kalerkantho

কাজের মানুষ

বাড়তি আয় কী করবেন?

১৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রত্যেক চাকরিজীবীই আয় করেন। তারপর বেতন পান, খরচ করেন। আপনি চাকরিজীবী হয়ে থাকলে এর ব্যতিক্রম নন আশা করি। এবার প্রশ্ন হচ্ছে, আয়ের বাড়তি যে অংশ থেকে যায়, তা দিয়ে কী করেন? আপনার সহকর্মীরাই বা কী করেন? তবে যাঁদের বাড়তি আয় থাকে না; বরং মাস শেষে ধার করতে হয়, তাঁদের ব্যাপার আলাদা। সে বিষয়ে আলোচনা ক্রমশ।

আপনি কি পেশাগত বাড়তি আয় শখ মিটিয়ে, খেয়েদেয়ে ব্যয় করেন? নাকি যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখেন? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উত্তর হচ্ছে, ‘জানি না। বাসাভাড়া আর বাজার করার পর বাকি টাকা যে কিভাবে খরচ হয়ে যায়, টেরই পাই না। মাসের শেষ দিকে দুশ্চিন্তায় দিন কাটে।’

আয়ের এই দুটি দিক নিয়ে আমাদের টানাপড়েনের শেষ নেই। প্রথমত, সব আয় খরচ হয়ে যায়। বাড়তি আয়ের উপায় কী? দ্বিতীয়ত, আয় বাড়তি হলে তবেই না পরিকল্পনার প্রশ্ন আসে। বাড়তি আয় করব কিভাবে?

প্রথম বিষয়টি বিশ্লেষণ করা খুব সহজ। যদি দাবার ছকের মতো ভাবেন, তাহলে দেখবেন—আপনার সামনে খুব বেশি পথ খোলা নেই। বেতন সীমিত। আপনি জানেন তার পরিমাণ কত; কিন্তু খরচের খাত পুরোটা জানেন না। প্রতি মাসেই বাসাভাড়া আর সংসার খরচ বাদেও অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত খরচ চলে আসে। অসুখবিসুখ, আত্মীয়-স্বজন, যাতায়াত ইত্যাদি। ফলে ‘এত খরচ সামলাবেন কী করে?’ এমন প্রশ্নের একটাই উত্তর আপনার জানা আছে—যা আয় তা দিয়েই সামলাতে হবে। আপনার জন্য আর কোনো পথ খোলা নেই। তাহলে বাড়তি আয়ের উপায় কী? উপায়ও একটাই—আয় থেকে প্রতি মাসে কিছু টাকা সরিয়ে ফেলুন। ডিপিএস, প্রাইজ বন্ড ইত্যাদি যেকোনোভাবে জমিয়ে রাখুন, যাতে সহজে খরচ করা না যায়। নিজেকেই নিজে বেঁধে ফেলুন।

এখানে একটা দিক ব্যতিক্রম আছে। একজন চাকরিজীবীর এমন অবস্থা ছাড়াও বছরের নানা সময়ে তাঁরা হাতে বাড়তি কিছু টাকা পান। যেমন—উত্সবভাতা, লভ্যাংশভাতা, প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া অন্য কোনো আয়, ইনসেনটিভ, ওভারটাইম ইত্যাদি। এসব উত্স থেকে অতিরিক্ত আয় হতে পারে।

আর পেশাগত আয় বলতে চাকরিজীবী ছাড়া আরো অনেক পেশাই তো আছে! ডাক্তার, উকিল, গায়ক, অভিনেতা, চিত্রশিল্পী—আরো কত কী। এসব ক্ষেত্রে আয় নির্ধারিত নয়। বাড়তি আয় থাকতেও পারে, না-ও থাকতে পারে। বাড়তি আয় না থাকলে ওপরের পন্থা অবলম্বন করুন। আর বাড়তি থাকলে নিচের পথ ধরে চলুন।

 

বাড়তি আয় যা করবেন

আমি পরামর্শতালিকা তৈরির আগে ভিন্ন পেশার তিনজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করি। প্রথমজন একজন বিক্রয়কর্মী। তিনি তাঁর আয় সম্পর্কে বললেন, ‘একটা সেলস কলে যাওয়ার আগে প্রচণ্ড ভয় কাজ করে। আর তার সঙ্গে মিশে থাকে হতাশা আর টানটান উত্তেজনা। প্রেজেন্টেশন দেওয়ার আগমুহূর্তে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। জিব শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। আর ক্রেতা রাগী হলে পুরো পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়। এভাবে দিনের পর দিন কাজ করে মাস শেষে বেতন পাই। আর লক্ষ্য অর্জনে সফল হলে কমিশনও পাওয়া যায়। টাকা হাতে পাওয়ার পর মনে হয়, একটা শখ মিটাই। বাসাভাড়া বা অন্যান্য জরুরি খরচের আগেই হয়তো কিছু একটা কিনি। ঝোঁকের বশে বেশি খরচ করে ফেললে তখন আবার খুব খারাপ লাগে।’ এত পরিশ্রম করে যিনি আয় করেন, তিনি বাড়তি আয় দিয়ে যদি সামান্য শখ পূরণ করেন, সেটা নিশ্চয়ই অন্যায় নয়। খুব শখের কিছু একটা কেনা বা প্রিয়জনের জন্য একটা উপহার বা পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটু ঘুরে আশা, এ তো জীবনযাপনেরই অংশ।

