৃহস্পতিবার শেষ হবে সপ্তমবারের মতো আয়োজিত এই বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলন। দ্বিতীয় ও শেষ দিনে ১৩টি পত্র উপস্থাপন করা হবে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকার, গবেষক এবং শিক্ষার্থীরা এসব সেশনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন।



মন্তব্য