kalerkantho


ফিরেছে কাঁথার ফোঁড়

পোশাকের নকশায় কাঁথার ফোঁড় নতুন কিছু না। সময়ের সঙ্গে শুধু বদলেছে নকশা ও উপস্থাপন। বারোয়ারি ব্র্যান্ডের দোকান থেকে নামি ফ্যাশন হাউস সবখানেই কাঁথা স্টিচের জয়জয়কার। পোশাকে কাঁথা ফোঁড়ের হালচাল জানাচ্ছেন মারজান ইমু

১৬ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ফিরেছে কাঁথার ফোঁড়

মডেল : রিফাত ও বাপ্পা, পোশাক : রঙ বাংলাদেশ, ছবি : কাকলী প্রধান

ধারণা করা হয় জোড়াতালি দেওয়ার ধারণা থেকে কাপড়ে কাঁথা ফোঁড় নকশার উত্পত্তি। পাঁচ শ বছর আগে কৃষ্ণদাস কবিরাজের সাহিত্যে সেলাই করা কাঁথার উল্লেখ পাওয়া যায়। পুরনোকে নতুন করে ব্যবহারের কত শত গল্পগাথা লুকিয়ে আছে এই কাঁথার ফোঁড়ের নকশায়! ছেঁড়া, বাতিল শাড়ির মোটা পাড় থেকে সুতা আলাদা করে তারপর দু-তিনটি শাড়ির জমিন একসঙ্গে সেলাই দিয়ে তৈরি হতো হালকা শীতের কাঁথা। শুধু বাতিল শাড়ি নয়, সুঁই-সুতার নকশায় রঙিন হতে লাগল বালিশের কাভার, টেবিল ক্লথ, জানালার পর্দাসহ সব ধরনের ইন্টেরিয়র ফ্যাব্রিকস। কাঁথা সেলাইয়ের সেই ফোঁড় নকশা সগৌরবে আবার ফিরে এসেছে পোশাকে। পোশাকে কাঁথা ফোঁড় বা হাতের কাজের ব্যবহার অল্পস্বল্প সব সময়ই ছিল। আজকাল তা খুব বেশি চোখে পড়ছে। আড়ং, দেশিদশ, স্বদেশি, ওটু, সেইলরসহ প্রায় সব দেশীয় ও পশ্চিমা ধাঁচের ফ্যাশন হাউসের ডিজাইনার কালেকশনে দেখা মিলছে কাঁথা সেলাইয়ের নকশাদার পোশাক। সুঁই-সুতার ফোঁড় থাকছে কখনো হাতের বর্ডারে, টপসের গলায়, কখনো আবার শাড়ির পাড় ও আঁচলে। সঙ্গে যোগ হয়েছে নিত্যনতুন মোটিফ আর নকশা।

বিবিয়ানার ডিজাইনার লিপি খন্দকার জানালেন, ‘ভারী নকশার জবরজং হাতের কাজের ব্যবহার এখন অনেকটাই কমে গেছে। কাঁথা ফোঁড়ের নকশার মূল আকর্ষণ এতে ব্যবহূত উজ্জ্বল রঙের সুতা। ফিউশন নকশায় রং বাহারি কাঁথা ফোঁড়ের সঙ্গে ডিজাইন মাধ্যম হিসেবে আরো ব্যবহার হচ্ছে ব্লক, স্ক্রিন প্রিন্টসহ অন্যান্য নকশা।’ বেশ কয়েকটি ফ্যাশন হাউস ঘুরে দেখা গেল, শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজ তো আছেই। হাতের কাজের নকশার দেখা মিলছে টপস, শার্ট, কুর্তা বা গাউনের মতো পশ্চিমা ধাঁচের পোশাকেও। রেগুলার ও এক্সক্লুসিভ—দুই ধরনের পোশাকেই কাঁথা ফোঁড়ের নকশা করা হচ্ছে। রেগুলার ওয়্যারে সুতি কাপড়েও কাঁথা স্টিচের নকশা হচ্ছে বেশি। এক্সক্লুসিভ কালেকশনে থাকছে সিল্ক, তসর, মসলিন ও শিফনের মতো ফ্যাব্রিকস। শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে একই নকশার যুগল বা পারিবারিক পোশাকও থাকছে ফ্যাশন হাউসগুলোয়। বয়স্কদের সাদা পাঞ্জাবিতে হাতের কাজের নকশা তো কালজয়ী হয়ে আছে। নতুনত্ব এসেছে তরুণদের পাঞ্জাবিতে। বাহারি রঙের পাঞ্জাবিতেও হাতের কাজের কদর বেশ। সুতি, মসলিন, আদ্দি, সিল্ক ফ্যাব্রিকসে মেশিন এমব্রয়ডারি কিংবা ঝকমকে জারদৌসির নকশা ছাড়া কাঁথা ফোঁড়ের নকশায় ডিজাইন হচ্ছে জমকালো পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির সঙ্গে মিলিয়ে ছেলেদের কটিতেও দেখা যাচ্ছে বাহারি রঙের কাঁথা ফোঁড়ের নকশা।

