kalerkantho


অন্য কোনোখানে

দড়ির সেতু আর দৈত্যাকার বাঁধ দেখতে বেলফাস্টে

রাইসুল সৌরভ   

৩০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



দড়ির সেতু আর দৈত্যাকার বাঁধ

দেখতে বেলফাস্টে

ক্যারিক-এ-রেড রোপ ব্রিজ

বিমানের বহির্গমন দরজা ডিঙিয়ে বাইরে চোখ মেলতেই দেখি ঝুম বৃষ্টি। ঝাপটা এসে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে শরীর!

বিমানবন্দরটা শহর-কেন্দ্র থেকে খানিকটা দূরেই। সেখানে যাওয়ার জন্য নির্ধারিত ৩০০ নম্বর ডাবল ডেকার বাসের ওপরের তলায় চড়ে বসলাম। কমলা রঙের সড়ক বাতিতে রাতের বেলফাস্টের শহরতলিটা অন্য রকম এক সাজে সেজেছে। সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে মূল শহরে প্রবেশ করতে তেমন একটা সময় লাগল না। আগে থেকে ঠিক করে রাখা হোটেলে ব্যাগটা কোনোমতে রেখে পেটপুজো করতে বাইরে বের হলাম। ম্যাকডোনাল্ডসে ডিনার সেরে শহরটাকে ঈষৎ দেখার চেষ্টা করলাম। এর পর সোজা নিজেকে বিছানায় চালান করে দিলাম।

উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্ট শহরে দেখার মতো বেশ কিছু স্পট থাকলেও পর্যটকদের মূল আকর্ষণ কিন্তু প্রকৃতি। মূল শহর থেকে ঘণ্টা তিনেকের পথ পাড়ি দিয়ে যাওয়া যায় ক্যারিক-এ-রেড রজ্জু ব্রিজ আর দৈত্যাকার বাঁধ জায়ান্ট কসওয়ে দেখতে। ফেব্রুয়ারিতে দিনের আলো অল্প সময়ের জন্য থাকে। আর তাই সকাল সকাল পর্যটক বাস ধরার জন্য হোটেল থেকে রওনা দিলাম। তবে বাস কিন্তু ছাড়ল নির্ধারিত সময় মেনেই, ঘড়ির ঘণ্টার কাঁটা তখন সকাল ১০টার ঘরকে স্পর্শ করছে।

যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির হলাম বেলফাস্ট হ্রদের পার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যারিক ফারগুস ক্যাসেলে। শীতের বেলা ক্ষণস্থায়ী হওয়ায় চালক কাম ট্যুর গাইডের কাছ থেকে ক্যাসেলের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি মিলল না। তবে প্রাসাদের প্রবেশমুখ দেখে এসে হালকা হাঁটাহাঁটি চলল হ্রদের পার ধরে। সকালের সোনাঝরা মিষ্টি কোমল রোদ চিকচিক করে হ্রদের নীল শান্ত ঢেউয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিল। তবে রোদ থাকলে কী হবে, শীতের হিমেল বাতাসের দাপট ছিল দেখার মতো!

রাজপ্রাসাদ আর হ্রদ দেখা শেষে বাস শাঁ শাঁ করে আবার ছুটে চলল। এবার গন্তব্য বেলফাস্টের রজ্জু নির্মিত বিখ্যাত সেতু। পুরো ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য যে এই যাত্রা পথেই লুকিয়ে আছে, তা কী আর বুঝতে পেরেছি পথ ফুরনোর আগে? যাত্রা পথে মনে হয়েছে অন্যবারের মতো এই বুঝি খানিক পরে আবার ড্রাইভার নামিয়ে দেবে কোনোখানে। আড়াই ঘণ্টার এই যাত্রাটিকে আমার কাছে এক প্রকার স্বর্গযাত্রাই মনে হয়েছে। চলতি পথের একপাশে উত্তর আটলান্টিকের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে, আর অন্য পাশে সবুজ শৈল অটল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মনে হচ্ছে আমাদের চলার পথ বুঝি সমুদ্র আর পাহাড়ের মাঝখানে সূক্ষ্ম এক বিভেদ রেখা টেনে দিয়েছে। পাহাড়ের সঙ্গে সাগরকন্যার মিলনের বাধা হয়ে ঠিক তাদের মাঝ বরাবর চলে গেছে গাড়ি চলাচলের এই সরু পথখানি।

ওই দূর থেকে সাগরের নীল জলরাশি ঢেউ তুলে গর্জন তুলে আসতে আসতে তীরে এসে সফেদ ফেনা হয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখতে দেখতেই তো বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়! অপার সুন্দরের পসরা সাজানো এমনি চমত্কার রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি গন্তব্যে। আমাদের বাসের চালক একটু পরপর জানিয়ে দিচ্ছিলেন চলতি পথের বিভিন্ন জায়গার বিশেষত্ব। সেসবের মধ্যে অন্যতম ছিল বিশ্ববিখ্যাত টিভি ধারাবাহিক ‘গেম অব থ্রোনস’-এর শুটিং স্পটগুলো। এরই মধ্যে হঠাৎ করে সবাই লক্ষ করল আমাদের স্বাগত জানাতে আকাশে উঁকি দিয়েছে বর্ণিল রংধনু! রংধনু থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতেই চোখে পড়ল ভেড়ার দলে। সবুজ ঘাসে ভরা মাঠে চরে বেড়াচ্ছে। আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু পথ ধরে যেতে যেতে আর ঢেউ আকৃতির পাহাড় দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল আমরাও বুঝি ঢেউয়ে দোল খাচ্ছি।

