kalerkantho


অন্য কোনোখানে

এক দিনে সাত ঝরনা

জাভেদ হাকিম   

৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



এক দিনে সাত ঝরনা

চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাইয়ে আছে বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক ঝরনা। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের এবারের গন্তব্য ছিল এই ঝরনার রাজ্য। তা-ও আবার এক দিনেই সাতটি ঝরনা। দুই দিনের ছুটি পেতেই চলে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। রাতে মাইক্রোতে ছুটে চললাম চট্টগ্রাম বিভাগের সীতাকুণ্ড রেঞ্জের মিরসরাইয়ের পথে।

সারা রাত খোশগল্পে মেতে সকাল ৭টায় পৌঁছে যাই। বারইয়ারহাটে স্থানীয় গাইড নিজাম রিসিভ করেন আমাদের। আমবাড়িয়া ছোট বাজারের ঝুপড়ি হোটেলে সেরে নিই সকালের নাশতা। তখন ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল ৮টা। সারা দিনের জন্য আজ দুই পা ভরসা। সাইজমতো একখণ্ড বাঁশ নিয়ে প্রথমেই ছুট বোয়ালিয়া ঝরনার পানে। পাহাড় ভ্রমণে এই বাঁশ যে কতটা উপকারী সেটা না নিলেই ভালোমতো বুঝবেন! পাহাড়ের পথে আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধু বাঁশ। অল্প সময় পরই পৌঁছে যাই বোয়ালিয়া ঝরনায়। আজ সারা দিনে মোট সাতটি ঝরনা দেখার মিশন। বোয়ালিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে সবাই আনন্দে আত্মহারা। অবিরাম ঝরে পড়া পানিতে ঝাঁপিয়ে জলকেলিতে মেতে উঠি। আনন্দে এতটাই নিমগ্ন যে বোয়ালিয়ার পাশে আব্বাসের কলাবাগানে রুটি, বিস্কুট, পানি—সবই ভুলে রেখে যাই। তখন শুধু মনের মধ্যে পাহাড়ের অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্য দেখার অদম্য বাসনা। কিছু দূরেই পালাকাটা কুম। কারো কারো মতে বাউশ্যা ঝরনা। নামে কী আসে-যায়, সৌন্দর্যই মুখ্য। রিমঝিম শব্দ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই হলো ঝরনার প্রধান অলংকার। এর পর উঠন পাহাড়ের ঝিরিপথ ট্রেইল করে যাচ্ছি আন্ধারমানিক ঝরনায়। দুই পাশে গাছের ডালগুলো এমনভাবে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যে দিনের আলোর দেখা পাওয়া কঠিন। ভরদুপুরেও মনে হয় সন্ধ্যা। আন্ধারমানিকের ট্রেইলপথের সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব। শুধু স্বচক্ষে দেখেই অনুভব করা যায়। প্রায় ৭০ ফুট ওপর থেকে অবিরাম ধারায় ঝরে পড়া পানিতে ভিজি আরো একবার। এর পরের গন্তব্য ছড়া ঝরনা। সেখান থেকে রোমাঞ্চকর ট্রেইল অতিক্রম করে চলে যাই ঝরনার রাজা নোহাতে খুম। উচ্চতা খুব একটা নয়, তবে নিসর্গ অপরূপ। ঝরনার চারপাশে পাথরের ভাঁজে ভাঁজে প্রাকৃতিকভাবে খাঁজকাটা বেঞ্চের মতো। এ যেন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে টানার জন্য প্রকৃতির নিঃস্বার্থ প্রেমের আবেদন। বেশ কিছুটা সময় নোহাতে খুমের সাহচর্যে থেকে এবার ছুট কলাতলী ঝরনার পথে। যাচ্ছি আর ভাবছি, যে বুনো পরিবেশ, এবার না আমাদের টারজানের ভূমিকায় নামতে হয়। একসময় নয়নাভিরাম ঝিরিপথের দেখা মিলল। হাঁটু পর্যন্ত দেবে যাওয়া কাদা, গা ছমছম করা নিঃশব্দ প্রকৃতি, কালো চিংড়ির ছোটাছুটি, ডুমুরের বুনো গন্ধ, নাম-না-জানা বাহারি রঙের ফুলের সৌরভ—আরো কত কী! তার মধ্যেই কানে ভেসে আসে রিমঝিম শব্দ। এরই মধ্যে ফারুক বেশ কিছু চিংড়ি ধরে জানান দিয়েছে, সে একজন ভালো মত্স্য শিকারিও বটে। সবাই কিছুটা ক্লান্ত। তাই ঝিরির পানিতে শুয়ে-বসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবারও হাঁটা। অল্প সময় পরই দেখা মিলল রূপসী কন্যা কলাতলী ঝরনার। স্বচক্ষে না দেখা পর্যন্ত কেউ কোনো দিন বই, পত্রিকা আর গল্প শুনে ঝরনার রূপলাবণ্য সম্পর্কে বুঝতে পারবে না।

ঝুঁকি নিয়ে একটু ওপরে উঠে ঝরনার পানিতে আবার আনন্দে মেতে উঠি। এই ঝরনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পানি গড়িয়ে নয়, সরাসরি পাহাড় থেকে পড়ে। ঝরনার পানির এমন দুর্নিবার আকর্ষণ আপনি যতই ভিজবেন তত ভিজতে ইচ্ছা করবে। স্বাদ যেন মিটবে না।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মোট ছয়টি ঝরনায় অবগাহনের পরও অতৃপ্তি রয়ে গেল। অন্ধকার নেমে আসায় কেম্বাতলী ঝরনা দেখার মিশন বাদ রেখেই ফেরার তাড়া, ফিরছি বৈবাঙ্গা পাহাড় দিয়ে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার ২০০ ফুট উচ্চতা। জোঁকের ভয় উপেক্ষা করে হাঁটছি পাহাড়ি পথে। কোথাও কোথাও এতটা ঘন জঙ্গল আর খাড়া পথ যে পড়লেই সব শেষ। তার মধ্যে সারা দিনই থেমে থেমে বৃষ্টি। একেবারে পিচ্ছিল হয়ে আছে পথ। পা ফেলার আগেই যেন এগিয়ে যাই। এতে অবশ্য একটা উপকারই হয়েছিল। দ্রুতই গন্তব্যে ফিরতে পেরেছিলাম আমরা।

 

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো পরিবহনে মিরসরাই। এরপর সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আমবাড়িয়া ব্র্যাক পোলট্রি। এই খামারের পাশের ঝুপড়ি হোটেলে পাওয়া যায় স্থানীয় গাইড। ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় তাঁদের সঙ্গে নিতে পারেন। গাইড না নিয়েও যেতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে পথ চিনতে সমস্যা হতে পারে। খাওয়াদাওয়ার ভালো হোটেল নেই, তাই সঙ্গে পর্যাপ্ত শুকনা খাবার ও পানি রাখবেন। রাতের বাসে গিয়ে সকালে মিরসরাই নেমে সারা দিন ঘুরে আবার রাতের বাসেই ফিরতে পারবেন। রাত্রি যাপন করতে চাইলে বারইয়ারহাট এলাকায় সাধারণ মানের বোর্ডিংয়ে থাকা যায়। অন্যথায় চট্টগ্রাম শহর।



মন্তব্য