kalerkantho


আপনার শিশু

প্রাথমিক শিক্ষা ধাপে ধাপে

মেরীনা চৌধুরী   

১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



প্রাথমিক শিক্ষা

ধাপে ধাপে

বর্তমান যুগে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার পদ্ধতি সঠিক হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশেষত যেসব শিশু অণু-পরিবারের পরিকাঠামোয় বেড়ে উঠছে, তাদের প্রয়োজন জীবনমুখী শিক্ষা। শুধু এ বি সি ডি কিংবা ক খ গ ঘ নয়, প্রাথমিক শিক্ষার যে আরো অনেক দিক আছে, তা ধাপে ধাপে জানা প্রয়োজন।

 

প্রাথমিক শিক্ষা

একটি শিশু যখন প্রথম হাঁটতে শেখে, তার মুখে বুলি ফুটতে শুরু করে, তখনই সে তার চারপাশের জগতের সঙ্গে পরিচিতির পাঠ শুরু করে দেয়। শিশুর বয়স যখন তিন/সাড়ে তিন বছর হয়, তখন দেওয়া হয় স্কুলে। এ সময় লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুকে কিছু শৃঙ্খলার মধ্যে চলার অভ্যাস করা।

 

প্রথম ধাপ

একটি শিশু প্রথম স্কুলে যাওয়ার পর পরই পাঠ্যক্রমের বেড়াজালে ফেলে দেওয়া ঠিক নয়। তার তখন দরকার খেলাধুলা, গান-বাজনা ইত্যাদি। স্কুল শুরুর আগে দেশাত্মবোধক বা ভক্তিমূলক গান-বাজনার প্রসঙ্গটি যেকোনো শিশুর পক্ষে ভালো। খেলার ব্যাপারটিতেও বাচ্চাদের নিজস্ব পছন্দের ওপর জোর দেওয়া উচিত। আজ ব্যাটবল খেলা, কাল গো গো খেলা—এভাবে বেঁধে দিলে তারা খেলাধুলার প্রতি উত্সাহ হারিয়ে ফেলে। তাই তাদের যা ইচ্ছা তা-ই খেলতে দেওয়া ভালো। তা যদি দৌড়াদৌড়ি, লুটোপুটিও হয়, তাতেও আপত্তি করা উচিত নয়। খেয়াল রাখতে হবে, তারা যেন ব্যথা না পায়। কিংবা আঘাত লাগবে এমন কিছু না করে। শিশুদের জন্য শারীরিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এতে তাদের শরীরের যথাযথ বৃদ্ধি হয়। ওদের সুস্থতার জন্যও এটা প্রয়োজন। এসবের মাধ্যমে শিশু অন্যদের সঙ্গে মিশতে শেখে। এ যুগে অণু-পরিবারের শিশুরা ঘরকুনো হয়, কারো সঙ্গে মিশতে চায় না। অথচ একটি বাচ্চার ক্ষেত্রে অন্য বাচ্চার সঙ্গ একান্ত অপরিহার্য। এতে তাদের বিকাশ ঘটে এবং পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব গড়ে ওঠে; সবার সঙ্গে মানিয়ে চলতে অভ্যাস হয়। এ সময়ই প্রাথমিক জ্ঞানটুকু অর্জিত হয়।

 

দ্বিতীয় ধাপ

পরবর্তী ধাপে তাদের স্কুলের রুটিনে অন্তত তিন ঘণ্টা লেখাপড়া ও আনুষঙ্গিক বিষয়ের জন্য ধার্য থাকা উচিত। তখন মাপ বোঝানো, বিভিন্ন ধরনের পাজল বা ধাঁধার খেলা, ছোট থেকে বড় ক্রমান্বয়ে সাজানো, মিক্সিং, ম্যাচিং, নম্বর, এমনকি বস্তুর সঙ্গে নম্বরের সাদৃশ্য বোঝানো প্রভৃতি শেখালে ভালো। শিশু ক্রমেই বড় ও ছোটর মধ্যে, লম্বা ও বেঁটের মধ্যে, চওড়া ও পাতলার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে শেখে। তাদের লেখার ক্ষেত্রে একেবারে সূচনায় দাগ টানতে শেখানো পেনসিল দিয়ে না করিয়ে যদি ক্রেয়ন ব্যবহারের অভ্যাস করা হয় তাহলে শিশুরা রঙের বৈচিত্র্যে মজা পাবে।

