‘বাবা, মা, ছোট বোনের সঙ্গে জঙ্গলের মধ্যে পালাইয়া ছিলাম। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালাইয়া দিয়াও জানোয়ারগুলা ক্ষান্ত হয় নাই। জঙ্গলের মধ্যেও হানা দিছিলো। রাজাকারগো লগে লইয়া প্রথমে ওরা বাবা-মায়েরে দড়ি দিয়া বাইন্দা ফেলে। তাগো চোখের সামনেই আমার ওপর নির্যাতন চালায়। তারপর অস্ত্র দেখাইয়া তুইল্লা নিয়া যায় মিলিটারি ক্যাম্পে। সারা রাত রাজাকার আর পাকিস্তানি মিলিটারিরা আমার ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালায়। আমি অজ্ঞান হইয়া যাই। আমি মরছি ভাইব্বা চেনাহুনা দুই রাজাকার আমারে ধান ক্ষ্যাতে ফালাইয়া যায়। আশপাশের লোকেরা ক্ষতবিক্ষত দেহডারে বাবার কাছে পৌঁছাইয়া দিয়া যায়। কিন্তু আমি মরি নাই। কিন্তু দ্যাশ স্বাধীন হওনের পর স্বামী আমারে ঘরে না তুইল্লা নতুন কইরা বিয়া করে। আশপাশের লোকজন আমারে ঘেন্না করে। কিছুদিন পর বাবাও মারা যায়। এরপর থাইকা ছোট ভাইয়ের আশ্রয়ে আছি। ঘৃণা ছাড়া কেউ কিছু দেয় নাই। এর চাইতে মরণও ভালো ছিলো’- এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ডুকরে কেঁদে ওঠেন পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার শাখারীকাঠি গ্রামের বীরাঙ্গনা লক্ষ্মী রানী রায়। ১৯৬৯ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে লক্ষ্মীর বিয়ে হয় পাশের গাবতলা গ্রামের লালু মণ্ডলের সঙ্গে। স্বামীর ঘরে সুখ, সচ্ছলতা দুই-ই ছিল। কিন্তু একাত্তরের যুদ্ধ তাঁর জীবন থেকে সবটাই কেড়ে নেয়। লক্ষ্মী রানী কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁকে বাঁচানোর জন্যই স্বামী বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘তুমি দেখতে সুন্দর। হায়নারা তোমার ক্ষতি করবে।’ কিন্তু সে ক্ষতির হাত থেকে রেহাই পেলেন না লক্ষ্মী। জানা যায়, একাত্তরের ৩ নভেম্বর নাজিরপুরের শাখারীকাঠি গ্রামে রাজাকারদের সহায়তায় প্রবেশ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। গ্রামজুড়ে চালায় ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা, নির্যাতন। হানাদারদের হিংস্র থাবায় ক্ষতবিক্ষত হন লক্ষ্মী রানী। সম্ভ্রম হারানোর পর স্বামীর ঘরে ঠাঁই না পেয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন লক্ষ্মী। মা-বাবা মারা যাওয়ার পর ছোট ভাইয়ের কাছে একটি ছোট্ট খুপরি ঘরে দিন কাটছে তাঁর। লক্ষ্মীর ছোট ভাই কুমোদ রায় বলেন, ‘আমি সামান্য দিনমজুর। নিজের সংসার আছে। বোনটাকে সবাই ঘৃণার চোখে দেখে। রক্তের বোন, আমি তো আর ফেলতে পারি না। নিজের ইচ্ছায় সে তো কোনো পাপ করেনি। তাই যা জোটে, একসঙ্গে খাই।’ স্থানীয় পরশমণি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বুলু মিত্র বলেন, এলাকার সবাই জানে লক্ষ্মী রানী বীরাঙ্গনা। স্বাধীনতার ৪২ বছর পার হলো কিন্তু লক্ষ্মী রানীকে সমাজের ঘৃণা ছাড়া আর কিছু পেতে দেখলাম না। স্থানীয় সংবাদকর্মী আকরাম আলী ডাকুয়া বলেন, প্রতিবছর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যে পুরস্কার-সম্মাননাটুকু থাকে, তা-ও কোনোদিন পাননি লক্ষ্মী রানী। এই বীরাঙ্গনা এখন মারাÍক অসুস্থ। তাঁর চিকিৎসা দরকার। কিন্তু দুবেলা যার খাবারই জোটে না, তিনি চিকিৎসা পাবেন কোথায়? লক্ষ্মীর চোখের জল তখনো মাটিতে গড়িয়ে পড়ছিল। দুর্বল শরীর। সোজা হয়ে থাকতে পারেন না। মাথাটা দুলতে থাকে। চোখে হতাশার চিহ্ন। পড়ন্ত বিকেলে সাংবাদিকের উপস্থিতি হয়তো একটু আশার আলো জাগিয়েছিল। বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। একটু পরেই সূর্যটা ডুবে যাবে, আর লক্ষ্মীর জীবনে নেমে আসবে সেই চিরচেনা অন্ধকার। বিদায় নিয়ে আসার সময় লক্ষ্মী রানীর প্রতিক্রিয়া দেখে বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। প্রায় অচল এই বীরাঙ্গনা উঠে দাঁড়ান। টলমল পায়ে হাঁটা ধরেন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। অসুস্থ শরীর নিয়ে মাইলখানেক পথ হাঁটেন আর বলে চলেন তাঁর যত কষ্টের কথা। ঘুরেফিরে একটা কথাতেই জোর দিচ্ছিলেন তিনি। বলছিলেন, ‘মা, আমি কিছু পামু তো?’ বীরাঙ্গনার এই ব্যাকুল প্রশ্নের কী জবাব থাকে সামান্য সাংবাদিকের কাছে? তাই চোখের জলে ভেসে জবাব খুঁজতে যাই পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার গৌতম নারায়ণ রায় চৌধুরীর কাছে। তিনিও বলেন, ‘লক্ষ্মীর দুরবস্থার কথা লিখে প্রকাশ করা যাবে না। একজন নারী জীবনের সঙ্গে কতটা লড়তে পারে, লক্ষ্মী তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আমি জানি, সরকারি কোনো সহযোগিতা তিনি পাননি। সহযোগিতা করার মতো কোনো আত্মীয়স্বজনও তাঁর নেই। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বামীর ঘরছাড়া হয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে কাজ করে পেট চালিয়েছেন। এখন যে কী অবস্থা, তা তো আপনারাই দেখে এসেছেন। সরকারের কাছে আমি অনুরোধ করব, আমাদের এই বীরাঙ্গনা মায়েদের জন্য যেন কিছু করা হয়।’ জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট আকরাম হোসেন বলেন, ‘আমি আপনার মাধ্যমেই জানলাম লক্ষ্মী রানী নামে একজন বীরাঙ্গনা আছেন এখানে। আমি জেলা পরিষদের মাধ্যমে তাঁকে সহযোগিতার চেষ্টা করব।’