পাহাড়ের কোথাও কোথাও ঘন সবুজ, আবার কোথাও ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেছে এই শীতে। এসব দেখতে দেখতে কিভাবে যে আড়াই ঘণ্টা পেরিয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। অবশেষে চলে এলাম ‘ক্যারিক-এ-রেড’ রোপ ব্রিজের কাছে। যেখানে বাস পার্ক করল, সেখান থেকে ব্রিজে চড়তে কমপক্ষে ১৫ মিনিট হাঁটতে হবে। সম্পূর্ণ রজ্জু বা দড়ির তৈরি এই সেতু ঝুলছে দুই পাহাড়ের মধ্যখানে, একেবারে সাগরের ওপরে। তাই যথেষ্ট সাহস না থাকলে সেতুতে ওঠার টিকিট না কাটাই ভালো। শুধু শুধু পাউন্ড খরচ করার কোনো মানে হয় না। বাস থেকে নামার পর পরই কিছুটা উত্তেজিত ছিলাম। নিজের প্রবল উচ্চতাভীতি থাকার পরও এই সেতু পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

সবুজে ছাওয়া উঁচু-নিচু পাহাড় চোখে পড়ছিল দূর থেকেই। পাহাড়ের একটা অংশ আবার নিচু হয়ে একেবারে নেমে গেছে উত্তর আটলান্টিকের পেটের ভেতর। ছোট ছোট ঢেউ মাঝ দরিয়া থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে আছড়ে পড়ছে তীরে। নীল জলরাশির মধ্যে দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট দ্বীপ। আর ঠিক ২৫ মাইল দূরে বুক চিতিয়ে শুয়ে রয়েছে এক প্রকাণ্ড দ্বীপ। এসব দেখতে দেখতেই পৌঁছে গেলাম ব্রিজে ওঠার প্রান্তে। দুই পারে দাঁড়িয়ে থাকা দুই রক্ষী গুনে গুনে পর্যটকদের এই দড়ির ব্রিজে ওঠাচ্ছে। এখানকার কর্তৃপক্ষের আয়োজন দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলাম এই ভেবে যে সাগরে পড়ে গেলেও অন্তত উদ্ধার করার প্রশিক্ষিত লোক পাওয়া যাবে। এই দড়ির সেতুটা মূলত জেলেরা মাছ ধরার সুবিধার্থে বহু বছর আগে তৈরি করলেও, এখন তা পরিণত হয়েছে পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর আদল বদলালেও রোমাঞ্চ যেন একই রকম রয়ে গেছে। না হলে মাত্র ২০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু পাড়ি দিতে কি আর দুরুদুরু বুকে ওঠা লাগে! সঙ্গে উপরি পাওনা হিসেবে যোগ হয়েছিল হাড় ঠাণ্ডা করে দেওয়া বুনো মাতাল বাতাস। তাতে সেতুটা নিয়ম করে একটু পর পর দুলে উঠছিল। অবশেষে সাহস করে যাওয়া-আসা মিলিয়ে সেতুটা দু-দুবার পাড়ি দিয়েই ফেললাম।

রোপ ব্রিজ ঘোরাফেরা আর মধ্যাহ্নভোজ সেরে বাস চলল জায়ান্ট’স কোজওয়ের উদ্দেশে। আমাদের বাসচালক কাম গাইডের মতে, এটা নাকি পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য। আগেরবারের মতো আমাদের বাসটা যেখানে পার্ক করল, সেখান থেকে আবার ২০ মিনিট হেঁটে যেতে হবে জায়ান্ট’স কোজওয়ে দেখতে। এবার সাগরের তর্জন-গর্জন আরো বৃদ্ধি পেল যেন। দূর থেকেই ভেসে আসতে লাগল প্রকট আওয়াজ। সাগর যেন গজরাতে গজরাতে তার সমস্ত রাগ উগরে দিচ্ছে সমুদ্র পারে। হাঁটতে হাঁটতে জায়ান্ট’স কোজওয়ে আরো একটু স্পষ্ট হতেই বুঝলাম কেন ব্যাটা ড্রাইভার একে বারবার অষ্টম আশ্চর্য নামে অভিহিত করেছেন। ওটা দেখে তো রীতিমতো ভিরমি খাওয়ার জোগাড়! থরে থরে বিভিন্ন আকারের পাথর কেউ যেন কায়দা করে সাজিয়ে রেখেছে সাগর তীরের একটা নির্দিষ্ট এলাকাজুড়ে। যেন কোনো প্রাকৃতিক বাঁধ! সেখানে সাগরের বিশাল সব ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। সত্যিই অভিভূত হওয়ার মতো বিষয়। এসব দেখে মনে হলো আসলেই পৃথিবীতে অবাক করার মতো কত বস্তুই না আছে! এই এক জীবনে কী সেসব দেখে ফেলতে পারব?

জায়ান্ট’স কোজওয়ে

 



মন্তব্য