kalerkantho

অন্য কোনোখানে

সাদা পাথরের দেশে

সুমন্ত গুপ্ত

১৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সাদা পাথরের দেশে

অফিস থেকে বের হয়ে বাসায় ফিরছি। সহকর্মী মাহাবুবের ফোন—দাদা কাল যাচ্ছেন তো সাদা পাথরের দেশে? বললাম, যদি ভাগ্যদেবী সহায় থাকেন। বাসায় ফিরে জায়গাটির নাম লিখে ইন্টারনেটে সার্চ দিলাম। নেট ঘেঁটে জানা গেল, বর্তমান সময়ে পর্যটকদের নতুন আকর্ষণ সিলেটের ভোলাগঞ্জের জিরো পয়েন্ট। ইতিমধ্যেই সাদা পাথরের দেশ বলে পরিচিতি পেয়েছে জায়গাটা। ঘুমের আবেশ পেয়ে বসেছিল। খুদে বার্তার শব্দে তন্দ্রা ভেঙে গেল। চোখ মেলে দেখি আরেক সহকর্মী স্বপন ভাইয়ের খুদে বার্তা—জেন্টাল রিমাইন্ডার। আমাদের যাত্রা সকাল ৮টায় শুরু করব। তাই সকাল ৭টা ৩০ মিনিটের মধ্যে চলে আসুন। জেন্টাল রিমাইন্ডার দেখতে দেখতে জেন্টাল বয়ের মতো কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি। মাকে বলে রেখেছিলাম সকাল সকাল ডেকে দেওয়ার জন্য। সূর্যদেব নয়ন মেলে তাকানোর পরই আমাকে ডাকা শুরু করেন তিনি। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর সাড়ে ৬টা। ভাবলাম আরেকটু ঘুমিয়ে নিই। জানালা খুলে দিতেই মৃদু বাতাস ভেসে এলো ঘরে। এমন বাতাসে নিদ্রাদেবী আরো আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরল আমাকে। মোবাইলের রিংটোনে দ্বিতীয়বার ঘুম ভাঙল। মনির ভাই একের পর এক ফোন দিয়ে যাচ্ছেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সকাল ৭টা ৩০ মিনিট। ঝটপট তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ত্রিচক্রযানে চেপে বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, চৌহাটা পেড়িয়ে পৌঁছে গেলাম যাত্রা শুরুর স্থান আম্বরখানায়। কুটুমবাড়ি রেস্টুরেন্টে সকালের নাশতার অর্ডার দেওয়া হয়েছে। নাশতা করে রওনা দেব আমরা। অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি; কিন্তু খাবারের দেখা নেই। জানা গেল তখনো রুটি তৈরি শুরুই করেনি পাচকরা। শেষ পর্যন্ত খাবার দেওয়া হলো। তেলবিহীন পরোটা, সবজি আর ডাল। গরম গরম খেতে বেশ ভালোই লাগছিল। নাশতা শেষে সবাই গাড়িতে উঠে বসলাম। যাত্রা শুরু হলো সকাল ৯টার দিকে। পিচঢালা সড়ক পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি সাদা পাথরের দেশের দিকে। এয়ারপোর্ট, ধোপাগুল পেরিয়ে এসেছি। মানিক ভাইয়ের বাড়ি ভোলাগঞ্জ। তাই তাঁর ওই এলাকা সম্পর্কে ধারণাও বেশি। তিনি জানালেন, ভোলাগঞ্জের শেষ মাথায় সপ্তাহে দুই দিন বর্ডার হাট বসে। ওই হাটকে বড় পুঞ্জিবাজার বলেও ডাকে এলাকার লোকজন। হাটে গেলে ভারতীয় পণ্য-সামগ্রী বেশ কম মূল্যে কিনতে পারবেন। হাটের পাশেই আছে কমলা বাগান।

