kalerkantho

আপনার শিশু

শিশু ও সহবত

মেরীনা চৌধুরী   

১১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



 শিশু ও সহবত

একটি শিশুর সব সম্ভাবনা বিকশিত হয় পরিবার থেকে। শিশুরা মা-বাবার ক্ষুদ্র সংস্করণ। মা-বাবার প্রতিটি কার্যকলাপ অনুকরণ করার চেষ্টা করে তারা। কিছু তারতম্য দেখা গেলেও বেশির ভাগ সময়ই মা-বাবার চরিত্রের প্রতিফলন দেখা যায় তাদের শিশুদের মধ্যে। শিশু বিশেষজ্ঞের মতে, ছয় মাস বয়স থেকে পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে তার বোধোদয় হয়। আবার বয়স দুই পেরোতে না পেরোতে কোনটা করা উচিত, কোনটা করা উচিত নয়—সেসব বোঝার ক্ষমতা আসে। এর পরবর্তী সময়—অর্থাত্ শিশুর চার-পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার মনস্তত্ত্ব বুঝে তাদের গড়ে তোলার জন্য চাই ‘গুড প্যারেন্টিং’। গুড প্যারেন্টিংয়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য গভীর ও বিস্তৃত। শিশুরা আসলে কাদার তালের মতো। যেমন গড়বেন, তেমনই গড়ে উঠবে। আর এই গড়ার কাজটা করতে হবে ছোট থেকেই। শিশু যখন বোধ-বুদ্ধি অর্জন করতে শুরু করবে, তখন থেকেই তাকে নিয়ম-শৃঙ্খলা, সৌন্দর্যবোধ, সংযত আচরণ, আদব-কায়দা শেখানোরর মাধ্যমে তার মধ্যে তৈরি করে দিতে হবে ‘সহবত শিক্ষা’।

‘সহবত’ শিক্ষার প্রথম পাঠ পরিবারের সব সদস্যের সঙ্গে (বয়সভেদে) মেলামেশার সুযোগ দেওয়া। বড়দের কাজে সাহায্য করা, তাদের চশমা, পত্রিকা কিংবা লাঠি এগিয়ে দেওয়া, প্রয়োজনে হাঁটতে সাহায্য করা। ৯-১০ বছর বয়স হলে পরিবারের অসুস্থ সদস্যকে ওষুধ খাওয়ানোর দায়িত্বও দেওয়া যেতে পারে। এতে শিশুর মধ্যে গড়ে উঠবে দায়িত্ব, শ্রদ্ধাবোধ। ছোট ভাই-বোনদের সঙ্গে রেষারেষি না করে খাবার ভাগ করে খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করার চর্চা গড়ে তুলতে তাকে সাহায্য করতে হবে। সাধারণত দেখা যায়, কোনো খেলার জিনিস (যেমন—পুতুল, বল ইত্যাদি) নিয়ে কিংবা খাবার নিয়ে শিশুদের মধ্যে ঝামেলা বেধে যায়। এ ক্ষেত্রে বিরক্ত না হয়ে ভালোবাসা ও আদর দিয়ে সমস্যা মেটান। ওদের বোঝাতে হবে, তারা আপনজন। তাদের সঙ্গে এই আচরণ করা উচিত নয়। তাদের আরো দায়িত্ব দিতে হবে নিজের বিছানা, জামাকাপড় ও স্কুলের ব্যাগ গুছিয়ে রাখার। খাবার টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না খেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে খাওয়া। খাওয়া শেষে রান্নাঘরের সিংকে বাসন রাখা কিংবা নিজেই নিজের খাওয়ার থালা ধুয়ে রাখা। সংসারের কাজে মাকে সাহায্য করা, যেমন—পানির বোতল ভরা, ঘরের ফার্নিচার মোছা, টেবিলে খাবার সাজানো বা খাওয়ার পর টেবিল পরিষ্কার করা ইত্যাদির অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে। একইভাবে বাবাকে সাহায্য করা, মানিব্যাগ, রুমাল, জুতা এগিয়ে দেওয়া, প্রয়োজনে গাড়ি মোছা ইত্যাদি কাজের শিক্ষাও দিতে হবে শিশুকে। বাড়িতে মেহমান এলে নিজের চেয়ার তাকে ছেড়ে দেওয়া, বাড়ির কাজের লোকের প্রতি সুন্দর আচরণ করা, তাদের সম্মানজনক সম্বোধনে ডাকার চর্চা গড়ে তোলাও সহবতের শিক্ষা।

বাড়ির বাইরেও সহবত বজায় রেখে চলতে শেখাতে হবে শিশুকে। যেমন—পাড়া-প্রতিবেশী ও প্রবীণ সদস্যদের সাহায্য করা, পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ঝগড়া, মারামারি না করে মিলেমিশে খেলাধুলা করা।

স্কুলে বেঞ্চে বসা নিয়ে বা একটা ছোট পেনসিল নিয়েও অনেক সময় শিশুদের মধ্যে মনোমালিন্য বা অনেক সময় হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। শিক্ষকদের উচিত তা মিটিয়ে দেওয়া। শিক্ষকদের মান্য করা, তাঁদের আদেশ পালন করা, ভদ্র ব্যবহার করা উচিত। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে শিক্ষকরা সহবত আশা করেন। এবং তা দেখানো শিক্ষার্থীদের কর্তব্য। এই শিক্ষা শিশুকে পরিবার থেকেই দিতে হবে।

বাড়িতে মা-বাবাকে বোঝাতে হবে, কারো প্রতি যেন শিশুর রাগ, হিংসা-বিদ্বেষ তৈরি না হয়। তাদের বিভিন্ন উত্সব-অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া উচিত। বৃহত্ পরিবেশে সবার সঙ্গে মেশার সুযোগ পেলে ওদের মধ্যে বৈরী ভাব তৈরি হবে না। শিশুকে নিয়ে খেলার মাঠে যেতে হবে। সঙ্গে খেলার সামগ্রী, কিছু খাবার নিন। এই খেলার সামগ্রী ও খাবার অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শেখাতে হবে এবং শিশুর বন্ধুরাও ওর থেকে একইভাবে সহবত শিখবে।

গাড়ি, রিকশা বা পায়ে হেঁটে চলার সময় বাদামের খোসা, পানির বোতল, কলার খোসা বা অন্য উচ্ছিষ্ট যত্রতত্র না ফেলার শিক্ষা দিন। সুনির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলুন। একটি শিশুর এই সহবত অন্য শিশুদেরও প্রভাবিত করবে।

লেখক : প্রাক্তন শিক্ষক, মেপললিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল

মন্তব্য