kalerkantho


পেছনের গল্প

সিয়েরা লিওনের হৃদয় হতে একুশের সুর

বাংলাকে সম্মানসূচক দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদা দিয়েছে সিয়েরা লিওন। আর তাই ভাষার মাসজুড়ে টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় প্রচারিত হয়েছে সিয়েরা লিওনে শুটিং করা গ্রামীণফোনের একটি বিজ্ঞাপন। স্থানীয়দের অংশগ্রহণে বিজ্ঞাপনটি তৈরি করেছেন অমিতাভ রেজা। পেছনের গল্প জানাচ্ছেন বিজ্ঞাপনটির কপিরাইটার মেহেদী হাসান আনসারী

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সিয়েরা লিওনের হৃদয় হতে একুশের সুর

লাক্কা বিচে চলছে শট নেওয়ার প্রস্তুতি

যেভাবে শুরু

 

আমি নব্বইয়ের দশকের কিশোর। সেবা প্রকাশনীর সুবাদে হাতে আসে হ্যাগার্ডের গল্পগুলো।

সেই প্রথম আফ্রিকার সঙ্গে সখ্য। কী অসাধারণ বর্ণনা, কী রহস্য! তখন কি ভুলেও ভেবেছি যে একদিন ঠিকই উড়ে যাব সেই আফ্রিকায়। তাও আবার বাংলার টানে সুদূর সিয়েরা লিওনে?

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সিয়েরা লিওনে বানানো গ্রামীণফোনের একুশের বিশেষ বিজ্ঞাপনের অংশ হতে পারাটা আমার ১১ বছরের অ্যাডভার্টাইজিং ক্যারিয়ারের অন্যতম গৌরবময় আর রোমাঞ্চকর অধ্যায়।

বিজ্ঞাপন জগতে প্রচলিত কথাটা হলো ‘আউট অব দ্য বক্স’। কিন্তু চিন্তাটা যে বক্স ছাড়িয়ে একেবারে সীমানা পেরিয়ে যাবে, তা বোধহয় অতিকল্পনাই ছিল।

সিয়েরা লিওন কেন?

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বংলাদেশের সেনাবাহিনী গিয়েছিল সিয়েরা লিওনে। নিজ উদ্যোগে স্কুল করে দেওয়া, রাস্তাঘাট নির্মাণ, চিকিৎসাসেবা আর আন্তরিক ব্যবহারের মাধ্যমে তারা হয়ে উঠে সে দেশের মানুষের আপনজন। এই ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবেই দেশটির ওই সময়কার সরকার বাংলাকে দেয় সম্মানসূচক দ্বিতীয় দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা। তাই গ্রামীণফোনকে যখন আমরা বিষয়টি জানালাম তারা সিয়েরা লিওনে ক্যাম্পেইন করার দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল।

ক্লায়েন্ট রাজি। গল্পও তৈরি। এবার কাজে নামার পালা। এত বড় কাজ এক-দুজনের পক্ষে সম্ভব নয়। কাকে পার্টনার হিসেবে নেওয়া যায় ভাবতেই মাথায় এলো ব্র্যাকের নাম। সিয়েরা লিওনেও তাদের বিশাল উপস্থিতি। গ্রামীণফোন ও গ্রে তাদেরকে বিষয়টি জানাতেই রাজি হয় ব্র্যাক। কিন্তু ভিসা? এগিয়ে এলেন সিয়েরা লিওনে বাংলাদেশের অনারারি কনস্যুলেট জেনারেল অনু জায়গিরদার। বয়সকে হার মানানো এই ভদ্রলোক ভিসা প্রসেসিংসহ সিয়েরা লিওনে থাকার সব বন্দোবস্ত করে যে ঋণের জালে আমাদের বেঁধেছেন তা শোধ করা যাবে না।

জলগাড়িতে আটলান্টিকে...

১০ জনের টিম। গ্রে থেকে আমরা তিনজন—জাইয়ান উল হক, আয়েশা ফারজানা আর আমি। সঙ্গে অমিতাভ রেজার নেতৃত্বে প্রোডাকশন হাউস হাফ স্টপ ডাউনের সাতজন। যত দিন ঘনিয়ে আসে উত্তেজনা বাড়ে।

এবোলার আতঙ্কও ছিল। পরে অবশ্য সেটা নিয়ে আর টেনশন করতে হয়নি। তার পরও পুরো টিম ইয়েলো ফিভার আর মেনিনজাইটিসের টিকা নেয়। এ ছাড়াও ব্যাগভর্তি ওষুধ নিয়েছিলাম। ওগুলো পরে আর খেতে হয়নি। দলের তিন সদস্য আয়েশা, আইরিন আর সকাল শুটিং স্পট রেকি করতে আগেই সিয়েরা লিওন রওনা দেন। বাকি সাতজন ২৮ জানুয়ারি উড়োজাহাজে চেপে বসি। ৩০ ঘণ্টার পথ। ঢাকা থেকে আবুধাবি; তারপর কাসাব্লাঙ্কায় ১৭ ঘণ্টার ট্রানজিট। অতঃপর সিয়েরা লিওন ফ্রি-টাউনের লুঙ্গি এয়ারপোর্ট। কড়া মেডিক্যাল চেকআপের পর ইমিগ্রেশন পার হলাম। আসল চমক তখনো বাকি। মধ্যরাতে ছোট্ট একটি ওয়াটার বাসে করে আটলান্টিকের ওপর দিয়ে শহরের অপর প্রান্তে যেতে হবে। দোয়া-কালাম পড়ে উঠে পড়লাম ওয়াটার বাসে। ঘুটঘুটে অন্ধকার, প্রকাণ্ড ঢেউ আছড়ে পড়ছে। দুলতে দুলতে চলে যাই ওই পাড়ে। এরপর ব্র্যাকের গাড়িতে করে সোজা গেস্টহাউসে।

