একাত্তরে টানা ৪৪ দিন আটকা ছিলেন পাকিস্তানিদের বন্দিশিবিরে। দেশ স্বাধীনের পর সেখান থেকে উদ্ধার হলেন। কিন্তু ফিরে যেতে পারলেন না পরিবারে। চেষ্টা করেছিলেন বেশ কয়েকবার। দূরদূর করে তাড়িয়ে দিয়েছেন আপনজনেরা। কারণ তখনো বীরাঙ্গনা নূরজাহান বেগমকে (১৬) মেনে নেননি স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজ, সংসার, পরিবার, এমনকি সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধারাও। এখানেই শেষ নয়। লাঞ্ছিত বীরাঙ্গনাকে প্রয়োজন হলে বিয়ে করে সামাজিক প্রতিষ্ঠা দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সহযোদ্ধা কম্পানি কমান্ডার; লজ্জায়, ঘৃণায়, অপমানে, অভিমানে তাঁর কাছেও ফিরে যাননি নূরজাহান। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় গৌরবোদীপ্ত রাজধানীর জনারণ্যে মিশে গিয়ে মুক্তি সংগ্রামী নূরজাহান শুরু করেছিলেন আরেক জীবনসংগ্রাম। অজানা মানুষের ভিড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন বস্তিতে। ঝিয়ের কাজের পাশাপাশি মহিলা-মুর্দার গোসল, প্রসূতির ধাত্রীর কাজ কোনোটিই বাদ দেননি তিনি। পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে সর্বস্বহারা বীরাঙ্গনা নূরজাহান বেগম আজ জীবনসায়াহ্নে। ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বললেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনী আমাকে প্রাণে না মারলেও আমার আÍার অপমৃত্যু ঘটিয়েছে। বাবা শহীদ হয়েছেন, স্বামী নেই, ছেলেও পঙ্গু। পাশাপাশি দুঃসহ এই একাকিত্ব সবই একাত্তরের অবদান। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো স্বীকৃতি পেলাম না।’ শহীদ হলেন বাবা : ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নূরজাহান বেগম ওরফে নূরী কিশোরী। থাকেন পৈতৃক ভিটা গৌরনদীর বাটাজোর ইউনিয়নের বাংকুরাত (চন্দ্রহার) গ্রামে। জুনের দিকে পাকিস্তানি বাহিনী হানা দেয় গৌরনদীতে। ওরা বাঙালিদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিল। অন্যান্য গ্রামবাসী পালিয়ে প্রাণ বাঁচালেও নূরীর বয়োবৃদ্ধ বাবা মোহাম্মদ ফকির ভিটে-মাটির মায়ার জালে আটকা পড়েন। এমনি একদিন সকালবেলা পাকিস্তানি হানাদাররা এসে চড়াও হয় তাদের ঘরে। নূরী আÍরক্ষার জন্য পুকুরে নেমে লুকিয়েছেন, তখন হানাদাররা গানপাউডার লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয় তাঁদের ঘরবাড়িসহ যাবতীয় সহায়-সম্পদ। রাইফেলের বাঁটের আঘাতে গুরুতর আহত বাবা কিছু দিনের মধ্যেই মারা যান। সদ্য বিধবা মাকে নিয়ে নূরী তখন দিশেহারা। একমাত্র ভাই আব্দুর রব সে সময় কাজ করতেন খুলনার একটি বরফকলে। যুদ্ধের সময় তার সঙ্গেও পরিবারের যোগাযোগ ছিল বিচ্ছিন্ন। ফলে কয়েকটি মাস নূরী আর তাঁর বৃদ্ধ মাকে জলে-জঙ্গলে লুকিয়ে বেড়াতে হয়েছে। অন্ধকার নামলে পোড়া ভিটায় এসে কোনোমতে রাত কাটিয়েছেন। পিতা হত্যার প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধে : শহীদ পিতা আদর করে যে মেয়ের নাম রেখেছিলেন নূরজাহান-বিশ্বের আলো, তাঁর বুকে তখন দেশপ্রেম আর প্রতিশোধের আগুন। সেই আগুনের উত্তাপে পাগলীনিপ্রায় নূরী যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তাই বিধবা মাকে এক নিকটাÍীয়ের জিম্মায় রেখে ছুটে যান স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নুর হোসেন ওরফে নুরু কমান্ডারের কাছে। অনুনয়-বিনয় করলেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ আর প্রশিক্ষণ গ্রহণের। কিন্তু পরিবেশ-পরিস্থিতিগত কারণে ওই বয়সী মেয়েকে ক্যাম্পে রাখা সমীচীন মনে করলেন না নুরু কমান্ডার। তিনি নূরীকে বুঝিয়েসুজিয়ে পাঠিয়ে দিলেন গ্রামের বাড়িতে। এবারে নূরী গেলেন কিছু দূরের আরেক মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের কমান্ডার নিজাম উদ্দীনের কাছে। তিনিও একই অজুহাত দেখিয়ে ফিরিয়ে দিলেন নূরীকে। এর পরও যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মনোবল হারালেন না তিনি। আবার এলেন নুরু কমান্ডারের কাছে। তাঁর হাতে-পায়ে