kalerkantho


না ছোট, না বড়

সময়টাই সংকটের। হঠাৎই যেন কী ঘটতে শুরু করে শরীরে, মনে। শুরু হয় মনস্তাত্ত্বিক সংকট। বয়ঃসন্ধি সময়ের ভয়কে জয় করার কথা জানালেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার। লিখেছেন আতিফ আতাউর

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



না ছোট, না বড়

মডেল : আর্য মেঘদূত ও তার মা-বাবা সোনিয়া হাসান এবং আসাদুল ইসলাম ছবি : কাকলী প্রধান

বয়ঃসন্ধি কী এবং কত দিন?

শিশুকাল থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার মাঝখানের সময়টাই বয়ঃসন্ধিকাল। একে কৈশোর অবস্থাও বলেন অনেকে। বয়ঃসন্ধি একেক জনের ক্ষেত্রে একেক সময়ে শুরু হতে পারে। সাধারণত ১০ থেকে ১১ বছর বয়সে বয়ঃসন্ধি শুরু হয়। ১৮ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত এর ব্যাপ্তিকাল থাকে। এই সময়ে কিশোর-কিশোরীর শরীরে কিছু পরিবর্তন দেখা দেয়। পাশাপাশি তাদের মানসিকতারও কিছু পরিবর্তন ঘটে। যৌন অনুভূতিগুলো কার্যকর হওয়া শুরু করে। তার ফলেই কিশোর-কিশোরী এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়।

 

বয়ঃসন্ধিকালে মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের মূল দ্বন্দ্ব

বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানের শারীরিক পরিবর্তনগুলো দেখা গেলেও মানসিক পরিবর্তনগুলো মা-বাবার অগোচরেই থেকে যায়। কিশোর-কিশোরীদের শরীরের পরিবর্তনের সঙ্গে মনেরও বদল ঘটে। নিজের আলাদা আইডেনটিটি খুঁজে নিতে শুরু করে। স্বাধীনচেতা মনোভাব সৃষ্টি হয়। মা-বাবার বেঁধে দেওয়া গণ্ডির মধ্যে সে আর থাকতে চায় না। জীবন সম্পর্কে নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, জীবনযাপনের নিজস্ব ধারণার জন্য সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কিশোর-কিশোরীরা মা-বাবার চেয়ে তাদের সমবয়সীদের সঙ্গে মিশতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আগে যেখানে মা-বাবার মতামত একবাক্যে মেনে নিত, এ সময় সেটা মানতে চায় না। তৈরি হয় নিজস্ব মতামত। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মতামতগুলো খুব ম্যাচিউরড নয়। মা-বাবা যখন বিষয়গুলো টের পান তখনই দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। মা-বাবার কাছে নিজের সন্তানকেই অপরিচিত মনে হয়। তাঁরা ভাবেন, সন্তান দূরে সরে যাচ্ছে। পরিবারের চেয়ে বাইরের জগতের প্রতি আগ্রহী হয় বলে ঘরের বাইরে সময় কাটাতে ভালোবাসে। এতেও মতৈক্য হয় মা-বাবার সঙ্গে। এ বয়সীদের আবেগ অনেক বেশি। তীব্রভাবে নিজের পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশ করে। এসব মেনে নিতেও অনেক মা-বাবা প্রস্তুত থাকেন না।

 

বয়ঃসন্ধির শারীরিক ও মানসিক সমস্যা

এই সময়ে কিশোর-কিশোরীরা খুব বেশি শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যায়, বিষয়টা তা নয়। মানসিক সমস্যার মধ্যে কিছু আছে সাইকিয়াট্রিক ডিসঅর্ডার। আবার কিছু রোগ আছে যেগুলো বয়ঃসন্ধিকালেই শুরু হয়। কিছু মানসিক রোগও আছে, কিন্তু তার হার খুব বেশি নয়। এ সময় প্রধান যে সমস্যাগুলো হয় সেগুলো হচ্ছে—

♦          মা-বাবার সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে সন্তানের মধ্যে উদ্বেগ বেড়ে যায়।

♦          বাচ্চারা বেশি কথা শুনতে চায় না। অনেক বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। মা-বাবার প্রতি অবাধ্য প্রবণতা দেখায়।

♦          এ সময় তাদের মনে নতুন কিছুর প্রতি ঝোঁক বাড়ে বলে মাদকের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। অনিরাপদ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার আগ্রহ জন্মে। দলবদ্ধভাবে চলতে পছন্দ করে বলে গ্যাংকালচারে ঝুঁকে পড়ে।

♦          শারীরিক নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এটা বুঝে উঠতে পারে না বলে উদ্বিগ্নতায় ভোগে।