মনে মনে খুশিই হলাম। এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাবে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর ভোলাগঞ্জ সদরে পৌঁছালাম। মানিক ভাই বললেন তার পাথরের মিলে কিছু সময় বিশ্রাম নিতে। কারণ বর্ডার হাট আর ভোলাগঞ্জ জিরো পয়েন্ট থেকে ফিরতে বেশ সময় লাগবে। তার কথামতো বিশ্রাম নিয়ে চললাম বর্ডার হাটের দিকে। দয়ার বাজার, ভাটারা পেরিয়ে পৌঁছলাম বড়পুঞ্জি বাজারে। তখনো বাজার খোলেনি। শতাধিক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলতে গেলাম। কিন্তু বাদ সাধল এলাকার লোকজন। বলল, ভুলেও বর্ডার হাটের ছবি তুলতে যাবেন না। বিএসএফ দেখতে পেলে ক্যামেরা ছিনিয়ে নেবে। তবে এপাশ থেকে যত ইচ্ছা ছবি তুলতে পারবেন। বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে, তবু বর্ডার হাট খুলছে না। মন খারাপ করে সবাই যখন ফিরে যাওয়ার চিন্তা করছি, তখন বর্ডার হাট খুলে দেওয়া হলো। মূলত আদিবাসীরা নানা ধরনের পণ্য সামগ্রী নিয়ে এই হাটে আসে। তেল, সাবান, শ্যাম্পু, পাউডার, বিস্কুট, চানাচুর, চা, চকোলেট—কী নেই। দামও বেশ সস্তা। বড়পুঞ্জি বাজারের কমলালেবু খেতে খুব মিষ্টি। সদ্য গাছ থেকে পেরে নিয়ে আসা কমলা। অনেক মানুষ দূরদূরান্ত থেকে এই কমলা কিনতে আসে। সবাই বিক্রেতাদের ঘিরে ধরেছে কমলা কেনার জন্য। মানিক ভাই প্রথমে এক কুড়ি কমলা কিনলেন। খেয়ে দেখলাম খুব সুস্বাদু। আমরাও দুই ঝুড়ি কিনলাম। সবাই কমবেশি বাজারসদাই করে ভোলাগঞ্জ জিরো পয়েন্টের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। স্বল্প সময়ে এসে পৌঁছলাম ধলাই নদীর পারে। এবার ইঞ্জিনচালিত নৌকা করে যেতে হবে জিরো পয়েন্টের দিকে। মানিক ভাই দরদাম করে নৌকা ঠিক করলেন। চেপে বসলাম নৌকায়। মাঝি এগিয়ে চললেন জিরো পয়েন্টের দিকে। দেখা পেলাম রোপওয়ের। ছোটবেলায় অনেক শুনেছি এই রোপওয়ের কথা। পাথর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া হয় এই পথ দিয়ে। শান্ত স্তব্ধ পাহাড়, তার সঙ্গে মিশেছে আকাশের নীল। শরত্ মৌসুম না হলেও আকাশের গায়ে ছোপছোপ মেঘ। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে এগিয়ে চলেছি। অনেকেই প্রস্তুত পানিতে নামার জন্য। মাঝি আমাদের নামিয়ে দিলেন। জিরো পয়েন্টে দৃষ্টি প্রসারিত করে পায়ে হেঁটে এগিয়ে চললাম। চারদিকে পাথর আর পাথর। এখানকার বিশেষত্ব হলো সব পাথর সাদা। সামনে সবুজ পাহাড়, পাশে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া প্রচণ্ড স্রোতের স্বচ্ছ শীতল পানি, আর সে পানি থেকে গড়িয়ে নামা সাদা পাথর। কী যে অপরূপ সুন্দর সে দৃশ্য! তা ভাষায় বোঝানোর নয়। আমরা পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া শীতল পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি, আহ কী ঠাণ্ডা! পানি আর সাদা পাথরের জাদুকরী শীতল স্পর্শে সবাই বিমোহিত। এ যেন আমাদের জীবনের বিস্ময়কর এক অভিজ্ঞতা। একসঙ্গে এত সাদা পাথর জীবনে কখনো দেখিনি। সাদা পাথর দেখা আর শীতল পানিতে স্নান করতে করতে সময় গড়িয়ে যায়। কখন যে রোদ পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নিয়েছে, টের পাইনি। অন্ধকার জেঁকে বসার আগেই সেই অসম্ভব সুন্দরকে বিদায় জানিয়ে ফিরে চলি শহর পানে।

কিভাবে যাবেন

সিলেট নগরীর আম্বরখানা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ রুটে। ২০০ টাকা জনপ্রতি ভাড়ায় কোম্পানীগঞ্জে টুকের বাজারে নামতে হবে। এখান থেকে ট্রলারে চলে যেতে পারেন সাদা পাথরের দেশখ্যাত ভোলাগঞ্জের জিরো পয়েন্টে। কোম্পানীগঞ্জ পৌঁছে টুকের বাজার ঘাট থেকে ট্রলারে সাদা পাথরে পৌঁছাতে ৩০ মিনিটের মতো লাগে। যাওয়া-আসা নৌকা ভাড়া এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। তা ছাড়া মাইক্রোবাসেও যেতে পারেন। ভাড়া পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টাকা।

 

মন্তব্য