প্রথমে সরল রেখা, তারপর বক্র রেখা টানা অভ্যাস করার পর আস্তে আস্তে হাতের কাজে গুরুত্ব দিতে হয়। বাচ্চাদের কার্ড বা রঙিন ছবি কেটে পেস্টিং করতে শেখানো উচিত। এভাবে রঙিন কাগজের মিশ্রণে কোলাজ করতে শেখে। অনেক সময় দেখা যায় পেস্টিং ইচ্ছামতো করলেও কেউ কেউ নিজের কল্পনাশক্তি কাজে লাগিয়ে তাতে গল্পের চিত্র ফুটিয়ে তোলে। একটি শিশু এভাবেই সৃজনশীল হয়ে উঠতে পারে। কোনো শিশু হয়তো আপেল এঁকে তাতে লাল বা সবুজের বদলে গোলাপি রং করে বসল। এর ফলে তাকে অকৃতকার্য ভাবা একেবারেই অযৌক্তিক। কারণ প্রত্যেক শিশুর নিজস্ব মানসকি জগৎ থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে সে জগতে হানাদারি করা ঠিক হবে না। এতে শিশুর কল্পনাশক্তির স্ফুরণ ঘটে না। এ সময় ক্লাসে বিভাজন না করে যদি স্বাভাবিক প্রবণতা অনুযায়ী গ্রুপে বিভক্ত করে নেওয়া হয়, তাহলেই ভালো। অক্ষর বা সংখ্যা লেখার সময় খুব সাবধানে এগোতে হয়।

 

শিক্ষকের কর্তব্য

শিশুর শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকের প্রধান গুণ হবে শিক্ষাকালে অপরিমিত ধৈর্য। কারণ একটি শিশুর সম্পূর্ণ অজানা জগিটকে তার জানার পরিধির মধ্যে এনে দেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষকেরই। শিশুর অগুনতি প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্যও চাই ধৈর্য। শিশুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারাও প্রয়োজন। শিশুর প্রকৃত বন্ধু হয়ে উঠতে পারাও শিক্ষকের অন্যতম দায়িত্ব।

মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশুর ইচ্ছা, অনিচ্ছার চাহিদার ক্ষেত্রটি পৃথক। তার মধ্যে স্বাধীন ব্যক্তিত্বের অংকুরটি সুপ্ত রয়েছে। স্বাতন্ত্র্যের পরিধিকে বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষকের। সাধারণভাবেই তাকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করতে হবে। এর ফলে সে স্বাবলম্বী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। না হলে জীবনে যদি কোনো দুর্বিপাক আসে তাহলে উঠে দাঁড়াতে পারবে না। সবার জানা যে শৈশবে কাদার তাল, একে যেমন আকৃতি দেওয়া হবে, তা তেমন আকারই পাবে।

 

মা-বাবার কর্তব্য

এটা বোধ হয় সাধারণ অভিজ্ঞতা যে সন্তানদের নিয়ে যতটা না সমস্যা তার চেয়ে ঢের বেশি সমস্যা অভিভাবকদের নিয়ে। মা-বাবার অত্যাধিক খবরদারি, তার জন্য প্রায়ই শিশুটি ভুল পথে চালিত হয়। মা-বাবা যদি নিজের অতৃপ্ত বাসনা পরিপূর্ণের মাধ্যম হিসাবে শিশুটিকে ধরে নেন তা হবে চরম ভুল। এ রকম মনমানসিকতা যদি থাকে তাহলে তা বর্জন করাই ভালো। শিশু বেড়ে ওঠে এক পূর্ণ ব্যক্তিরূপে, সেখানে নাকগলানো উচিত নয়। অমুকের বাচ্চা ৯৫ শতাংশ পেয়েছে বা পাচ্ছে বলেই আপনার বাচ্চার কিছুতেই ৮০ শতাংশ পাওয়া চলবে না। এসব একেবারেই ভুল। শৈশবের এই পাঠ্যক্রম বৃহত্তর জীবনে পৌঁছানোর একটি প্রথমিক ধাপমাত্র। তার বেশি কিছু নয়। এ জন্য শিশুদের পরীক্ষা নেওয়া বা পাস-ফেলের হিসাব রাখা অযৌক্তিক। ‘প্রত্যুত্পন্নমতিত্ব’ বা ‘বাটারফ্লাই’ বানান আপনার শিশু না-ই বা শিখল, একটু বড় হয়ে জানলে ক্ষতি কী? শিশুদের হোম ওয়ার্ক দেওয়ার ব্যবস্থা না রাখাই ভালো; বরং মা তাদের গল্প শোনাতে পারেন। ঘুমোতে যাওয়ার আগে দাদি, নানি যেমন গল্পের ঝুলি নিয়ে হাজির হতেন, তেমনই মা তাদের রূপকথা, আরব্য উপন্যাস, ঈশপ, শুয়োরানি, দুয়োরানি ইত্যাদি গল্প ছাড়াও বিখ্যাত মনীষীদের জীবনী শোনাতে পারেন। গল্প বলাকে নাওয়া-খাওয়ার মতোই অপরিহার্য করে তোলার চেষ্টা করুন। সেটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। তবে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে সময় অনুযায়ী লেখাপড়ার অভ্যাস করানো উচিত।

লেখক : প্রাক্তন শিক্ষক, ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল



মন্তব্য