kalerkantho


বইকেন্দ্রিক সামাজিকতা গুরুত্ব পাচ্ছে না

এস এম মুকুল   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১৪:২৬



বইকেন্দ্রিক সামাজিকতা গুরুত্ব পাচ্ছে না

ছোটবেলায় আমরা বই চুরি করে নিয়ে পড়তাম। বই বদল করে পড়তাম। বই উপহার পেতাম এবং দিতাম। এখন কেন জানি এই অভ্যাসে ভাটা পড়েছে। এটি খুবই ভয়ানক ব্যাপার। বিয়ে, জন্মদিন, সাংস্কৃতিক উৎসবে এখন আর বই উপহার দিতে দেখা যায় না। আজকালকার বিয়ের অনুষ্ঠানে এক হাজার টাকার নিচে কিছু উপহার দেওয়া যায় না। অথচ এক হাজার টাকায় ৫/৭টি বই উপহার দেওয়া সম্ভব। ধরা যাক একটি বিয়েতে আপ্যায়িত হয়ে থাকেন ২০০ থেকে ৩০০ জন। এদের মধ্যে ৫০ জন যদি এক হাজার টাকার বই দেন তাহলে ৫০ হাজার টাকার বই উপহারে সেই পরিবারটিতে একটি পাঠাগার তৈরি হতে পারত।  

আমাদের সমাজে অদ্ভুত আরেকটি রীতি দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে- এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এমনকি শিল্প-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বনভোজনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসেবে এখন বই উপহারের বদলে গৃহসামগ্রী দেওয়া হয়।

অথচ এসব আয়োজনে বইকে প্রাধান্য দিলে এই সিজনে কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি হতে পারত।

আমাদের সমাজের একটি পরিবারের বইমেলায় বই কেনার জন্য ২ হাজার টাকাও বাজেট থাকে না। দেখা গেছে শিশুরা বই কিনতে চাইলেও মা-বাবার অনাগ্রহের কারণে তাদের বইয়ের চাহিদা মিটছে না। অথচ এই বাবা-মায়েরাই একদিন একবেলা পেটপুরে চায়নিজ খেয়ে ২/৩ হাজার টাকা অবলীলায় শেষ করেও যে আনন্দ প্রকাশ করেন সন্তানকে সেই পরিমাণ টাকার বই কিনে দিয়েও গর্বিত হতে দেখা যায় না।

দুঃখের বিষয় হলো- এমন বাবা-মায়েরাই আবার মননশীল সুসন্তান হিসেবে নিজের সন্তানকে দেখতে চান! আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। বইমেলায় বছরে একবার পরিবারপ্রতি যদি ২ হাজার টাকার বই কেনার বাজেট থাকে তাতেও অনেক বই বিক্রি হওয়ার কথা। ভেবে দেখুন, আমাদের পিএসসি, জেএসসি পরীক্ষার্থীও সংখ্যা কত কোটি। আমাদের সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সৃজনশীল বই কিনে পাঠাগার স্থাপন করা বাধ্যতামূলক হলে শত কোটি টাকার বই বিক্রি হওয়ার কথা। আশ্চর্য লাগে এসব বিষয় নিয়ে প্রকাশনা সংস্থাগুলোর তৎপরতা লক্ষ করা যায় না।

গৎবাঁধা বক্তৃতা না করে বইশিল্পের বিকাশে উদ্ভাবনীমূলক কার্যক্রম তৎপরতা বাড়াতে হবে। বইশিল্প বিকাশে সরকারের বড় ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা অতি আবশ্যক। প্রকাশনাকে শুধু একটি নান্দনিক মেধা বিকাশক শিল্পই নয় জাতি গঠনে এবং সৃজনশীল সংস্কৃতির সম্প্রীতি ঘটাতে এ শিল্পের ভূমিকা অগ্রগণ্য। এমন একটি শিল্পের প্রতি সরকার উদাসীনতা হবেন না এটাই জাতির প্রত্যাশা। সৃজনশীল প্রকাশনার প্রথম ক্রেতা হতে হবে সরকারকে। সরকার ক্রেতা হয়ে বই পঠনকে জনপ্রিয় করে তুললে প্রজন্মের মাঝে সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব তৈরি হবে। সামাজিক অসঙ্গতি ও সংঘাত কমবে। এ কাজে সরকারেরই লাভ বেশি।

সরকার তার পাঁচ বছর ক্ষমতার মেয়াদে ২০ কোটি করে ১০০ কোটি টাকার বই কিনলে পাল্টে যাবে প্রকাশনাশিল্পের অবয়ব। লেখক, পাঠক তৈরি হবে। এগিয়ে যাবে দেশ এবং জাতি। তবে সরকারের ক্রয়নীতিতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করতে হবে। তা না হলে প্রকাশনার মান ধরে রাখা সম্ভব হবে না। সরকার পৃষ্ঠপোষক হলে দ্রুততম সময়ে বিকশিত হবে এই সম্ভাবনাময় শিল্পটি। প্রতিষ্ঠিত হবেন লেখক এবং বাড়বে বইয়ের বাজার। আমরা একটি সৃজন ও মননশীল প্রজন্ম গড়তে পারব।

এস এম মুকুল, লেখক ও কলামিস্ট

 


মন্তব্য