kalerkantho


ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা : অপূর্ণ রয়ে গেল অনেক সূচক

আরিফুর রহমান   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১১:২১



ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা : অপূর্ণ রয়ে গেল অনেক সূচক


বিএনপি সরকারের আমলে নেওয়া দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র (পিআরএসপি) বাদ দিয়ে ২০১০ থেকে ২০১৫ ওই পাঁচ বছর মেয়াদে যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (ষষ্ঠ) বাস্তবায়ন করেছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার, তাতে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্যের হার কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রতিশ্রুতি অর্জিত হয়নি।

অবশ্য এই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি, মাথাপিছু বিদ্যুতের ব্যবহারসহ বেশ কিছু সূচকের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রতিবেদন বলছে, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ, রপ্তানি, রাজস্ব আদায়ের হার বাড়ানোর যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল, সেখান থেকে বেশ পিছিয়ে আছে সরকার। সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয়, কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি, শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় সারা দেশে বনায়ন বাড়াতে যতটা আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি।

ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নিয়ে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের তৈরি করা ২২২ পৃষ্ঠার সমাপ্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গণতন্ত্র ও সুশাসনের বিষয়টিও। ২০১০ থেকে ২০১৫ সময়ে দেশে প্রযুক্তির বিকাশের কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। সমাপ্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি আজ সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার কথা রয়েছে। রাজধানীর শেরেবাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদসহ অন্যদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নের যে স্বপ্ন ছিল, সেটি বাস্তবায়নের হাতিয়ার ছিল ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। সেখানে আমরা কিছু সূচক অর্জন করতে পারিনি এটা যেমন ঠিক, তেমনি অনেক সূচক অর্জনও হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় দেশে ৫ শতাংশ থেকে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সেটি ছিল রেকর্ড। প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। তবে প্রবৃদ্ধি নিয়ে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা উচ্চাভিলাষী ছিল। সে জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।’ শামসুল আলম অনেকটা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ আমরা যতটা বাড়াতে চেয়েছি, ততটা বাড়েনি। কারণ, অবকাঠামো ঘাটতি ছিল, যেটা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তবে এটা ঠিক, দেশ পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছে।’

সমাপ্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১০-১৫) জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭.৩ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি ছিল সরকারের। কিন্তু সেটি অর্জিত হয়েছে ৬.৩ শতাংশ। কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের শেষের দিকে ও ২০১৪ সালে দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। অবশ্য পাশের দেশ চীন ও ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বেশ ভালো ছিল। যদিও এখন প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দেশে নতুন করে এক কোটি চার লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল সরকার। কিন্তু সমাপ্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ওই পাঁচ বছরে দেশে নতুন কর্মসংস্থান হয়েছিল ৬২ লাখ মানুষের। লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তুলনা করলে ৪২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান দিতে পারেনি সরকার।

পরিকল্পনা কমিশনের দেওয়া তথ্য মতে, ২০০৯ সালে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর উন্নয়ন সহযোগীদের চাপিয়ে দেওয়া দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র (পিআরএসপি) বাদ দিয়ে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অর্থনীতিবিদ, গবেষণা সংস্থা ও সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুমোন দেওয়া হয়। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় থাকা অঙ্গীকারগুলোকে উচ্চাভিলাষী বলে অভিহিত করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগসহ (সিপিডি) বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা ও অর্থনীতিবিদরা। অর্থনীতিবিদদের অভিযোগ, বাস্তবতা বিবেচনা না করে পরিকল্পনা প্রণয়নের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে এই পরিকল্পনা করা হয়নি। ফলে পরিকল্পনা দলিলে নেওয়া লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়নি।’

জিইডির দেওয়া তথ্য মতে, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দারিদ্র্যের হার ২২.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের। কিন্তু কমিশনের তথ্য বলছে, দেশে এখন দারিদ্র্যের হার ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে এখনো তিন কোটি ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনতে গরিবদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় মোট জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছিল পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। তথ্য বলছে, এই সূচকটি অর্জিত হয়নি। দেশে এখন সামাজিক সুরক্ষা খাতে টাকা দেওয়া হয় মোট জিডিপির ২.২ শতাংশ।

দেশে পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে রাজস্ব আদায়ের হার মোট জিডিপির অনুপাতে ১২.৫০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলেছিল সরকার। কিন্তু দেশে রাজস্ব আদায়ের হার আশানুরূপ বাড়েনি। রাজস্ব আদায়ের হার এখন জিডিপির অনুপাতে ৯ শতাংশ। সে হিসাবে রাজস্ব আদায়ের হার সাড়ে ৩ শতাংশ কম অর্জিত হয়েছে। রাজস্ব আদায় কম হওয়ার পেছনে বলা হয়েছে, দেশে আয়কর দেওয়ার সংখ্যা অনেক কম। কর দেওয়ার মতো সক্ষম অনেকে থাকলেও তারা কর দিচ্ছে না। সরকারি অনেক সংস্থা আছে, যারা কর দেয় না। এ ছাড়া কর ছাড় দেওয়ার প্রবণতাও দেশে বেশি। ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ভ্যাট আইনও কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এসব কারণে রাজস্ব আদায়ের হার বাড়েনি।

দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখার প্রতিশ্রুতি ছিল সরকারের। কমিশন বলছে, সরকার এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য ছিল। বছর শেষে ৬ শতাংশের মধ্যেই ছিল মূল্যস্ফীতির হার। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ মোট জিডিপির ২৫ শতাংশে উন্নীত করার কথা ছিল ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। তথ্য বলছে, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ মোট জিডিপির ২২ শতাংশ। সে হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ শতাংশ কম। রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা মোট জিডিপির ২৪ শতাংশ ঠিক করা হলেও এই সূচকটি অর্জিত হয়নি।

সমাপ্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদনে আরো দেখা গেছে, কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কথা বলেছিল সরকার। কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৪.৩ শতাংশে উন্নীত করার কথা থাকলেও সেটি ঠেকেছে ৩.৩৩ শতাংশে। বিদ্যুৎ সংযোগ ৭১ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি ছিল। সে লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে সরকার।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, যেকোনো ঝড় ও দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে সারা দেশে সাড়ে পাঁচ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কথা থাকলেও করা সম্ভব হয়েছে চার হাজার। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার কথা থাকলেও করা হয়েছে ২৫ শতাংশ। ২০১০ সালে আদালতগুলোতে মামলা ছিল ১০ লাখ। সেটি কমানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও উল্টো বেড়েছে। কমিশন বলছে, সারা দেশে এখন ৩১ লাখ মামলা বিচারাধীন। সারা দেশে বনায়ন ১৫ শতাংশ করার কথা থাকলেও সেটি অর্জন হয়েছে ১১ শতাংশ। উল্লেখ্য, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার এমন পূর্ণতা-অপূর্ণতার মধ্যে দেশে এখন সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০) বাস্তবায়নের কাজ চলছে।



মন্তব্য