kalerkantho


কম শব্দে চেনা আঙ্গিকের বাইরে মেহেদী উল্লাহর 'জ্বাজ্জলিমান জুদা'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১৬:০৪



কম শব্দে চেনা আঙ্গিকের বাইরে মেহেদী উল্লাহর 'জ্বাজ্জলিমান জুদা'

এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় পাওয়া যাচ্ছে কথা-সাহিত্যিক মেহেদী উল্লাহর ভিন্নধারার গল্পগ্রন্থ 'জ্বাজ্জলিমান জুদা'। চতুর্থ গল্পের বই হিসাবে প্রকাশ পেয়েছে বইটি।

ঐতিহ্যের স্টলের ৪৩০, ৪৩১, ৪৩২ নম্বর স্টলে মিলবে তাঁর বইটি। মূল্য ১৫০ টাকা।
 
যারা বইটি ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছেন তাদের কথায় 'জ্বাজ্জলিমান জুদা' সম্পর্কে বিভিন্ন মন্তব্য উঠে এসেছে। এর পাতায় পাতায় গল্প। এক বইয়ে অনেক ঘটনা। একটির রেশ কাটাতে পারে কেবল পরের গল্পটিই। কম শব্দে, অতি অল্পে প্রচলিত আঙ্গিকের গল্পের চেয়ে একদম আলাদা। ঘুরিয়ে-প্যাঁচিয়ে নয়, সরাসরি গল্প।

বইটি সম্পর্কে কালের কণ্ঠ অনলাইনকে লেখক বলেন, 'উঠতে-বসতে, হাঁটতে-চলতে, ঘুরতে-ফিরতে, বিরামে-আরামে, চড়ায়-উড়ায়, ব্যস্ততা-আলস্যে কিংবা যানজটে ঝটপট পড়তেই 'জ্বাজ্জলিমান জুদা'।

গল্প করার ফাঁকে ফাঁকে গল্প পড়ুক পাঠক। '

মেহেদী উল্লাহ জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠে দীর্ঘদিন ধরে সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের শিক্ষক।

তিনি ২০১৩ সালে জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ 'তিরোধানের মুসাবিদা'র পাণ্ডুলিপির জন্য।

'জ্বাজ্জলিমান জুদা'র প্রতিটি গল্পেই ভিন্নতা রয়েছে। এমন দেড় শতাধিক গল্প আছে বইটিতে। এমনই একটি 'এতিমখানার ইলম'। গল্পটি দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। গল্পটি তুলে দেওয়া হলো।

এতিমখানার ইলম

আমরা যারা ছোট থাকতে এতিমখানায় মানুষ হয়েছি তারা বড় হলে বছরে একবার নিজেদের এতিমখানায় সম্মানিত ওস্তাদজিদের সাথে মোলাকাত করতে যাই। যেদিন যার ত্রিশ পারা কোরান শরীফ হেফজ করা শেষ হয়েছে সেই দিনটাতেই সে যাওয়ার চেষ্টা করে।

আমি বছরে একবার গেলেই ওস্তাদজিরা প্রশংসা করে বলেন,'মুত্তাকিম, এখনকার মতই ছোটবেলায়ও তোমার চেহারা মোবারকে সূর্যের রশ্মিই ছিল। তুমি ছিলা আরো টকটকা, নূরানি চেহারার। '

আমি লজ্জায় তাঁদের উত্তর দিই,'আপনাদের দোয়ার বরকতে আজ আমি সবচেয়ে কম বয়সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। আমাকে খাস দিলে আরো দোয়া করবেন। '
আমার ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ছে। সেইদিনগুলো ছিল খুব কষ্টের! একেকদিন একেক ওস্তাদজি ফরমায়েশ দিতেন। মাঝে মাঝে খুব বেদিশা লাগত সবকিছু। গোস্বা করে খানা খেতাম না। ওস্তাদজিদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্কজন একদিন বললেন,' মুত্তাকিম, ফজরের নামাযের ওযু সেরে পুকুর থেকে মসজিদে ফেরার পথে মেসওয়াকটা কোথায় যেন পড়ে গেছে পকেট থেকে, খুঁজে নিয়ে আসো। '

আমি মাটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে খুঁজতাম দুপুরের রোদের মধ্যে, অনেকক্ষণ খোঁজার পর পেয়ে গেলে খুশি লাগত ঠিকই, তবে অসুস্থ হয়ে পড়তাম।

আরেকদিন আরেক ওস্তাদজি বললেন,'মুত্তাকিম, আমার চাবিটা মাঠের কোথায় হারিয়ে গেছে, খুঁজে আনো। '

আমি আবারো দুপুরের রোদের মধ্যে মাটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ঘাসে খুঁজতে নামলাম। কয়েক ঘন্টা পর পেলাম, কিন্তু অসুস্থ হয়েছি আবার।

এভাবে ওস্তাদজিদের যাঁর যাই হারানো যেত তালাশের দায়িত্ব দেওয়া হত আমাকে। একইভাবে মাটিতে চোখ রেখে রেখে বের করতাম।

শেষবার এক ওস্তাদজি আমাকে বললেন,'মুত্তাকিম, আমার পাঞ্জাবির একটা বোতাম খুলে পড়ে গেছে মাঠের কোথাও, অন্য বোতাম লাগালে বিদখুটে লাগবে। তালাশ কর। '
সেদিন টানা সাড়ে তিন ঘন্টা ঘাসের ভেতর তালাশের পর ছোট্ট বোতামটি খুঁজে পেয়েছিলাম। দীর্ঘসময় রোদে থাকায় আমার জ্বর এসেছিল।

আজ আমার এতিমখানায় আসার দিন দিল। সকালেই ওস্তাদজিদের সঙ্গে দেখা করে এসেছি। কিন্তু আজ থেকে তাঁদের প্রতি আমার আর কোনো গোস্বা নাই। এক
ওস্তাদজি আমার ভুল ভেঙ্গে দিলেন। তিনি কথা প্রসঙ্গে বললেন,'মুত্তাকিম, ছোটবেলায় তুমি খুব মেধাবী ছিলে একথা সত্যি। কিন্তু সেইসাথে তোমার মন খুব অশান্ত থাকত, অস্থির ছিলে তুমি, আর ছিলে ধৈর্যহীনদের দলে। মাটিতে বিভিন্ন জিনিস খুঁজতে খুঁজতে এক সময় তোমার বদ স্বভাবগুলো চলে গিয়েছিল। আমাদের জিনিস হারানোটা ছিল অজুহাত মাত্র, ইলমের কৌশল। '

আমার ওস্তাদজিরা কতটা প্রজ্ঞাবান ছিলেন তা আপনাদের জানাতেই এই চেষ্টা, আমি কখনোই লেখক নই।

 


মন্তব্য