গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের লতিফপুর গ্রামের রমিজ উদ্দিন মোড়লের স্ত্রী মোমতাজ বেগম। দেবর আলাউদ্দিন মোড়ল জসিম দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা। সে কারণে একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রোশে পড়ে পরিবারটি। অমানুষিক নির্যাতনের পর বেঁচে থাকার স্পৃহা হারিয়ে ফেলেছিলেন বীরাঙ্গনা মোমতাজ। কিন্তু স্বামীর সশ্রদ্ধ ভালোবাসা তাঁকে বিধ্বস্ত জীবন নিয়েও বেঁচে থাকার প্রেরণা জুগিয়ে আসছে। রমিজ উদ্দিন মোড়ল সহায়-সম্বল সব কিছু বিক্রি করে অসুস্থ স্ত্রী মোমতাজের চিকিৎসা করিয়েছেন। বীরাঙ্গনা স্ত্রীর চিকিৎসায় সরকারি-বেসরকারি কোনো দান-অনুদান পাননি তিনি। তাতেও কোনো আক্ষেপ ছিল না রমিজের। তিনি প্রচণ্ড কষ্ট পেতেন বীরাঙ্গনা স্ত্রীর প্রতি প্রতিবেশী কারো বিদ্রুপ-শ্লেষে। ভাঙা শরীর নিয়ে কৃষিশ্রম বিক্রি করেছেন রমিজ। ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফিরে তিনি নিজের হাতে রান্না করে অসুস্থ স্ত্রীর মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। কিন্তু প্রায় আড়াই মাস ধরে রমিজ উদ্দিন নিজেও গুরুতর অসুস্থ। অর্থের অভাবে চিকিৎসা মিলছে না। উপার্জনের কেউ না থাকায় স্বজন-প্রতিবেশীদের অনুকম্পায় একদিন দুই মুঠো ডাল-ভাত জুটলেও পরদিন উপোষ দিতে হচ্ছে। অথচ স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪২ বছরেও স্বীকৃতি মেলেনি তাঁর অমূল্য ত্যাগের। তবে জীবন সায়াহ্নে তিনি আর বীরাঙ্গনার সম্মান চান না। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চান। জীবদ্দশার কষ্টকে তিনি হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সম্মান চান বীরাঙ্গনা মোমতাজ। স্ত্রীর ওপর পাকিস্তানি সেনাদের পৈশাচিক নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রমিজ উদ্দিন। ভারি কণ্ঠে বলেন, তাঁর ছোট ভাই আলাউদ্দিন মোড়ল জসিম মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। ফলে গ্রামের রাজাকাররা তাঁদের পরিবারের প্রতি ক্ষিপ্ত ছিল। দিন-রাত রাজাকাররা বাড়ি এসে জসিমের খোঁজ করত। পাকিস্তানি সেনারা শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে তাঁবু ফেলে। একাত্তরের ৭ জুন সকালে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপারে কাপাসিয়ার তরগাঁও ইউনিয়নের বাগিয়ায় অবস্থান নেয় মুক্তিযোদ্ধারা। নদীর এপার লতিফপুর গ্রামে তাঁবু ফেলা পাকিস্তানি সেনাদের লক্ষ্য করে মুক্তিযোদ্ধারা বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়ে। সাড়ে চার ঘণ্টার গুলিবিনিময়ে অনেক পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। বিকেলের দিকে স্থানীয় সাত-আটজন রাজাকারসমেত একদল পাকিস্তানি সেনা অতর্কিতে রমিজদের বাড়িতে হানা দেয়। প্রথমে তারা মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন মোড়ল জসিমের খোঁজ করে। কোনো সাড়া না পেয়ে বাড়িতে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে সেনারা। একপর্যায়ে বন্দুক উঁচিয়ে ঘরে ঢুকে চৌকির নিচে চার নারীকে খুঁজে পায়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মোমতাজ বেগম। তখন তিনি ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। হানাদাররা তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সারা রাত অনেক খোঁজাখুঁজির পর গ্রামের একটি আখক্ষেতের ভেতর মোমতাজের রক্তাক্ত অসাড় দেহ পাওয়া যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে রমিজ উদ্দিন নৌকাযোগে ঢাকায় নিয়ে যান। ভর্তি করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। টানা চার বছর চিকিৎসা চলে মোমতাজের। তিনি বেঁচে গেলেও স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরে আসেননি। রমিজ উদ্দিন জানান, নির্যাতনে মোমতাজের গর্ভের সন্তান মারা যায়। হাসপাতালে ৯ দফা অস্ত্রোপচার হয়। অবশেষে তাঁর জীবন বাঁচাতে যৌনাঙ্গ ও মলদ্বার অস্ত্রোপচার করে বন্ধ করে দেন চিকিৎসকরা। নাভির খানিকটা নিচে পেট কেটে বিকল্প পয়ঃনালি তৈরি করে দেন। এভাবেই জীবনের পরবর্তী ৩৮টি বছর পার করছেন এই বীরাঙ্গনা। স্মৃতিচারণা করে মোমতাজ বেগম জানান, পাকিস্তানি পিশাচরা স্থানীয় রাজাকারদের নিয়ে বাড়িতে হানা দিলে ঘরের দরজার খিল এঁটে শাশুড়ি ও দুই জাকে নিয়ে চৌকির নিচে এক কোণে জবুথবু হয়ে বসে থাকেন। সেনারা এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ার পর দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকে। তারা চৌকির নিচে চার নারীকে দেখতে পেয়ে বন্দুকের বাঁট দিয়ে গুঁতিয়ে বের করে এনে মোমতাজকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। তাঁর বয়স তখন ২২ বছর। দুই কন্যার জননী তিনি। বড় মেয়ে নিলুফা ইয়াসমীন ও ছোট মেয়ে জাকিয়া সুলতানা। দুই মেয়ের বিয়ে দিলেও দুজনেরই ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা। স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত রমিজ উদ্দিনও আড়াই মাস ধরে লিভারের জটিল রোগে আক্রান্ত। গত ২৯ অক্টোবর ঢাকার মিডফোর্ট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু টাকার অভাবে ১৭ দিন পর চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখেই বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাঁকে। তীব্র অভাব ও অসুস্থতায় দুর্বিষহ জীবন কাটলেও কারো কাছে হাত পাততে রাজি নন এই বীরাঙ্গনা। মোমতাজের ভাষায়, ‘না খাইয়া মইরা যায়াম, ভিক্ষা করতাম না গো বাবা।’ স্বাধীনতার ৪২ বছর পার হলেও মোমতাজ বেগম কোনো ধরনের স্বীকৃতি পাননি। কোথাও কখনো ধরনাও দেননি। শ্রীপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সিরাজ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, মোমতাজ স্বীকৃতির জন্য কখনো আসেননি। ১৯৯৮ সালে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। বীরাঙ্গনা হিসেবে গেজেটে মোমতাজ বেগমের নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। গাজীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার কাজী মোজাম্মেল হক বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের মতো বীরাঙ্গনাদের সরকারি কোনো ভাতা নেই। মোমতাজের দুর্দশার কথা জেনে তাঁর জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একটি বাড়ি করে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলাম। সেটা পাস হয়েছে। গত ১৫ মে বাড়ি নির্মাণের জন্য টেন্ডার হয়েছে। ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ইতিমধ্যে বাড়ির কাজ শুরু হয়েছে।’