শীতের সকাল। দাদির সঙ্গে বসে ভুসির আগুনে তাপ পোহাচ্ছিলেন ১৪-১৫ বছরের জোহরা। বাবা জমিতে, মা পুকুরঘাটে। হঠাৎ তাঁদের বাড়িতে একদল পোশাকধারী পাকিস্তানি সেনার হানা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জোহরাকে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে যায় ওরা। জোহরার আর্তনাদ আর বৃদ্ধা দাদির চিৎকারেও কারো মন গলেনি। জোহরাকে নিয়ে যাওয়া হয় পাশের একটি ক্যাম্পে। পরদিন সকালে জোহরাকে যখন সেখান থেকে নিয়ে আসা হয়, তখন তিনি ছিলেন জ্ঞানহীন। একাত্তরের সময়কার সেই স্মৃতি মনে করে জোহরা বেগম একটু বিচলিত, কিছুটা লজ্জিত। এ প্রতিবেদককে বললেন, ‘অহন অ দুনিয়াডা অন্ধকার লাগে। কী অইল হেই দিন! মহিলারার কাছে তো তাঁর ইজ্জত, সম্মানডাঅই বড়। হেই দিন যদি মইরা যাইতাম গা, হেইডাঅই বালা আছিল। এই ঘটনার লাইগ্যা আমার বিয়া লইয়া যে কত জামেলা অইছে! না পাইরা আমার মা-বাফে আমারে ইন্ডিয়া নিয়া বিয়া দিছে।’ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের আবদুল্লাপুর গ্রামের বাসিন্দা এই বীরাঙ্গনা জোহরা বেগম। বয়স এখন ৫৬-৫৭ বছর। স্বামী রুস্তম মিয়া মারা গেছেন। বাবা ইদ্রিস মোল্লাও মারা গেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার ৪২ বছরেও বীরাঙ্গনা জোহরা বেগমের মেলেনি কোনো সরকারি স্বীকৃতি। এমনকি একাত্তরে নির্যাতিতাদের যে ‘বীরাঙ্গনা’ বলা হয়, সেটাও জানেন না তিনি। বরং দেশ স্বাধীনের পর মানুষের কটু কথা নিয়মিত পীড়া দিয়ে আসছে তাঁকে। কখনো আর্থিক সংগতি আসেনি জোহরা বেগমের। এখনো ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ অবস্থা। থাকেন চাচাতো ভাইদের বাড়িতে। তাঁর গর্ভের সন্তান তিনজন- দুই মেয়ে ও এক ছেলে। স্বামীর আগের সংসারে আছে তিন মেয়ে। সব মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র ছেলে একটি পলিথিন কম্পানিতে কাজ করে। অন্যের দয়া-দক্ষিণায় কোনোমতে দিন কাটে জোহরার। প্রতিবেশী মুক্তিযোদ্ধা মো. ছায়েব আলী বলেন, ‘আমাদের এলাকার দুজন বীরাঙ্গনার খোঁজ নিতে কয়েক মাস আগে সরকারি কিছু লোকজন এসেছিলেন। তাঁরা আমার বাড়িতে বসেই বীরাঙ্গনাদের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকারি কোনো স্বীকৃতি বা অনুদান তাঁদের ভাগ্যে জোটেনি।’ আখাউড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক দপ্তর সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন পাখি বলেন, ‘আখাউড়ায় পাঁচজন বীরাঙ্গনা আছেন। তাঁদের মতো সারা দেশের বীরাঙ্গনারা আজও অবহেলিত। স্বাধীনতার ৪২ বছরেও তাঁদের সরকারি কোনো স্বীকৃতি মেলেনি। আমরা চাই মৃত্যুর আগে যেন তাঁরা সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে যান।’ প্রতিবেশী আরেক বীরাঙ্গনা সুফিয়া বেগমের দেওয়া তথ্যমতেই খোঁজ মেলে জোহরা বেগমের। আরেক বীরাঙ্গনা সুফিয়াদের বাড়িতেই ডেকে আনা হয় জোহরা বেগমকে। এ পর্যন্ত কোনো সরকারি সহযোগিতা মিলেছে কি না জানতে চাইলে মাথা নেড়ে না সূচক উত্তর দেন তিনি। একাত্তরের সময়কার ঘটনা জানতে চাইতেই এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলেন। পাশে থাকা দুটি শিশুকে চলে যেতে বললেন। কিছু সময় চুপ থাকার পর বর্ণনা করলেন সেদিনকার নির্যাতনের কথা। বললেন, ‘বাবা, কইতে কষ্ট অয়। অহন অ নীরবে থাকলে হেই কতা মনে অয়। চোখের পানিতে বুক ভাইসসা যায়গা। একটা ক্যাম্পে নিয়া আমারে একদিন আটকাইয়া রাহে। আমার বাবা-মা গেলেঅ হেরা ছাড়ছে না। পরদিন সকাল বেলা এলাকার মুরুব্বি জমসিদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, আরু মিয়া (সবাই প্রয়াত) আমারে ক্যাম্পে থেইক্কা উদ্ধার কইরা লাইয়া আয়ে। আমার তহন গিয়ান আছিল না। মা-বাফে কত ডাক্তার দেহাইয়া যে আমারে বালা করছে! মেলা দিন হেই যন্ত্রণা বোগ করছি।’ স্বাধীনতার সময় জোহরা বেগমের পরিবার ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় চলে যায়। কিন্তু সেখানে থাকার মতো তেমন কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় আবার দেশে চলে আসে। তাঁদের বাড়ির পাশেই ছিল পাকিস্তানি ক্যাম্প। ওই ক্যাম্পের লোকজন প্রায়ই বাড়ির আশপাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করত। জোহরা বেগম জানান, তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময়ই অর্ধেক মরে গিয়েছিলেন ভয়ে। পরে ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করলে অজ্ঞান হয়ে যান। দেশ স্বাধীনের পর এসব নিয়ে নানাজনে নানা কথা বলে। এ কারণে তাঁর বিয়ে দেওয়া নিয়ে পরিবারের সবাই খুব সমস্যার মধ্যে পড়েন। ঘটনার সাত-আট বছর পরে তাঁকে ভারতের আগরতলায় নেয়ে বিয়ে দেওয়া হয়। জোহরা বেগম বলেন, আগের বউ মইরা যাওয়া তাইনের (স্বামী) ঘরে তহন তিনডা মাইয়া আছিল। বিয়ার ফরে আমার স্বামীর কাছে মাইনস্যে নানান কতা কয়। একদিন স্বামী আইয়া আমারে কতাডা হাছানি জিগাইছে। আমি সব কইছি। তখন আমারে তাইনে কইছে, ‘আমারে কইছ কইছ। এইসব কতা আর কেউর কাছে কইবা না। এমনকি পুলা-মাইয়ার কাছে অ না। আমার স্বামী নির্যাতনের কতা মাইন্না নিয়া আমারে আর কোনো দিন কিছু কইছে না।’ জোহরা বেগমের কাছ থেকে জানা যায়, ২০-২২ বছর আগে স্বামী মারা গেলে তিনি বাংলাদেশে চলে আসেন। তাঁর গর্ভের তিন সন্তানের মধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বিয়ের সময় সবাই সহযোগিতা করেন। একমাত্র ছেলে পলিথিনের কম্পানিতে কাজ শিখছেন। কোনো রকমে টেনে টুনে চলছে তাঁর সংসার। কথা বলার শেষ পর্যায়ে অনুমতি নিয়ে জোহরা বেগমের ছবি তোলা হয়। পত্রিকায় ছবি ছাপলে আবার লোকজন নানা মন্তব্য করে কি না- এমন প্রশ্ন তিনি ছুড়ে দেন এ প্রতিবেদকের কাছে। আবার পরক্ষণেই ছবি ছাপার অনুমতি দিয়ে বলেন, ‘বাবারা, আফনেরা যা বালা মনে করেন, তাই কইরেন। একাত্তরেই তো...।’