kalerkantho


খেলাপি ঋণের ৮৪ শতাংশই আদায়ের সম্ভাবনা কম

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৫ নভেম্বর, ২০১৮ ১২:৪১



খেলাপি ঋণের ৮৪ শতাংশই আদায়ের সম্ভাবনা কম

ছবি প্রতীকী

খেলাপি ঋণের প্রায় ৮৪ (৮৩.৯) শতাংশই মন্দ ঋণ। অর্থাৎ এই ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ৭৪ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। বাকি ১৬ শতাংশ খেলাপি ঋণের মধ্যে ৮ শতাংশ সন্দেহজনক মানে শ্রেণীকৃত, টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ প্রায় সাত হাজার ১৮০ কোটি টাকা। বাকি ৮.১ শতাংশ নিম্নমানে শ্রেণীকৃত ঋণের টাকার অঙ্ক প্রায় সাত হাজার ২৪০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত জুন পর্যন্ত ওই প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে ফিন্যানশিয়াল স্ট্যাবিলিটি ডিপার্টমেন্ট।

গত জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১০.৪১ শতাংশ। খেলাপি ঋণের এ পরিমাণ গত ডিসেম্বরের তুলনায় ১৫ হাজার ৩৭ কোটি টাকা বেশি। এ ছাড়া অবলোপন করা খেলাপি ঋণ ধরা হলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

মোট খেলাপি ঋণের দুই-তৃতীয়াংশই ১০ ব্যাংকে। প্রতিবেদনের তথ্য মতে, খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি এমন পাঁচ ব্যাংকে ৪২ হাজার ৫০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। এই পাঁচটি ব্যাংক ছাড়াও আরো শীর্ষ পাঁচটি ব্যাংক রয়েছে, যাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রয়েছে ৫৫ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। যা মোট খেলাপি ঋণের ৬২.৬ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংক এই প্রতিবেদনে কোনো ব্যাংকের নাম উল্লেখ করে না।

খেলাপি ঋণের এই কেন্দ্রীভূত হওয়াকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছে সর্বাধিক পরিমাণ খেলাপি ঋণ থাকার অর্থই হলো এই ব্যাংকগুলোর অবস্থা খারাপ। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ না করে এসব ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া, ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপাসারণ করাসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নিয়ে দেখতে হবে ব্যাংকগুলো ভালো অবস্থানে আসে কি না।’

দেশে বর্তমানে ৫৯টি তফসিলি ব্যাংক রয়েছে। তবে গত জুন পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে তাতে ৫৭টি ব্যাংকের তথ্য রাখা হয়েছে। গত ৩০ জুলাই প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এবং গত ১ নভেম্বর কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডকে তফসিলি ব্যাংকের অন্তর্ভুক্ত হয়।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, একক ব্যাংকে বিতরণ করা ঋণের ২০ শতাংশ বা এর বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকের সংখ্যা ১১। ৫ শতাংশের বেশি এবং ১০ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকের সংখ্যা ২২। ৩ শতাংশের বেশি এবং ৫ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকের সংখ্যা ১০। ১০ শতাংশের বেশি কিন্তু ১৫ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ রয়েছে একটি ব্যাংকে। ১৫ শতাংশের বেশি কিন্তু ২০ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ রয়েছে একটি ব্যাংকে। তিনটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ রয়েছে ২-৩ শতাংশের মধ্যে এবং ২ শতাংশের নিচে খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকের সংখ্যা ৯।

খেলাপি ঋণের বিপরীতে নির্ধারিত হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজন ছিল ৫২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকগুলো রাখতে সক্ষম হয়েছিল ৪৪ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতি ছিল আট হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতে ঝুঁকিবাহিত সম্পদের (আরডাব্লিউএ) পরিমাণ ৯ লাখ ২৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। যেখানে পরিচালনগত ঝুঁকিতে ৮০ হাজার কোটি টাকা, বাজার ঝুঁকিতে ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং ঋণ ঝুঁকিতে রয়েছে আট লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে প্রতি ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৭৬.৭ টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে (এডিআর)। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে এডিআর সবচেয়ে কম, ৪৫.৮ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে, ৮৫.৬ শতাংশ।

গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর জন্য এডিআর ৮৩.৫ এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর জন্য ৮৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বেসরকারি ব্যাংকগুলোর এডিআরের আরো কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। যেটা সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের তথ্য দেখলে বোঝা যাবে।’

ওই প্রতিবেদন প্রস্তুতের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন ধরনের অভিঘাত পরীক্ষা করে। ওই পরীক্ষার ফলাফলে বলা হয়েছে, প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ৩, ৭ ও ১০ ঋণগ্রহীতা যদি খেলাপিতে পরিণত হয়, তবে যথাক্রমে ২৪, ৩৩ ও ৩৮টি ব্যাংক ন্যূনতম সিআরএআর (ঝুঁকিবাহিত সম্পদ ও মূলধন অনুপাত) সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নন-কমপ্লায়েন্টে পরিণত হবে।

আন্তর্জাতিক চর্চা ব্যাসেল-৩-এর স্তম্ভ ১ অনুযায়ী সব ব্যাংকের জন্য ঝুঁকিবাহিত সম্পদের ১০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। গত জুন পর্যন্ত ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ৪৭টি ব্যাংক এই অনুপাত রক্ষা করে চলতে পেরেছে।

এদিকে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও (এনবিএফআই) খেলাপি ঋণ বাড়ছে। গত জুনে দেশে কার্যরত ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ ছিল পাঁচ হাজার ৯২০ কোটি টাকা, যা এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিতরণ করা ঋণের ৯.২ শতাংশ। গত মার্চে এ খাতে খেলাপি ঋণ ছিল পাঁচ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের ৮.৮ শতাংশ।

অভিঘাত পরীক্ষা শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুনে আরো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে লোহিত অঞ্চলে (রেড জোন) অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ নিয়ে রেড জোনে (দুর্বল অবস্থায়) আসা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়াল ১৩টিতে। একইভাবে মার্চের তুলনায় জুনে ইয়েলো জোনে আরো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় মোটামুটি অভিঘাত সহনীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়াল ১৮টিতে। গ্রিন জোন থেকে দুটি ব্যাংক বেরিয়ে যাওয়ায় ভালো অবস্থানে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নেমেছে তিনে।



মন্তব্য