kalerkantho


আদবকেতা

নির্দ্বিধায় বলুন, সরি

মারজান ইমু    

২৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



নির্দ্বিধায় বলুন, সরি

মানুষ মাত্রই ভুল হয় বা হতে পারে। নিজের ভুল বুঝে প্রিয়জনকে কিভাবে সরি বলেন জানতে চেয়েছিলাম কয়েকজনের কাছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগে কাজ করছেন রূপক চৌধুরী প্রতীক। জানালেন, ‘নিজের ভুল স্বীকারে আমার কোনো কার্পণ্য নেই। আমার মনে হয় ভুল বোঝাবুঝি ফেলে রাখলে পরে সেটা মিটিয়ে নেওয়ার সুযোগ কমে যায়। আর প্রিয়জনের কাছে সরি হওয়া মানেই সম্পর্ক এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। দুজনের বোঝাপড়া আরেকটু শক্ত হওয়া। আমার ক্ষেত্রে যদি বলি সব সময় যে মুখেই সরি বলি তা না। কখনো কখনো সরিটা আমি নিজেকেই বলি, যেন ভবিষ্যতে এমন ভুল আর না হয়। কখনো আবার ঘটা করে সরি বলার জন্য বিভিন্ন উপায় বেছে নিই। নিজেদের জন্য একটু সময় আলাদা করে সুন্দর কিছু মুহূর্ত তৈরি করি। অনেক ব্যস্ততার মাঝে এই সময়টুকু নিজের ভুলের ক্ষতিপূরণও বলতে পারেন। সেই সঙ্গে বাড়তি পাওনা সুন্দর কিছু স্মৃতি।’

একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত তিথি সাহা শোনালেন তাঁর সরি বলার গল্প। বললেন, ‘আমি খুব চঞ্চল, অস্থির। এদিকে সঙ্গী অনুপ কুমার দাস খুবই নিরীহ মানুষ। তিনি সব বিষয়ে এতই পজিটিভ যে তাঁকে সরি তেমন বলতে হয় না। আর আমার কথা যদি বলি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাগ-জেদ আমিই করি। আর অনুপ সেটা নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় না। একা একা রাগ করে পরে কিছুটা অনুতপ্ত হলেও ঘটা করে সরি বলা তেমন হয়ে ওঠে না। কারণ আমার বিশ্বাস আমার সঙ্গী আমার অনুভূতিগুলো খুব ভালো বুঝতে পারে।’ 

