kalerkantho


‘কার্বন কর’ বসাতে চাপ বাড়ছে

আরিফুর রহমান   

৬ নভেম্বর, ২০১৮ ১৩:২১



‘কার্বন কর’ বসাতে চাপ বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে তুলনায় বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা অত্যন্ত কম হলেও এখনই দেশে ‘কার্বন কর’ বসাতে দেশি-বিদেশি চাপ বাড়ছে। বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে কার্বন কর বসানোর তাগিদ দিয়েছে। তাদের হিসাবে বাংলাদেশে কার্বন কর আরোপ করা হলে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে ১ শতাংশ। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সম্মেলনে কার্বন কর বসানোর বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) ডিজেল ও পেট্রলে ১০ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। দেশি-বিদেশি সংস্থা থেকে আসা প্রস্তাব পাওয়ার পর অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কার্বন কর আরোপের চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার। তবে শিগগিরই যে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না সে বিষয়েও ইঙ্গিত দেন তিনি।

বাংলাদেশে এখনই কার্বন কর বসানোর সময় আসেনি বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, জাপানসহ বিশ্বে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৬টি দেশ ‘কার্বন কর’ বসিয়েছে। বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা খুব কম। যারা মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ করে তারাই এখন পর্যন্ত কর বসায়নি। এখনই কেন কার্বন কর বসানোর কথা আসছে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কার্বন কর হলো জ্বালানি ব্যবহারের ফলে যে কার্বন নির্গত হয়, তার ওপর ধার্য কর। কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদনের জন্য অর্থাৎ পরিবেশ দূষণের কারণে জ্বালানি ব্যবহারকারীকে যে কর দিতে হয়, সেটিই কার্বন কর হিসেবে পরিচিত। সাধারণত, পেট্রল, ডিজেল, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাসসহ সব ধরনের জীবাশ্ম জ্বালানিতেই কার্বন বিদ্যমান আছে। এসব পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদন করলে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়।

বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কেমন তা নিয়ে একটি গবেষণা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সেখানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ মাত্র ১৫২ মিলিয়ন টন। সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ হয় জ্বালানি ব্যবহারের কার্যক্রম থেকে। ৭৩ মিলিয়ন টন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কার্বন নিঃসরণ হয় কৃষি খাত থেকে ৪৬ মিলিয়ন টন। এর পরে আছে বর্জ্য খাত ২৩ মিলিয়ন টন। আইপিপিইউ খাত থেকে কার্বন নিঃসরণ হয় এক মিলিয়ন টন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তুলনা করলে এই হার খুবই নগণ্য। ওয়ার্ল্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ডাব্লিওআরই) সর্বশেষ তথ্যে বলছে, চীনে কার্বন নিঃসরণ হয় এক হাজার বিলিয়ন টনের বেশি। এর পরে আছে যুক্তরাষ্ট্রে ৬০০ বিলিয়ন টন। তৃতীয় অবস্থানে আছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৪০০ বিলিয়ন টন। ডাব্লিওআরই তথ্য মতে, সারা বিশ্বে যত কার্বন নিঃসরণ হয়, তার ২৭ শতাংশ হয় চীনে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ শতাংশ, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ১০ শতাংশ, ভারতে ৭ শতাংশ এবং রাশিয়ায় ৫ শতাংশ।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বাংলাদেশে মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ হয় মাত্র ০.৯৮ টন। অথচ চীনে মাথাপিছু ১৬ টনের বেশি, যুক্তরাষ্ট্রে ১২ টনেরও বেশি। বাংলাদেশে এখনো এক টনও হয়নি। বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ২০১০ সালে ছিল মাত্র ৬০ মিলিয়ন টন। সেটি এখন বেড়ে ১৫২ মিলিয়ন টনে উন্নীত হয়েছে। হঠাৎ করে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত দশ বছরে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জ্বালানি তেলের ব্যবহার বেড়েছে। জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কাজে পুড়ছে জ্বালানি। জ্বালানি তেল থেকে যেহেতু কার্বন নিঃসরণ বেশি হয়, তার প্রভাব পড়েছে সার্বিকভাবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিআরআইএর নির্বাহী পরিচালক আহসান হাবিব মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের স্বার্থে, অর্থনীতির স্বার্থে, পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে কার্বন কর বসানো জরুরি। ব্যবসায়ীরা কখনো হ্যাঁ বলেনি। তাদের মুখ সব সময় মলিন থাকে। পৃথিবীর চিত্রই এমন। ব্যবসায়ীরা কোনো কিছুতে হ্যাঁ বলেন না। বাংলাদেশে পেট্রল ও ডিজেলের ওপর ১০ শতাংশ হারে কার্বন কর বসানো উচিত বলে মত দেন তিনি।

সংস্থাটির হিসাবে, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে নির্গত কার্বনের ওপর ১০ শতাংশ কর বসালে বাড়তি চার হাজার ৩০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ১০ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ কমে যাবে। কার্বন নিঃসরণ কমাতে কার্বন কর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও জানায় পিআরআই।

বাংলাদেশে কার্বন কর বসালে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বাড়বে বলে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন কর আদায়ের হার জিডিপির অনুপাতে মাত্র ১০ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় সবচেয়ে কম। কার্বন কর বসালে করের আদায়ের হার বাড়বে। একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণ রোধেও এই কর কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত যেভাবে যুদ্ধ করছে, তাতে কার্বন কর সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এই খাত থেকে ওঠানো টাকা শুধু জলবায়ু পরিবর্তন খাতে খরচ করা যেতে পারে। তা ছাড়া অন্যান্য খাতের সঙ্গে তুলনা করলে কার্বন কর ওঠানোও সহজ হবে। হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র পণ্যের ওপর কর আরোপিত হবে। সেখান থেকে কর ওঠানোতে কোনো জটিলতা তৈরি হবে না। বাংলাদেশে কার্বন কর চালু হলে বেশ কয়েকটি সুবিধার কথা বলেছে বিশ্বব্যাংক। কার্বন কর বসালে সারা বিশ্বে একটি সংকেত যাবে যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় যথেষ্ট সচেষ্ট। ফলে উন্নত বিশ্ব যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সহায়তা করার, সেই টাকা পেতে জোর দাবি করতে পারবে বাংলাদেশ। যারা বিদেশে পণ্য রপ্তানি করে কার্বন কর তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াবে। 

পিআরআইর গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বন কর এখন সবচেয়ে বেশি যুক্তরাজ্যে ৭১ শতাংশ। এর পরে আছে নেদারল্যান্ডসে ৬৯ শতাংশ,  ইতালিতে ৬৮ শতাংশ ও ফ্রান্সে ৬৬ শতাংশ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা খুবই কম। মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের মাত্রা এক টনের কম; যেখানে উন্নত বিশ্বে মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ১৪ থেকে ১৬ টন। এখনই বাংলাদেশে কার্বন কর বসানোর সময় আসেনি বলে মত বিশেষজ্ঞদের।



মন্তব্য