লাক্কা বিচে আবেগের ঢেউ

পরদিন সকালে সদলবলে বেরিয়ে পড়লাম শুটিং করব বলে। আগেই স্থানীয় শিল্পীদের দিয়ে অমর একুশের গানটির ডেমো রেকর্ডিং হয়েছিল (পরে স্টুডিও কাউবেলের শোয়েবের অনবদ্য কম্পোজিশনে গানটা দারুণ কিছু হয়ে যায়)। বাংলাদেশ সিয়েরা লিওন ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্স ইদ্রিস কামারা আর ব্র্যাকের পাসকেল— এ দুজন না থাকলে হয়তো বা এত চমৎকার একটি আয়োজন দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে পারতাম না। স্থানীয় গায়ক-গায়িকা, শিল্পী, স্কুলপড়ুয়া ও সাধারণ গ্রামবাসী জোগাড়, লোকেশন বাছাই— প্রতিটি কাজেই তাঁদের অবদান ছিল অনেক।

প্রথম লোকেশন লাক্কা বিচ। এ সৈকতের সৌন্দর্য কোনো শব্দে বাঁধা যাবে না। প্রথম শট—সৈকতের পার ধরে সিয়েরা লিওনের অনেকে হাঁটতে হাঁটতে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গাইল। আবেগে আমরা রীতিমতো আপ্লুত। এ অনুভূতিও বোঝানো যাবে না। আমরা স্থানীয় এক বৃদ্ধাকে একুশের গল্পটা বললাম। তিনি গানটা গাইতে গাইতে কেঁদেই ফেললেন। সবাইকে দেখে দেখে ছোট্ট আয়েশার ঠোঁট মেলানোর চেষ্টাটাও খুব আদুরে ছিল। স্থানীয় স্কুলের একঝাঁক শিশু থেকে ইউনিভার্সিটির তরুণ-তরুণী, গ্রামবাসী সবাই হাজির। সবারই সেকি আন্তরিক প্রয়াস। চমৎকার ক্যামেরা চালালেন ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি নেহাল ভাই। প্রডিউসার সকাল ভাই দক্ষ পাইলটের মতো চালালেন ড্রোন। গ্রামবাসীদের নিয়ে আইরিন আর আয়েশা ফারজানার নিরলস রিহার্সেলও ছিল দেখার মতো।

উপরি পাওনা!

শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে ছিল সিয়েরা লিওনের খাবার। তাজা মাছ আর রসালো ফলের স্বাদ এখনো জিভে লেগে আছে। অধিবাসীদের বেশির ভাগই মুসলমান।

গরুর মাংসটা তাই সেখানে জনপ্রিয়। এদিকে জানতে পারলাম, দেশজুড়ে আছে অসংখ্য হিরার খনি। কিছু কিছু অঞ্চলে দুই ফুটের বেশি খোঁড়া নিষেধ। কারণ খুঁড়লেই বেরিয়ে আসে অপরিশোধিত হীরা। পাহাড়ের কোলঘেঁষা চমৎকার সব রাস্তাঘাট। পোর্শে, জাগুয়ার আর বিএমডাব্লিউ অহরহই চোখে পড়বে। ঐতিহাসিক স্থাপনা আর ঊনবিংশ শতকের ফোর বে কলেজে ঘুরে মুগ্ধ হয়েছি।

বিদায়ের ঘণ্টা

সিয়েরা লিওনের অর্থ সিংহ পাহাড়। সিংহের মতোই সাহসী কিন্তু প্রচণ্ড আবেগি মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা হওয়াটাই ছিল আমাদের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। তাদের নিয়ে সাত-আটটি লোকেশনে টানা তিন দিন শুটিং চলল।

স্থানীয় একটি টিভি চ্যানেলে এই ক্যাম্পেইন নিয়ে বিশেষ প্রোগ্রামও হলো। সাংবাদিক থেকে সাধারণ দোকানি পর্যন্ত বাংলাদেশের নাম শুনলে যে শ্রদ্ধা দেখিয়েছে তা আমাদের জন্য বিরল পাওয়া। অতঃপর সৈকতের অস্তগামী সূর্যটার সঙ্গে অসম্ভব সুন্দর মনের মানুষগুলোকে বিদায় জানিয়ে ফিরে এলাম দেশের মাটিতে।


মন্তব্য