ধরে অনুরোধ জানালেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিলে আÍহননের হুমকি দিলেন। অবশেষে নুরু কমান্ডার সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ নূরীকে দায়িত্ব দিলেন সংবাদ আদান-প্রদানকারী, গুপ্তচর বা ইনফর্মার হিসেবে। বিচিত্র বেশ, পরিচয় ও যোগাযোগে নূরী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পগুলোরর মধ্যে তথ্য-সংযোগ রক্ষার পাশাপাশি হানাদার-দোসর রাজাকারদের মনোবল ভাঙার কাজেও লিপ্ত ছিলেন। গুপ্তচরের সময় গুলিবিদ্ধ : বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের শিকারপুর খেয়াঘাট ছিল তখন হানাদারদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঘাঁটি। মহাসড়কের পাশে গৌরনদী কলেজে স্থানীয় কমান্ডপোস্ট তৈরি করে হানাদার ও তাদের দোসররা শিকারপুর, মাহিলাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় তৈরি করেছিল ফাঁড়ি ও বাঙ্কার। শিকারপুরে এ ধরনেরই এক রাজাকার ক্যাম্পে ছিলেন নূরজাহানের দূরসম্পর্কের খালু বিলুবাড়ী গ্রামের রাজাকার সুরত আলী। তার মারফর হানাদার হায়েনাদের অনেক গুরুপূর্ণ খবর আনতেন নূরজাহান। ওই ক্যাম্পের রাজাকাররা পালাতে এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চায় বলে নূরজাহানের মাধ্যমে একদিন খবর আসে নূরু কমান্ডারের কাছে। এ ব্যাপারে আরো গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে ৫ নভেম্বর নূরজাহানকে পাঠানো হয় রাজাকারদের শিকারপুরের ক্যাম্পে। কিন্তু তত দিনে হানাদার ও তাদের দোসরদের একটি অংশ নূরজাহানের চালচালনে সন্দেহজনক গতিবিধি খুঁজে পাওয়ায় তাঁর ওপর নজর রাখতে শুরু করে। এ অবস্থাতেই ৫ নভেম্বর শিকারপুর রাজাকার ক্যাম্পের কাছে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে গৌরনদীর দিকে হতে আগত একটি মিলিটারি কনভয়ের সামনে পড়েন নূরজাহান। হানাদার দোসররা তাঁকে মুক্তিযোদ্ধাদের চর হিসেবে চিনতে পেরে থামতে বললে নূরজাহান দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এরপর ডান পায়ে গুলিবিদ্ধ করে ধরাশায়ী করা হয় নূরজাহানকে। মহাসড়কের ওপর ফেলেই রাইফেলের বাঁট দিয়ে মেরে থেঁতলে দেওয়া হয় তাঁর মাথাসহ পুরো শরীর। তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তথ্য আদায়ের জন্য ওই অবস্থায় তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় শিকারপুর ক্যাম্পে। সেখানে কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা ও লাঞ্ছনা-নিপীড়নের পর কোনো পল না হওয়ায় ৭ নভেম্বর তাঁকে পাঠানো হয় হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর আঞ্চলিক কেন্দ্র গৌরনদী কলেজ মিলিটারি ক্যাম্পে। দুঃসহ ৪৪ দিন : ৭ নভেম্বর থেকে দীর্ঘ ৪৪টি দিন মুক্তিবাহিনীর হাতে হানাদার ক্যাম্পের পতন হওয়া পর্যন্ত (১৮ ডিসেম্বর) নূরীর জীবনে শুধুই পাকিস্তানি পশুদের নির্যাতনের অবর্ণনীয় যন্ত্রণার ইতিহাস। নির্যাতনের ফাঁকে ফাঁকে গুপ্তচর হিসেবে তথ্য উদ্ধারের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া ও জনমতে ত্রাস সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কলেজের পুকুরে পৌষ-মাঘের শীতে গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো নূরজাহানকে। দেশ স্বাধীনের দুই দিন পরে ১৮ ডিসেম্বর পতন ঘটে গৌরনদী কলেজের মিলিটারি ক্যাম্পের। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বন্দি হয় ক্যাম্পপ্রধান ক্যাপ্টেন কাহহারসহ দুই শতাধিক পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার। ওই সময়েই ক্যাম্প হতে মুক্তিবাহিনী উদ্ধার করে নূরজাহানসহ ১৪ জন বাঙালি বীরাঙ্গনাকে। তৎকালীন পরিবেশের প্রতিকূলতায় তাঁদের নাম-পরিচয় তালিকাভুক্তকরণ, চিকিৎসা বা প্রাপ্য সম্মান প্রদানের কোনো ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। ২৯ বছর আড়ালে : হানাদার হায়েনাদের গ্রাসে অনেক বাঙালি নারী উচ্ছিষ্ট হয়েছেন ধরে নিয়ে বীরাঙ্গনাদের হত্যা বা নর্দমার পাঁকে ঠেলে দিতে চেয়েছে