♦          পড়ালেখায় মনোযোগ কমে যেতে পারে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।

♦          যাদের বন্ধু-বান্ধব কম, তাদের মধ্যে বিষণ্নতা তৈরি হয়।

♦          শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয় বলে এ নিয়ে অনেক সময় বিষণ্নতায় ভুগতে পারে।

ছেলে-মেয়েতে বড় হওয়ায় আছে পার্থক্য

নারী-পুরুষের মধ্যে যে আলাদা কিছু বিষয় থাকে, এ সময় এসে বাচ্চারা তা বুঝতে শুরু করে। ছেলেদের দাড়ি, গোঁফ গজায়, মাসল তৈরি হয়, কণ্ঠ পরিবর্তন হয়। মেয়েদেরও শারীরিক পরিবর্তন দেখা দেয়। এতে করে এত দিনের চেনা পরিবেশও তাদের কাছে বদলে যেতে শুরু করে। 

 

প্রযুক্তির ব্যবহার, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কিভাবে প্রভাব ফেলে

প্রযুক্তির ব্যবহার বয়ঃসন্ধিকালের ছেলে-মেয়েদের ওপর নানারূপ প্রভাব ফেলে। ইন্টারনেটের ব্যবহার মন্দ নয়। কিন্তু কোনো কিছুরই অতি ব্যবহার ভালো নয়। ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়লে বাস্তবজীবনের অভিজ্ঞতা কম হবে। ছেলে-মেয়েরা শৈশব এবং কৈশোরেই বেসিক লাইফ স্কিলগুলো শিখে থাকে। মানুষের সঙ্গে বাস্তব জীবনে মেলামেশার বিকল্প নেই। এ সময় অভিভাবককে তার সবচেয়ে বড় বন্ধুর জায়গা করে নিতে হবে।

 

করণীয়

সন্তানকে বোঝাতে হবে কোনটা তার জন্য নিরাপদ ও প্রয়োজনীয়। পরিবার থেকেই শেখাতে হবে, কত দূর পর্যন্ত মেলামেশা তার জন্য নিরাপদ। মেয়েদেরও সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগে থেকেই সতর্ক করতে হবে। যৌন সম্পর্ক এবং মাতৃত্ব সম্পর্কে তাদের ধারণা দিতে হবে। এতে তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। অন্যান্য সম্পর্কের মধ্যেও নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারবে। পরিবার থেকে প্রতিটি সম্পর্কের মূল্যবোধ আগে থেকেই ধারণা দিয়ে রাখলে অনেক অপ্রত্যাশিত সংকট থেকে সহজে রক্ষা পাওয়া যাবে।

 

মা-বাবাকে মনে রাখতে হবে

♦          মা-বাবাকে কোয়ালিটিসম্পন্ন জীবনযাপন করতে হবে।

♦          বাচ্চাকে সময় দিতে হবে।

♦          বাচ্চার সঙ্গে এমনভাবে সময় কাটাতে হবে, যাতে সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।

♦          বাচ্চাদের প্রচুর পরিমাণে বাইরের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলার সুযোগ দিতে হবে।

♦          বাচ্চাদের পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। তার মানে এই নয় তাদের ওপর নজরদারি করতে হবে, তাদের সঙ্গে লেগে থাকতে হবে।

♦          বাচ্চা কার সঙ্গে খেলছে, কাদের সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে—বিষয়গুলো মা-বাবার জানা থাকা জরুরি।

♦          বাসায় বাচ্চার বন্ধুদের আসার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

♦          মোবাইল, কম্পিউটার ব্যবহারে সময় বেঁধে দিতে হবে। মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে না দেওয়াই ভালো।

            মোবাইল ব্যবহারের সময় ছেলে-মেয়েদের ভালো করে পর্যবেক্ষণে রাখা যায় না। তার চেয়ে ডেস্কটপ ব্যবহার করতে দেওয়া ভালো।

সন্তান যদি নিজের করা কোনো ভুল বুঝে আপনার প্রতি এগিয়ে আসে, তবে অভিভাবক হিসেবে আপনারও উচিৎ হবে তাকে সেই স্পেস দেওয়া। তার অবসরকে রঙিন করে তুলতে আপনার চেয়ে বড় সঙ্গী কেউ নয়, এই বোধটুকুও তাকে দিন। তার সঙ্গে কাটান সুন্দর সব মুহূর্ত।

কখন, কতটুকু সময় সন্তানকে একা ছাড়বেন, কখন ছাড়বেন না- সেই সিদ্ধান্ত অভিভাবক হিসেবে আপনাকেই নিতে হবে। তবে জোর করে নয়, তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে কী তার জন্য ভালো, কী নয়

 

 

 

 

 

 



মন্তব্য