ঘুরে-ফিরে শখ মিটিয়ে বাড়তি আয় শেষ হয়ে যাওয়ার পর? আবার সেলস কল, আবার টেনশন ও ভয়, আবার সাফল্য, আবার বাড়তি আয়, আবার শখ পূরণ। এ যেন এক চক্র। কিন্তু হঠাত্ কোনো একদিন যদি বিপদ আসে? আপনার জীবনে বা আপনার প্রিয়জনের কারো? সে দিনের জন্য সঞ্চয় করেছেন? সব আনন্দ আয়োজনের স্মৃতি সেদিন আপনার কাছে বিষের পেয়ালা হয়ে ফিরে আসতে পারে। মনে হতে পারে, কিছু টাকা সঞ্চয় করা খুব উচিত ছিল।

কথা বলেছিলাম একজন কণ্ঠশিল্পীর সঙ্গে। গায়ক বললেন, ‘এখন আগের চেয়ে বেশি অনুষ্ঠানের সুযোগ পাচ্ছি। ভাবছি, বাড়তি আয় দিয়ে এক টুকরো জমির বুকিং দেব আর কোনো জমজমাট শপিং মলের মধ্যে একটা খাবারের দোকান ভাড়া নেব।’ তার লক্ষ্য পরিষ্কার। আমাকে আরো বললেন, মাসিক বাড়তি আয় কত থাকে। তার স্বপ্নপূরণে আর কত দরকার। কোন মাসে জমির বুকিং আর কোন মাসে দোকান ভাড়া নেবেন, সে ব্যাপারেও তাঁর পরিকল্পনা পরিষ্কার। তিনি বললেন, ‘টাকা কখনো জমানো হয় না। থাকে না। নানা ঘটনায় খরচ হয়েই যায়। ধরে রাখতে পারি না। ফলে এমন ব্যবস্থা করেছি, যাতে তা সম্পদ হয়ে যায়।’

যাঁরা অনুধাবন করেন সঞ্চয় করা উচিত, তাঁরা অদ্ভুতভাবে কোনো না কোনো পথ বের করে ফেলেন। কথা বললাম এক গৃহিণীর সঙ্গে, যাঁর ব্যক্তিগত কোনো আয় থাকারই কথা নয়। জানালেন, তিনি কিভাবে বাড়তি আয় করছেন। তিনি গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে পড়াশোনা করেছেন। বিয়ের পর সংসার নিয়ে ব্যস্ততা। ফলে আর পড়াশোনা বা চাকরি করা হয়ে ওঠেনি। তাঁর বাড়তি দুটি যোগ্যতা আছে। তিনি খুব ভালো গান করেন আর পেনসিল দিয়ে স্কেচ করতে পারেন। স্কুল-কলেজজীবনের চর্চা। তিনি বাসায় বসে আশপাশের ছোট ছোট বাচ্চা পড়ান, গান আর ছবি আঁকা শেখান। তাঁর খুব যে বেশি ছাত্র-ছাত্রী তা নয়। মাত্র আটজন। মাসে তাঁর যা আয় হয়, তার পুরোটাই তিনি সঞ্চয় করেন। প্রশ্ন করলাম, এ সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে কী করবেন? চমত্কার উত্তর দিলেন, ‘কিছু হোক বা না হোক, আমার আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই। এক উত্কণ্ঠাহীন, দারুণ ফুরফুরে জীবন যাপন করছি। যদি কোনো বিপদ আসে, আমি আর এখন শূন্য নই। তাত্ক্ষণিক সমস্যা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে। এর চেয়ে আর শান্তি কী হতে পারে! এবার শখ মেটাই আর যা-ই করি, কোনো বাধা নেই।’

খুব ভালো লাগল এই গৃহিণীর কথায়। সবার আগে সঞ্চয় করুন। কিছু সঞ্চয় করুন। হঠাত্ বিপদ সামলানোর মতো। এতে আর কিছু না হোক, মনে বল পাবেন। অবচেতন মনে শক্তি পাবেন। সব কাজেই আনন্দ পাবেন। উপভোগ করতে পারবেন। সম্বলহীন, সঞ্চয়হীনভাবে কোনো কিছুই যেন স্বস্তিতে করা যায় না। স্বল্প আয়কারীর সংসারজীবনে টাকার দুশ্চিন্তা থেকে পরিত্রাণের চেয়ে শ্রেষ্ঠ উপহার আর কিছুই নেই।

মন্তব্য