kalerkantho

আপনার শিশু

মা-বাবা মনে রাখুন

মেরীনা চৌধুরী

১৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মা-বাবা মনে রাখুন

প্রত্যেকেই চান, তাঁর সন্তান সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠুক। এর জন্য মা-বাবাকেও কিছু নিয়ম-নীতি পালন করতে হয়।

অভিভাবক হোন

একটি সন্তানের জন্য প্রয়োজন একজন সঠিক পথপ্রদর্শক। মা-বাবাই হতে পারেন সেই আদর্শ পথপ্রদর্শক। ছোট থেকে সন্তানের সঙ্গে আচার-আচরণ সংযত করে তাদের সঙ্গে এমন কথা বলা উচিত, যা তাদের চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখে। বয়স অনুযায়ী কথা বলা, যাতে মা-বাবা কী বোঝাতে চাইছেন, তা বুঝতে পারে। অভিভাবকের কাজ সীমাবদ্ধতা, আদব-কায়দা, নিয়ম-নীতি, সংস্কার—সবই শেখানো।

 

শৃঙ্খলা বজায় রাখা

এক গবেষক তাঁর চার বছরের বাচ্চা সম্পর্কে বলেন, ‘যখন আমি তার ব্যবহার অপছন্দ করি, তখন তাকে বলি—আমি তোমার এখনকার আচরণ পছন্দ করছি না। তখন সে শান্ত হয়ে আসে ও ক্ষমা চায়। বকাবকি না করে তাকে বুঝতে দিতে হবে যে সে যা করেছে তা সঠিক নয়।’

চার-পাঁচ বছর বয়স থেকে তাদের ছোটখাটো কাজের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। যেমন—বিছানা ঝাড়া, বইয়ের টেবিল গোছানো, নিজের স্কুলব্যাগ গোছানো। এতে তারা দায়িত্বশীল ও কর্মঠ হয়ে ওঠে। অনেক অভিভাবক নিজেরাই এসব কাজ করে দেন। পরে যখন তাদের এসব কাজ করতে বলা হয়, তখন তারা সহজে করতে চায় না। প্রথম দিকে যেসব মা-বাবা একটু ছাড় দেন, পরে আবার তাদের চাপ দেন। তখনই হয় অসুবিধা। আবার কখনো মা-বাবা বাচ্চাদের শর্ত দেন—ভালোভাবে পড়াশোনা করলে অথবা ভালো রেজাল্ট করলে কিংবা অমুক কাজ করলে তাদের পুরস্কৃত করা হবে অথবা সে যা চাইবে, তা-ই দেওয়া হবে। এটা উচিত নয়। এতে বাচ্চারা বায়না করতে শেখে। এতে শিশুরা আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে শেখে না।

 

শিশুকে সময় দিন

বাচ্চাদের কিছুটা সময় দিন। যেসব বাচ্চা মা-বাবার সঙ্গ বেশিক্ষণ পায়, তারা অধিকতর উন্নত চরিত্রের হয়। উঠতি বয়সের বাচ্চাদের যখন কোনো সমস্যা হয়, তখন তারা মা-বাবার সঙ্গে সে ব্যাপারে আলোচনা করতে চায়; কিন্তু মা-বাবা দুজনই যদি বাইরে থাকেন, তবে অপেক্ষা করতে করতে বাচ্চাদের আশাভঙ্গ হয়। এতে বাচ্চাদের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

 

টিভি দেখা নিয়ন্ত্রণ করুন

একটু-আধটু যৌনতা সম্পর্কে যখন শিশুরা কথা বলে, তখন মা-বাবা আতঙ্কিত বা ক্ষেত্রবিশেষে মর্মাহত হন। ভেবে নেন, স্কুলে এসব শিখছে তাদের সন্তান। মূলত মিডিয়া থেকে তারা এসব বেশি শেখে। পাঠ্য বই, ধর্মগ্রন্থ অথবা আত্মীয়-স্বজনের থেকে নয়—টেলিভিশনে কোনো কোনো চ্যানেল আজকাল এমন কিছু আপত্তিকর দৃশ্য বা বিষয় প্রদর্শন করে, যা শিশুমনে কুপ্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় মা-বাবা টিভির বিকল্প হিসেবে কম্পিউটার বেছে নেন; কিন্তু এরও খারাপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ভালো হবে প্রতিদিন সময় বেঁধে বাচ্চাদের টিভি দেখতে দেওয়া। মা-বাবা পরোক্ষ নজরদারিও রাখতে পারেন। অনেক মা-বাবা নিজেরা টিভি দেখার সময় সন্তানকে বলেন পড়াশোনা করতে। সেটাও ঠিক নয়। এতে তাদের পড়ায় মন তো বসেই না, উপরন্তু মনে বিদ্রোহ দানা বাঁধতে পারে।

 

জেনে রাখুন সন্তান কী করছে

অনেক সময় অবসরে শিশুরা কী করবে বুঝতে পারে না। তাদের মাথায় নানা দুষ্টু বুদ্ধি খেলা করে। কখনো প্রতিবেশীর বাসায় উঁকিঝুঁকি মারে কিংবা ঢিল ছুড়ে জানালার কাচ ভাঙে, পথচারীদের গায়ে পানি ছিটায়, বাগানের ফুল ছিঁড়ে আনন্দ পায়। নির্দেশনাবিহীন, নিঃসঙ্গ সময় কাটানোর ফলে এসব করে তারা। দেখা যায়, এসব বাচ্চাই পরে ধূমপান, মাদকসেবনসহ নানা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে মা-বাবা যদি স্কুলের ও পরের কাজকর্ম কী তা নির্ধারণ করে রুটিন বেঁধে দেন, তবে শিশুর জীবনযাপন শৃঙ্খলিত করা সম্ভব।

 

শিশুকে তার যোগ্যতার পরিমাপ করতে শেখান

অনেক মা-বাবা সারাক্ষণ বাচ্চাদের প্রতিটি কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন। এতে তারা নিজের যোগ্যতার পরিমাপ করতে শেখে না। তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিন। লক্ষ রাখুন, কাজটি ঠিকমতো হচ্ছে কি না। ভালো হলে প্রশংসা করুন, খারাপ হলে বুঝিয়ে দিন। এভাবে তারা তাদের যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে।

 

বৈবাহিক বন্ধন ও সম্পর্ক সুষ্ঠুভাবে বজায় রাখুন

যদি মা-বাবার মধ্যে সুন্দর বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় থাকে, তাহলে সন্তানরা সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারে। কিন্তু সন্তান যদি বাবা অথবা মা যেকোনো একজন অভিভাবকের সঙ্গে থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। হয়তো স্কুলে খারাপ রেজাল্ট করে, কখনো পড়াশোনাও শেষ করতে পারে না। অথবা কর্মক্ষেত্রে উন্নতি করতে পারে না। কারো সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্কে যেতেও তাদের মাঝে ভীতি কাজ করে। সন্তানের মঙ্গলের জন্য অভিভাবকদের উচিত নিজেদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। কখনো মতানৈক্য হলে তা সন্তানের সামনে প্রকাশ না করা।

লেখক : প্রাক্তন শিক্ষক, ম্যাপললিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল

মন্তব্য