kalerkantho


সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয়হীনতা

দরিদ্র রেখেই মধ্যম আয়ের দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক    

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১১:০১



দরিদ্র রেখেই মধ্যম আয়ের দেশ

গতকাল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননসহ অন্য বক্তারা

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২১ সাল। অন্যদিকে দরিদ্র ও অতিদরিদ্র নিরসনের জন্য সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে ২০২৫ সাল পর্যন্ত।

অর্থাৎ দরিদ্র মানুষ নিয়েই মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছার এ পরিকল্পনাকে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা বলে মনে করা হচ্ছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বার্ষিক সম্মেলনে’ উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদন ও আলোচনায় এ বিষয়টি উঠে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ এবং ওয়ার্ল্ড ভিশনের উদ্যোগে এ সেমিনারটির আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, সরকার ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছতে পরিকল্পনা করেছে। অন্যদিকে দরিদ্র কমাতে এসব সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে সেগুলোর মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ২০২৫ সাল পর্যন্ত। তার মানে দরিদ্র মানুষ রেখেই মধ্যম আয়ের দেশ গড়ার একটি পরিকল্পনা এটি। এ দুটি পরিকল্পনা একটা অন্যটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কারণ মানুষ বৃদ্ধি ও কিছু মানুষের আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্যের হার কমলেও প্রকৃত সংখ্যার হিসাবে আসলে দারিদ্র্য কমেনি।

বিআইডিএসের (বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘আসলে মানুষ বৃদ্ধির কারণে দারিদ্র্যের হার কমেছে।

আবার কিছু মানুষের আয় বৃদ্ধির কারণে সেটার গড় হিসাবে অনেকের মাথায় বেশি আয়ের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সংখ্যার অর্থে দারিদ্র্য কমেনি। ’ তিনি বরাদ্দ কম থাকার কথা তুলে ধরে বলেন, জাতীয় আয়ের মাত্র ২ শতাংশ এত বড় একটা কর্মসূচিতে দেওয়া হয়। দেশের দরিদ্র মানুষের হিসাবে অন্তত এই বরাদ্দ ৪ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। তবে এর জন্য যেসব বড় বড় ব্যবসায়ী কর ফাঁকির জন্য আইনজীবী নিয়োগ করেন তাঁদের করের আওতায় আনার পরামর্শ দেন।

অনুষ্ঠানে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম দাবি করেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে প্রতিনিয়তই কর্মসূচি যেমন বাড়ছে, ভাতার পরিমাণও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি বাজেটেই বরাদ্দ বাড়ছে। হতদরিদ্র কমে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। সুতরাং আমাদের ২০২১ সালের মধ্যম আয়ে এবং ২০৪১-এ উন্নত দেশে পৌঁছার যে লক্ষ্যমাত্রা, সেই পরিকল্পনা ঠিক আছে। ’     

বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও রাজনীতিকীকরণের কারণে বরাদ্দের সুবিধা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের পকেটে পৌঁছে না, এমন অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকেরই একটি উদ্দেশ্য থাকে। আমরা যা-ই করি তার পেছনে আমাদের উদ্দেশ্য হলো রাজনীতি, নির্বাচন। ’

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারই ছিল সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা; কিন্তু তা হচ্ছে না। পদক্ষেপ আছে, বাস্তবায়ন নেই। যে কারণে উন্নয়ন ও বৈষম্য বাড়ছে হাত ধরাধরি করে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরির একটি পথ তৈরি করছে। ’ তিনি বলেন, ‘সামাজিক কর্মসূচিগুলোতে প্রচুর পরিমাণ লিকেজ রয়েছে। যেখান থেকে দুর্নীতি হচ্ছে এবং এটা আমরা মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখতে পাচ্ছি। এ কারণে সত্যিকার দরিদ্ররা সাহায্য পাচ্ছে না। এতে শতকরা হিসাবে দরিদ্র কমলেও প্রকৃত সংখ্যায় এটি কমছে না। ’ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাস্তবায়নে বর্তমান অবস্থার’ প্রেক্ষাপটের ওপর একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। এতে উঠে এসেছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরকারের বরাদ্দ করা টাকার বেশির ভাগই এখনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনে ভূমিকা রাখতে পারছে না। দরিদ্র মানুষ, ঝুঁকিতে থাকা নারী, শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি, দলিত, গৃহহীন, বাস্তুচ্যুত, পথশিশু, বয়স্ক মানুষসহ যাদের জন্য ভাতার প্রচলন রয়েছে তা দুর্নীতি, রাজনীতিকীকরণ, বাস্তবায়নপ্রক্রিয়ার ত্রুটি এবং কম বরাদ্দের কারণে তাদের হাত পর্যন্ত পৌঁছে না। যে কজন মানুষের কাছে যায়, সেটাও খুবই সীমিত আকারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই সুবিধা পৌঁছায় প্রভাবশালী বা কিছুটা সচ্ছল ব্যক্তিদের পরিবারে।

এ উপস্থাপনায় বলা হয়, বর্তমানে ভিজিএস, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতার মতো প্রায় ১৪৫টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু আছে। এসব কর্মসূচি থেকে সত্যিকার যাদের সুবিধা পাওয়া দরকার, তারা কতটা পাচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তবে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ এবং পিকেএসএফের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, সবাই মিলে কাজ করেই সবার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দিন দিন ভাতার পরিমাণ বাড়ছে এটা ঠিক। উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই, তবে একই সঙ্গে দরিদ্রের সংখ্যাও বাড়ছে। শুধু ভাতার ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী তৈরি না করে মানুষকে কিভাবে বেশি করে কর্মের দিকে নিয়ে যাওয়া যায়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, দুই-চার হাজার টাকায় এসব কর্মসূচির কার্ড বিক্রি হয়। কারণ এর চাহিদা প্রচুর। সব জায়গায় ঢালাও এসব সুবিধা না দিয়ে যেখানে দারিদ্র্যের হার বেশি, সেখানে বেশি দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তিনটি সেশনে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনের সঞ্চালনা করেন খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী।

 
 


  

 


মন্তব্য