kalerkantho


পতনের বৃত্তে শেয়ারবাজার

১৯ কার্যদিবসের ১৬ দিনই দরপতন

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৩০ মে, ২০১৮ ১১:৪৫



পতনের বৃত্তে শেয়ারবাজার

পুঁজিবাজারে পতন যেন স্বাভাবিক নিয়মেই পরিণত হয়েছে। বিক্রির চাপে প্রতিদিনই পুঁজিবাজারে পতন। লেনদেনও অনেকটা তলানিতে। যদিও ২০১৭ সালে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন ছাড়িয়েছিল দুই হাজার কোটি টাকা। বছরের ব্যবধানে লেনদেন নেমেছে তিন শ কোটি টাকার ঘরে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনী বছরে বিনিয়োগ নিয়ে নানামুখী শঙ্কা, আসন্ন বাজেট ও মৌসুমেও ভালো লভ্যাংশ না পাওয়ায় পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ বেশি। বিনিয়োগ সীমা সংক্রান্ত নীতিগত জটিলতা আর তারল্য সংকটে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ঊর্ধ্বমুখী বাজারে বিনিয়োগ এলেও বর্তমানে ডলারের দাম কিছুটা কমে যাওয়ায় শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।

ডিএসই সূত্র বলছে, পুঁজিবাজারে একটানা পতন অতীতকে ছাড়িয়েছে। এমন একটানা পতন আগে কখনো হয়নি। চলতি মে মাসে ১৯ কার্যদিবসের মধ্যে ১৬ দিনই পতন হয়েছে। আর তিন দিন বাড়লেও সেটা অনেক কমই! এই মাসে আরো এক দিন লেনদেন বাকি অর্থাৎ আজ বুধবার লেনদেন হলেই মাসের শেষ।

সূত্র জানায়, ২০১০ সালে বড় ধরনের ধসের পর দীর্ঘ ছয় বছর মন্দাবস্থার মধ্যেই চলেছে পুঁজিবাজার। আইন-কানুনের সংস্কারের পর ২০১৬ সালে ডিসেম্বর থেকে বাজার গতিশীল হয়। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি ধসে পুঁজি হারানো পুরনো বিনিয়োগকারীও সক্রিয় হয়। চলতি বছরের শুরু থেকে আবারও পেছনে ফিরতে শুরু করে বাজার। মে মাসে পতন অতীতের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১০ সালে ধস হলেও এমনভাবে একটানা পতন হয়নি বলেও জানায় সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, কয়েকটি কারণেই পতনের মুখে পুঁজিবাজার। ২০১৭ সালে হিসাব শেষে ভালো লভ্যাংশ দেয়নি ব্যাংক। তারল্য সংকট থাকায় ব্যাংক উচ্চহারে আমানত সংগ্রহে নেমেছে। লভ্যাংশ না পেয়ে পুঁজিবাজার বিমুখ হয়ে ব্যাংক সঞ্চয়ে ফিরছে অনেকে। চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পর ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কমানোয় তারল্য সংকট দেখা দেয়। এতে ব্যাংকের সহযোগী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর হাতে অর্থ না থাকায় শেয়ার কিনতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ মার্চেন্ট ব্যাংকের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রমজান মাসে বাজার এমনিতেই ধীরগতিতে থাকে। ঈদের আগে অনেকে মূলধন তুলে নেয়। আগামী ৭ জুন আসছে বাজেট ঘোষণা। কাজেই বাজেটে নতুন কিছু থাকছে কি না এমন চিন্তাভাবনায় বাজার পর্যবেক্ষণে থাকে বিনিয়োগকারী। চলতি বছরের শেষে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে এক ধরনের অনিশ্চতা থেকে বিনিয়োগ তুলছেন বিনিয়োগকারীরা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীন এলেও নতুন কোনো বার্তা নেই। গত ১৪ মে চীনের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রিতে চুক্তি করে ডিএসই। এই চুক্তিকে নতুন মাইলফলক হিসেবে আখ্যা দিয়ে বাজার উন্নতির আশা করেছিলেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নানাবিধ কারণেই কোনো গতি পায়নি বাজার।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে বৈঠক করেছে। বাজারে পতনের কারণ ও করণীয় নিয়ে আলোচনার পর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। এই ঘোষণার পর দুই দিন বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলেও আবারও পতনের ধারায় ফিরেছে পুঁজিবাজার।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি মাসে (গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত) ডিএসইতে ১৯ কার্যদিবস লেনদেন হয়েছে। যার মধ্যে তিন দিন সূচক বাড়লেও ১৬ দিনই পতন ঘটেছে। এতে ডিএসইর প্রধান সূচক কমেছে ৪৪৭ পয়েন্ট। আর তিন কার্যদিবসে সূচক বেড়েছে ১১৭ পয়েন্ট। সেই হিসেবে ১৯ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক হারিয়েছে ৩৩০ পয়েন্ট।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে তারল্য সংকট থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর হাতে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। আর পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমাসংক্রান্ত একটি জটিলতায় সক্ষমতাও কমেছে। আর ২০১৭ অর্থবছরের হিসাব শেষে বেশির ভাগ ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে। নগদ লভ্যাংশের পরিবর্তে বোনাস লভ্যাংশ দিয়ে মুনাফার শতভাগ রেখে দিয়েছে। আর ব্যাংক সুদের হার বেশি হওয়ায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে সঞ্চয়ে ফিরছে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত বছর বা ২০১৭ সালের মে মাসের চেয়ে চলতি মাসে গড় লেনদেনও অনেক কমেছে। চলতি মাসে লেনদেন কমেছে ১৫৩৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ২০১৭ সালের মে মাসে ২১ কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১২ হাজার ২৫৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। সেই হিসাবে গড় লেনদেন ছিল ৫৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আর চলতি মাসে ১৯ দিনে লেনদেন হয়েছে ১০ হাজার ৭২২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। সেই হিসাবে গড় লেনদেন ৫৬৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশেন সভাপতি মোস্তাক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাজারে তারল্য সংকট অনেক। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সক্রিয় হতে পারছে না। আর আশানুরূপ লভ্যাংশ না পেয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী শেয়ার ছেড়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া সামনে নির্বাচন, বাজেট আর রমজান মাসের প্রভাব তো রয়েছেই।’ 



মন্তব্য