অনেকেই। আত্মীয়স্বজন, সহযোদ্ধা ও সমাজের কাছ থেকে এই আচরণ আরো বড় অপমান হয়ে দেখা দিয়েছিল নূরজাহানের কাছে। বিধবা মায়ের মায়ায় আত্মহনন থেকে নিবৃত্ত থাকলেও অসীম মানসিক কষ্ট বয়ে বেড়ান সেই থেকে। শত অপমান ও লাঞ্ছনার মধ্যেও বীরাঙ্গনা নূরজাহান বেঁচে রইলেন দুজন মহৎপ্রাণ মানুষের সেবা আর আশ্রয়ে। তাঁদেরই একজন ধানমণ্ডি লেকের পারে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাছের মানুষ দেলোয়ার হোসেন। তাঁরই মাধ্যমে ১৯৭৩ সালের কোনো একসময় ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাড়িতে সাক্ষাৎ পেলেন জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের। বঙ্গবন্ধু তাঁকে আশীর্বাদ করে বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনাদের অবদান ধারণ ও মূল্যায়নের উপযুক্ত ব্যবস্থা করা হবে।’ যাঁর নির্দেশে শুরু হয়েছিল এই মুক্তিযুদ্ধ, স্বয়ং তাঁর কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে নূরজাহান ফিরে পেলেন নতুন করে বাঁচার আশা। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেষ হয়ে গেল সব স্বপ্ন। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। মীরপুরে পূর্ব কাজীপাড়ার মাতুব্বরের পুকুরপাড়ের বস্তিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিলেন। সেখানে থেকেই জীবনধারণের জন্য বস্তির আশপাশের বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ শুরু করলেন বীরাঙ্গনা নূরজাহান। নতুন জীবনও দিল ফাঁকি : ১৯৭৬ সালের কোনো একসময় নূরজাহানের সঙ্গে পরিচয় হয় গোপালগঞ্জ এলাকার আরেক মুক্তিযোদ্ধা কামরুজ্জামানের। বীরাঙ্গনা পরিচয় জেনেই তিনি নূরজাহানকে বিয়ে করে সম্মান জানাতে চান। কামরুজ্জামান (৫৫) তখন ঢাকায় দিনমজুরি ও রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু ওই স্বামী-সংসারের সুখও নূরজাহানের কপালে সয়নি বেশি দিন। ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে একমাত্র সন্তান সাদেকুজ্জামান সুমনকে (তিন মাস) রেখে মারা যান মুক্তিযোদ্ধা কামরুজ্জামান। এরপর সন্তান প্রতিপালনের তাগিদে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ভিশন’র সহযোগিতায় ধাত্রীবিদ্যার প্রশিক্ষণ নেন নূরজাহান। ঝিয়ের কাজের পাশাপাশি বস্তিতে মহিলা মুর্দার গোসল আর প্রসূতিদের দাইয়ের কাজ করতেন। এ কাজেরই একপর্যায়ে মা-বাবা পরিত্যক্ত এক নবজাতক কন্যাকে বুকে আশ্রয় দিয়েছেন এই বীরাঙ্গনা জননী। সেই কন্যা দোলনের বয়স এখন ২৫ বছর। বিয়ে দিয়েছেন, পেয়েছেন নাতি-নাতনি। তাঁদের নিয়েই আছেন নূরজাহান। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি একটিবারের জন্যও আ্ত্মীয়স্বজনের কাছে যাননি। তাঁরাও নূরজাহানকে এড়িয়ে চলেছেন। একমাত্র ভাই আব্দুর রব ঢাকায় থাকলেও বোনের খোঁজ নেননি। গর্বিত ছেলের একটিই আক্ষেপ : মুক্তিযোদ্ধা এনায়েত হোসেন চৌধুরী বলেন, ১৯৯৯ সালের ফেব্র“য়ারিতে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তিকরণ ও বাছাইয়ের সভায় গৌরনদী কলেজে পাওয়া এলাকার বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী বাটাজোড়ের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোতালেব নূরজাহানকে খুঁজে ঢাকা থেকে বরিশালে পাঠান। ২০০০ সালের ১৭ এপ্রিল ‘মুজিবনগর দিবসে’ বরিশাল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তাঁকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। পরে তিনি আবার ফিরে যান ঢাকার মিরপুরে। বীরাঙ্গনা নূরজাহান বেগমের ছেলে সুমন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। প্রতিপক্ষের লোকজন ১৯৯৬ সালে সুমনের ওপর হামলা চালিয়ে তাঁর ডান হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এর পর থেকে মা তাঁর ছেলেকে যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছেন। মিরপুর এলাকায় তিনি ছোট একটি দোকান দিয়েছেন। মায়ের বীরাঙ্গনা পরিচিতিতে গর্বিত ছেলে সুমনের শুধু একটিই আক্ষেপ-দাদা আর নানাবাড়ির আত্মীয়রা তাঁর মাকে মেনে নেয়নি।