১৯৭১ সালে ১৩ বছরের কিশোরী নুরজাহানও রেহাই পাননি পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসর রাজাকারদের নখর থেকে। প্রথমে মা ও ছোট ভাইকে মারপিট করে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় ওরা। তারপর রাজাকাররা নুরজাহানকে তুলে দেয় বিহারিদের হাতে। একটি বন্ধ ঘরে আটকে রেখে দিনে এক কী দুই বেলা খাবার দিয়ে রাতে নরপশুরা হামলে পড়ত অতটুকু মেয়ের ওপর। চিৎকার করে কাঁদলেও বাঁচাতে আসত না কেউ। এভাবে প্রায় দুই মাস অমানুষিক নির্যাতন সইতে হয়েছে মেয়েটিকে। একাত্তরের এই বীরাঙ্গনা নুরজাহান বেগমের বয়স এখন ৫৫ বছর। দুঃসহ দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘আমার মতো আরো ১২-১৩ জন মেয়েকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। দুজন মারাও যায়। যাঁরা বেঁচে ছিলাম, তাঁরা প্রতিনিয়ত ডাকতাম বিধাতাকে। বলতাম, এই হায়েনাদের হাত থেকে রক্ষা করো তুমি। বিধাতা হয়তো আমার কথা শুনেছেন। দেশ স্বাধীনের পর মুক্তিযোদ্ধারা হায়েনাদের পরাজিত করে এবং আমাকে উদ্ধার করে।’ বীরাঙ্গনা নুরজাহানের বাড়ি রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে। তাঁর স্বামীর নাম মোকাররম হোসেন। নুরজাহান বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে উদ্ধার করে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার পর শুরু হয় আমার আরেক যুদ্ধ। টানা এক মাস চিকিৎসা নিতে হয় আমাকে। সুস্থ হওয়ার পর বুঝতে পারি, আমি যেন চিড়িয়াখানার কোনো জন্তু। প্রতিবেশীরা সামনে কিছু না বললেও লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে দেখত। মাঝে মধ্যে কটুকথা বলত। মনের দুঃখে এ জীবন শেষ করে দেওয়ার চিন্তা করেছি বহুবার। কিন্তু বৃদ্ধ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ভুলে যেতাম সে সব ভাবনা। আমার মায়ের নাম মানু বিবি। আমাকে নিয়ে চিন্তার শেষ ছিল না মা ও ছোট ভাইয়ের। আমাকে কে বিয়ে করবে?’ তারপর ১৯৭৩ সালের প্রথম দিকে বিস্ময়করভাবে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার চৌগাছি গ্রামের মনির উদ্দিন মোল্লার ছেলে মোকাররম হোসেন মোল্লা। সেই মহৎ ঘটনার কথা শোনা যাক মহান ব্যক্তিটির মুখেই। মোকাররম হোসেন বলেন, ‘আমিও তখন বয়সে কিশোর। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মাগুরার চৌগাছিতে আমি মুক্তিযোদ্ধাদের নানা রকম সহযোগিতা করতাম। তাই মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের প্রতি আমার এক ধরনের দুর্বলতা ছিল। নুরজাহানের বাড়ির পাশে ছিল আমার এক চাচাতো বোনের বাড়ি। ১৯৭৩ সালে ওই চাচাতো বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দেখা হয় মাগুরায় যুদ্ধ করা বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে। তাঁদের সঙ্গে কয়েক দিন সময় কাটানোর পর নুরজাহান সম্পর্কে আমি বিষদ জানতে পারি। তাঁর প্রতি আমার মমতা সৃষ্টি হয়। আমি তাঁকে বিয়ে করি। তবে বিয়ের পর নানাজনের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে কটুকথা। এমনকি বাবা-মায়ের একমাত্র পুত্র সন্তান হলেও তাঁরা আমাদের এই বিয়ে মেনে নেননি। কোনো উপায় না দেখে শ্বশুরালয়েই বসবাস শুরু করি। সে সময় থেকেই আমি দর্জির কাজ করি। টাকার অভাবে বাজারে কোনো দোকান নিতে পারিনি। বাড়িতেই কোনো রকমে চালিয়ে আসছি এ পেশা। সংসার চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।’ মোকররম হোসেন আরো বলেন, ‘নরপশুরা নুরজাহানকে ধরে নিয়ে গেছে, অত্যাচার করেছে। এটা তো তাঁর দোষ নয়। যারা এমন করেছে, তাদের দোষ। আমি মানুষ। তাই আমি নুরজাহানের পাশে দাঁড়িয়েছি। একটি অসহায় মেয়ের বেঁচে থাকার জন্য একটু অবলম্বন হয়েছি। তা ছাড়া সে তো খুব ভালো মেয়ে। একজন ভালো মানুষকে ভালোবাসাই তো মানুষের প্রধান ধর্ম।’ নুরজাহান বলেন, ‘মা মারা গেছে। বর্তমানে আমি ভাইয়ের দেওয়া ১২ শতাংশ জমিতে কোনো রকমে ঘর করে বসবাস করছি। আমার এক ছেলে, চার মেয়ে। অসুস্থতা পেয়ে বসেছে আমাকে। চার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি, আর ছেলেকে ভাইদের সহযোগিতায় বিদেশে পাঠিয়েছি। আমাকে সহযোগিতা করতে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা অনেক দৌড়ঝাঁপ করলেও কাজের কাজ হয়নি কিছুই। স্বাধীনতার ৪২ বছর পার হলেও পাইনি কোনো সরকারি সহযোগিতা। এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। তবে সরকারিভাবে কোনো স্বীকৃতি পেলে মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম। আমার স্বামী, সন্তান, ভাইয়েরাও পেত সামাজিকভাবে সম্মান। শেষ জীবনে এটুকু সম্মান আশা করা তো দোষের নয়।’ নুরজাহানের ছোট ভাই কোবেদ সেখ বলেন, “তিন বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছি। মা আর বোনই ছিল আমার সব। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছনের ঘরের মাটির ডোয়ায় আমি ‘জয় বাংলা’ লিখেছিলাম। আর এটিই ছিল আমার অপরাধ। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে রাজকাররা আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। লুটপাট করে। আমার মাকে রাইফেল দিয়ে আঘাত করে। আমার হাত বেঁধে ফেলে। তারপর আমাদের চোখের সামনেই ওরা নুরজাহানকে তুলে নিয়ে যায়। ওই ঘটনার ১২ দিন পর এলাকায় একটি গুলির শব্দ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজাকাররা আমাদের কয়েকজনকে আটক করে পাশের সোনাপুর বাজারের আজিজ মিয়ার রুটির দোকানে নিয়ে যায়। আমাকে এবং পাশের গ্রামের জমির উদ্দিন মুন্সি ও বাবলু মাস্টারকে জ্বলন্ত লাকড়ির মধ্যে ফেলে দেয়। আগুনে আমাদের তিনজনেরই শরীর ঝলসে যায়। সেই পোড়া দাগ এখনো আছে।’ তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ, খলিলুর রহমান, আবদুল লতিফ, শহর আলীসহ তাঁদের সঙ্গীরা একাত্তরের ১৭ ডিসেম্বর রাজবাড়ীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যৌথভাবে জেলা শহরের বিহারি কলোনিতে (বর্তমান নিউ কলোনি) অপারেশন চালান। এ সময় তাঁরা নুরজাহানকে উদ্ধার করেন এবং আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দেন। আমি ওই সব মুক্তিযোদ্ধার কাছে চিরঋণী।’ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল হোসেন বলেন, ‘এলাকার বীরাঙ্গনাদের খোঁজার উদ্যোগ আমরা নিয়েছিলাম। কিন্তু অনেকে মুখ খুলতে চান না। আবার অনেকে দেশ বা এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। তবে বীরাঙ্গনা নুরজাহানকে আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। তাঁর জন্য কিছু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ‘নুরজাহান বেগম একজন বীরাঙ্গনা। তাঁকে সহযোগিতা করার চেষ্টা আমরা করছি। উপজেলা পরিষদের মাসিক মিটিংয়ে আলোচনার পর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’