মুক্তিযুদ্ধের দুই দশক পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ‘মুক্তিযুুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গড়ে ওঠে। তাদের উদ্যোগে ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ অনুষ্ঠিত গণ-আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বীরাঙ্গনা দুলজান নেছা ঢাকায় গিয়েছিলেন। একাত্তরে তাঁর ওপর পাকিস্তানি হানাদারদের চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বাড়ি ফেরার পর এলাকাবাসী তাঁকে ‘একঘরে’ করে দেয়। তাঁর সঙ্গে কথা বলা তো দূরের কথা, পিপাসার পানিটুকুও দেওয়া বন্ধ করে দেয় প্রতিবেশীরা। দুই বছর ধরে এ অবস্থা চলার পর স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতারা গ্রামে গিয়ে তাঁর গৌরবজনক অবদানের কথা তুলে ধরায় সেই অবস্থার অবসান ঘটে বটে, কিন্তু গ্রামবাসীর অনেকের অবহেলা আর উপহাসের হাত থেকে তাঁকে বাঁচাতে পারেনি কেউ। রাজাকারদের দোসর ও অনুসারী জামায়াত-শিবিরের লোকজন এখনো আঙুল তুলে দেখায়, ওই যে দুলজানের বাড়ি। তাই এখনো গুমরে কাঁদতে হয় বীরাঙ্গনা দুলজানকে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পেরোলেও আজও সামাজিক লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা সহ্য করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাঁকে। আজও তিনি শরীরে সে সময়ের নির্যাতনের চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন। ভুগছেন জটিল রোগে। চিকিৎসা তো দূরের কথা, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটুকুও ভাগ্যে জোটেনি তাঁর। একাত্তরের সেই নির্যাতনের কথা মনে করে কেঁদে ফেলেন দুলজান। চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘রাজাকারদের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় উঠলিও দেশের জন্যি এতো ত্যাগ স্বীকার করলাম, আমার নাম ওই তালিকায় উইঠল না। বয়সও শেষ। তাই মরার আগে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নিজের নামডা দেখি যাতি চাই।’ কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের দয়রামপুর গ্রামে দুলজান নেছার বাড়ির উঠানে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁর স্বামী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা একাত্তরের এক ভোররাতে পদ্মার পারে তাঁদের বাড়িটি ঘিরে ফেলে। এরপর নির্যাতন শেষে রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে তাঁর সারা শরীর রক্তাক্ত করে দেয়। এখনো বুক ও পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। শুধু তাই নয়, হানাদারদের অমানুষিক নির্যাতনে তাঁর পঙ্গু স্বামী মুক্তিযোদ্ধা তেছের আলী মণ্ডল দীর্ঘ রোগ ভোগের পর বিনা চিকিৎসায় ২০০২ সালে মারা যান। দুলজান বলেন, ‘আমিও ওই পথের পানে আছি। বুকের ব্যথায় কাজ-কাম করতি পারিনি বাবা। ওষুধ কিনার পয়সা নেই। বাড়িতে মুরগি ডিম দেয়। সেই ডিম বেচে ওষুধ কিনে খাচ্ছি।’ দুই ছেলে আর তিন মেয়ের জননী দুলজান নেছা আক্ষেপ করে বলেন, সুস্থ-সবল মানুষ বিয়ে করে না বলে অন্ধ-খোঁড়া দেখে আমার মেয়েদের বিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু একাত্তরে আমার ওই অবস্থার জন্যই এক মেয়ে ময়নার সুখের সংসার পর্যন্ত ভেঙে গেছে। সেই মেয়ে এখন কুষ্টিয়া শহরে মেসে ঝিয়ের কাজ করে। বড় ছেলে শরিফুল মাঠে কৃষি কাজ করে। ছোট ছেলে খোকন দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে এখন অন্যের দোকানের কর্মচারীর কাজ করে। বড় মেয়ে শাহানা ঢাকায় গার্মেন্টে কাজ করে আর এক মেয়ে পারভিন শ্বশুরবাড়িতে। বীরাঙ্গনা দুলজান নেছা জানান, একাত্তরের নির্যাতনের বিষয়টি চাপাই ছিল। কেউ জানত না। কিন্তু গণ-আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার পর সব জানাজানি হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আমিসহ আমার পাশের বাড়ির অন্য দুই বীরাঙ্গনাকেও আমার মতো বিপাকে পড়তে হয়। দুলজানের কথা, আমার যা হওয়ার হয়ে গেছে। এই অবস্থা যেন পৃথিবীর আর কোনো নারীর না হয়।’ দুলজানের বড় ছেলে শরিফুল মণ্ডলের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনার কাছে জোড়হাত করছি, আমার মাকে নিয়ে আর কিত্তি করবেন না। অনেক হয়ছে। আমরা বড় হয়ছি। সমাজে চলতি হয়। নানান সমস্যা হয়। পারলি দেশের জন্যি আমার মার অবদানের জন্যি তার প্রাপ্য সম্মানটুকুন দিবার চেষ্টা করেন। আল্লা আপনাগের ভালো করবে।’ দুলজানের মেয়ে শাহানা মোবাইল ফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার মায়ের অবদানের স্বীকৃতির জন্য আমি নিজে বহুবার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান ও সচিবের কাছে গিয়েছি। কিন্তু কোনো ফল পাইনি। আর কত কষ্ট করলে আমার মা মরার আগে তাঁর সম্মানটুকু পাবেন?’ এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নাছিম উদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর নির্যাতিত অসহায় বীরাঙ্গনাদের সংগঠিত করে পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাঁদের বেঁচে থাকার অবলম্বন তৈরি করা হয়েছিল, যার সুফলও অনেকে পেয়েছেন। কিন্তু কুষ্টিয়ার দুলজান নেছাসহ কয়েকজন বীরাঙ্গনার তেমন কিছুই হয়নি। যাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা এসেছে, তাঁদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি যথাযথ পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা আরো অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আমি মনে করি।’ কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর কিছুদিন আগে আমি দুলজান নেছাসহ কুমারখালীর চার বিরাঙ্গনার গৌরবময় ত্যাগের স্বীকৃতির ব্যাপারে মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে অবহিত করেছি। আশা করি, তাঁরা তাঁদের পাপ্য সম্মানটুকু পাবেন।