ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের শশীগঞ্জ চাঁদপুর গ্রামের মজিদ পাটওয়ারী (মানিক হুজুর) বাড়ির রেজাউল হকের স্ত্রী বিবি মালেকা বেগম (৭৫)। একাত্তরে তাঁর ভগ্নিপতি আবদুল মন্নান হালদার ছিলেন ফোর বেঙ্গলের হাবিলদার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। মালেকার বোন বিবি ফাতেমাকে নিয়ে মন্নান বসবাস করতেন কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের ৩ নম্বর কোয়ার্টারে। বোনের অসুস্থতার খবর পেয়ে মালেকা ছুটে যান সেখানে। তখন তাঁর বয়স ১৬ বছর। অন্তঃসত্ত্বা বোনের দেখাশোনা করতে থাকেন তিনি। এরই মধ্যে শুরু হয় স্বাধীনতাযুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ভগ্নিপতি মন্নান হন শহীদ আর বোনের সঙ্গে মালেকা বেগম হন বীরাঙ্গনা। ভোলার একই উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের কাজীকান্দি গ্রামে বাবার বাড়িতেই শৈশব কেটেছে মালেকা বেগমের। দাদির কাছ থেকে মালেকা জানতে পারেন, তাঁর বয়স যখন দুই বছর তখনই বাবা আবদুর রশিদ ক্যান্সারে মারা যান। আর পাঁচ বছর বয়সে হারান মা বিবি মরিয়মকে। এরপর ভাই আবদুল মালেকের কাছেই বড় হয়েছেন তিনি। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বীরাঙ্গনা মালেকা বেগম বলেন, ‘ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে আমি বড় বোনের সেবা-শুশ্রুষা করছি। ইংরেজি তারিখ ঠিক মনে নেই। বৈশাখ মাসের ২৫ তারিখে সকাল ১০টার দিকে ছয়জন পাকিস্তানি হানাদার আচমকা আমাদের বাসায় হানা দেয়। তখন আমরা দুই বোন সামনে এলেও ভগ্নিপতি আবদুল মন্নান চৌকির নিচে লুকিয়ে থাকেন। তাঁকে সেখান থেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে দেয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলে। ভয়ে আমরা পালানোর চেষ্টা করি। একপর্যায়ে আমি, আমার ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বোন ফাতেমা ও তাঁর পাঁচ বছরের মেয়ে রিজিয়া গোসলখানার ভেতরে পালালাম। অনেক খোঁজাখুঁজির পর গোসলখানায় আমাদের পেয়ে সেখানেই অত্যাচার-নির্যাতন শুরু করল নরপশুরা। এরপর ইস্কাটনি কলেজের দোতলায় নিয়ে ক্যাম্পে বন্দি করল।’ মালেকা বেগম জানান, টানা ৯ মাস পাকিস্তানিদের ওই ক্যাম্পে চলে মালেকা বেগম ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা বোনের ওপর অমানুষিক নির্যাতন। ক্যাম্পে তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আরো সাত-আটজন নারী। ওরা ঠিকমতো খাবারও দিত না। বুটের ডাল আর আতব চালের ভাত রেধে পোকামাকড়সহ দিত। খাওয়ার পানিও দিত না। অত্যাচারের পর সবাইকে ঘরে রেখে বাইরে থেকে তালা মেরে দিত। মাঝে মধ্যে দুপুর ১২টার দিকে একটা করে রুটি দিত। ওই ক্যাম্পেই বোন ফাতেমা জন্ম দিল একটি পুত্রসন্তান। হানাদারদের সঙ্গে ছিল এক সিস্টার ও সুইপার। তারাই সন্তান জন্মের ব্যবস্থা করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের বন্দিজীবন থেকে মুক্ত করে আনেন। মালেকা বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা পথখরচা বাবদ ৫০০ টাকা করে দিয়ে যার যার ঠিকানা অনুযায়ী বাড়ি পাঠিয়ে দেন। সেই টাকা দিয়ে আমরা দুই বোন কুমিল্লা থেকে তজুমদ্দিনে চলে আসি। কিন্তু কোনো দিন কারো কাছে একাত্তরের সেই দুর্বিষহ বন্দিজীবনের কথা বলতে পারিনি।’ বন্দিজীবন থেকে মালেকা মুক্ত হয়ে বাড়ি আসার পর তাঁর ভাই আবদুল মালেক শশীগঞ্জ চাঁদপুর গ্রামের রেজাউল হকের সঙ্গে বোনের বিয়ে দেন। কিন্তু এই বীরাঙ্গনার সংসার জীবনও চলছে অনেক কষ্টে। দিনমজুর স্বামীর আয় দিয়ে পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছেন। এর মধ্যে এক মেয়ে ও দুই ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। মালেকার ভাই আবদুল মালেকের মতে, সমাজ বোনের বন্দিজীবনের ইতিহাস সহজে মেনে নেবে না। তাই লোকলজ্জার ভয়ে বোনের বীরাঙ্গনা হওয়ার কাহিনী কাউকে বলেননি। মালেকাকেও বলতে নিষেধ করেছেন তিনি। মালেকা বেগমের দুই ছেলে তজুমদ্দিন ডিগ্রি কলেজের বিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মো. রিয়াজ ও স্থানীয় মোবাইল দোকানের কর্মচারী মো. পারভেজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মা যে দেশের জন্য অনেক নির্যাতিত হয়েছেন, কষ্ট পেয়েছেন; সেই দেশের সরকার আমাদের কিছুই দেয়নি। স্বাধীনতার ৪২ বছরেও আমরা কিছু পাইনি। আপনারাই প্রথম আমাদের বাড়িতে এসেছেন। আমাদের সংসার কিভাবে চলে তা কেউ দেখে না।’ বীরাঙ্গনা মালেকা বেগমও অনেকটা আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, ‘দেশের জন্য এত নির্যাতন সহ্য করে বেঁচে থাকলেও সরকার থেকে কিছু পাইনি। আমার বাড়ি নদী থেকে মাত্র এক কিলোমিটার। জোয়ার হলে আমার ঘর পানিতে ডুবে যায়। তাই মাথা গোঁজার জন্য উপজেলার চর মোজাম্মেল থেকে একখণ্ড জমির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ছেলে রিয়াজকে একটি চাকরি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান এই বীরাঙ্গনা।’ তজুমদ্দিন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. বেলায়েত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১০ সালে আমি যখন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নির্বাচিত হয়েছি, তখন বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, এ উপজেলায় একজন বীরাঙ্গনা রয়েছেন। এরপর বিষয়টি জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলকে জানিয়েছি। কিন্তু জেলা মুক্তিযোদ্ধা বা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল থেকে কিংবা সরকার থেকে কিছুই পাননি বীরাঙ্গনা মালেকা বেগম।’ বীরাঙ্গনাদের জন্য সরকারের কাছে স্বীকৃতি ও সহযোগিতার দাবি জানান বেলায়েত হোসেন।