নিজের ভুল বুঝতে পারা এবং সরি বলার মাহাত্ম্য নিয়ে জানতে চেয়েছিলাম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কাউন্সিলর প্রফেসর ড. কালি প্রসন্ন দাসের কাছে। তিনি জানালেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুঃখিত বলাকে আমরা ভাবি পরাজয় স্বীকার করা। অথচ নিজের ভুলের জন্য ‘আমি দুঃখিত’ বলাটা কারো দুর্বলতা নয়। সত্যিটা হলো, ‘দুঃখিত’ বলার জন্য যথেষ্ট মানসিক শক্তি অর্জন করতে হয়। দুঃখ প্রকাশ সে-ই করতে পারে যে নিজের ভুলের দায়িত্ব নিতে পারে, যার যথেষ্ট মানসিক দৃঢ়তা রয়েছে। একইভাবে দুর্বল ব্যক্তিসম্পন্ন মানুষরাই অন্যের সরি বলার জন্য প্রতীক্ষা করে থাকে। সাধারণত নিজের ভুল স্বীকারের পরিবর্তে আমরা ভাবি প্রিয়জন আমাদের বুঝে নেবে, মুখ ফুটে সরি বলার প্রয়োজন নেই। কিন্তু মুখে সরি না বললে মনের মধ্যে ঘটনার ক্ষোভ বা ভুল বোঝাবুঝি থেকে যেতে পারে। যা জমা হতে হতে সম্পর্কে দূরত্ব বাড়ে। সম্পর্কের গভীরতা, সৌন্দর্য, শ্রদ্ধা, আনন্দ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ক্ষেত্রে করণীয় হচ্ছে যখনই আমি বুঝতে পারব আমার ভুল হয়েছে, তখন আমার দায়িত্ব হলো ভুল স্বীকার করা এবং তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা। সরি বলা বা দুঃখ প্রকাশ করার কিছু নিগূঢ় তাত্পর্য রয়েছে। সরি বলার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আসলে একটা প্রতিশ্রুতি দিই। প্রথমত, এই প্রতিশ্রুতি নিজের সঙ্গে তারপর যাকে সরি বলছি তার কাছে। সরি মানে হলো, আমি নিজের ভুলের দায়িত্ব স্বীকার করছি এবং কথা দিচ্ছি ভবিষ্যতে এই ভুল থেকে সাবধান হব। সরি বলাতে এই প্রতিশ্রুতি না থাকলে কিংবা দুঃখ প্রকাশ করে সেই কাজ আবার করলে সেই সরি বলা অবশ্য অর্থহীন। এতে দুঃখ প্রকাশকারী ধীরে ধীরে প্রিয়জনের বিশ্বাস হারাবেন। তাই আমাদের সবার উচিৎ নিজের ভুলের দায়িত্ব নেওয়া এবং নিজের ভেতর থেকে পরিবর্তন আনা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট তানজির আহমেদ তুষার জানালেন, প্রিয়জনকে সরি বলার ক্ষেত্রে সাধারণত আমাদের বিভিন্ন ধরনের ইগো কাজ করে। ভাবেন, সরি বলা মানে ছোট হয়ে যাব। অথচ প্রিয়জনের কাছে ছোট হওয়ার কোনো বিষয় নেই। কেউ যদি ভুল করে এবং সেটা বুঝতে পারে, তার জন্য সরি বলাটা গৌরবের। প্রয়োজনে স্যরি বলা মানে হলো তাঁকে সম্মান করা, গুরুত্ব দেওয়া। আর প্রিয়জনের কাছে সবাই সম্মান, গুরুত্ব আর ভালোবাসাই প্রত্যাশা করে। ভুল যত ছোটই হোক বা বড়, সরি বলাতে ছোট হওয়ার কিছু নেই। সুখী সম্পর্কের অন্যতম চাবিকাঠি হলো আপনার তরফ থেকে কিছু ভুল হয়েছে বুঝলে সঙ্গীর এগোনোর অপেক্ষা না করে আগে সরি বলুন। শুধু সরি বললেই হবে না; বরং সরি বলার জন্য সঠিক সময় বেছে নেওয়া ভালো। আবহ বুঝে শান্ত সময়ে ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হয়ে সরি বলা গুরুত্বপূর্ণ। এবং সরি হওয়া উচিত শর্তবিহীন। শুধু মুখেই সরি বলতে হবে তা নয়। সামনাসামনি না বলতে পারলে চিঠি লিখুন। কাগজে কিংবা অনলাইনে। ছোট কোনো উপহার কিংবা সারপ্রাইজ দিয়েও আপনার অনুশোচনা বোঝাতে পারেন।

 

 

♦          সরি কোনো নেতিবাচক শব্দ না, এটা মাথায় রাখুন। ‘ভালোবাসায় আবার সরি কিসের?’ এ ধারণাও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিন।

♦          দায়সারাভাবে ‘সরি’ না বলে মন থেকে বলুন। ইগো ঝেড়ে, দ্বিধা সরিয়ে, আন্তরিকতার সঙ্গেই শব্দটি বলতে হবে। নয়তো বডি ল্যাঙ্গুয়েজেই ধরা খেতে পারেন।

♦          রাগ পুষে রেখে ‘সরি’ বলে লাভ নেই। আবার বিপরীতপক্ষকেও রাগ বাড়াতে দেবেন না। সময় নষ্ট না করে সমস্যার দ্রুত সমাধান করুন।

♦          ‘সরি’ বলার বড় বাধা ইগো। নিজের মানসিক অনুভূতির সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এই ইগো। একে নিজের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে দেবেন না। তার আগেই সরি বলে ফেলুন।

♦          দেখা করেই ‘সরি’ বলা উচিত। মেসেজে বা মোবাইলে না। তবে অবস্থানের দূরত্ব বেশি হলে কী আর করা!

♦          অন্যের দোষ দেখার আগে নিজেরটাও দেখে  নেওয়া ভালো। তাতে সম্পর্ক সুন্দর হয়।

♦          সরি বলতে কোনো শর্ত চাপাবেন না।

♦          একান্তই মুখে সরি বলতে বাধলে একটু হাসুনই না হয়! হাসি তো সর্ব রোগের ওষুধ। ভুলেরও।



মন্তব্য