 

কাঁথা স্টিচের পোশাকে ফিউশন নকশার আধিক্য বেশ চোখে পড়ে। নকশি কাঁথার নকশা ছাড়াও আরো হরেক রকম ঐতিহ্যবাহী সেলাই থাকছে ডিজাইনে। ডালফোঁড়, ক্রস সেলাই, ভরাট সুতার কাজ, গুজরাটি নকশা, গিঁট বা কাটা ফোঁড়, রাজস্থানি আরের কাজসহ থাকছে হাতের কাজের নানা নকশা। পোশাকের ডিজাইন বা কাটিং প্যাটার্নে বৈচিত্র্য থাকলেও হাতের কাজের নকশি-নকশায় দেখা মেলে তার চিরায়ত সেলাইয়ের ফোঁড় আর উজ্জ্বল রঙের সুতা। তবে নকশার সুতা নির্বাচন করা হচ্ছে পোশাকের রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই। ফ্যাশন হাউস রঙ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী ও ফ্যাশন ডিজাইনার সৌমিক দাস বললেন, ‘কাঁথা ফোঁড়ের আকর্ষণের মূল কারণ এর উজ্জ্বল সুতায় সূক্ষ্ম ফোঁড়ের নকশা। পোশাকের ফ্যাব্রিকস আর ডিজাইনে সামঞ্জস্য রেখে রং নিয়ে নিরীক্ষা করছে ফ্যাশন হাউসগুলো। তাই আলাদা করে আর কয়েকটি রঙের কথা বলার উপায়  নেই। নিজের ব্যক্তিত্ব আর সাবলীলতার বিষয়টি মাথায় রেখে ইচ্ছামতো রং আর নকশার শাড়ি বা অন্য যেকোনো পোশাক বেছে নিতে পারেন যে কেউ।’

নামি ফ্যাশন হাউসগুলোর পাশাপাশি ছোট উদ্যোক্তারাও হাতের কাজের সংগ্রহ নিয়ে কাজ করছেন। রাজধানীর  ছোট-বড় সব শপিং মলেই কাঁথা ফোঁড়ের সালোয়ার-কামিজ ও থ্রি-পিস পাওয়া যাচ্ছে। বৈচিত্র্যময় সংগ্রহ চোখে পড়ে ওড়নায়। একরঙা ওড়নায় রং বাহারি ভারী নকশাদার কাঁথা ফোঁড়ের ওড়না পরছে সব বয়সী মেয়েরা। ওড়নায় কাঁথা ফোঁড়ের প্যাঁচওয়ার্কও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। একটা নকশাদার ওড়না কোনো পোশাকের সঙ্গে ম্যাচিং আবার কোনোটায় কন্ট্রাস্ট করে মানিয়ে যাচ্ছে বেশ কয়েকটি পোশাকের সঙ্গে। ওড়নায় ফোঁড়ের নকশায় প্রাধান্য পাচ্ছে কটকি, ফ্লোরাল নকশাসহ সুতার ভরাট কাজ। নকশা ফিউশন হচ্ছে একই সঙ্গে ব্লক, বাটিক ও স্ক্রিন প্রিন্টে। ম্যাটেরিয়ালে একদম খাঁটি সুতি যেমন আছে, তেমনি পিওর সিল্ক, হাফ সিল্ক, ভয়েল—সব ম্যাটেরিয়ালই ব্যবহার করা হচ্ছে।

কোথায় পাবেন

দেশীয় সব ফ্যাশন হাউসেই মিলবে কাঁথা স্টিচের সব ধরনের পোশাক। ব্যতিক্রমী নকশা চাইলে দেখতে পারেন আড়ং, মায়াসির, বিবিয়ানা, সাদাকালো, রঙ বাংলাদেশ, কে ক্রাফট, বিশ্বরং, সেইলর, লারিভ বা স্বদেশির আউটলেট। আজিজ সুপার মার্কেটে বেশ কয়েকটি হাতের কাজের পোশাকের দোকান রয়েছে।

তুলনামূলক কম বাজেটে কাঁথা স্টিচের বৈচিত্র্যময় সালোয়ার-কামিজ, থ্রি-পিস বা বাহারি ওড়নার সংগ্রহ পাবেন চাঁদনীচক, গাউছিয়া ও মৌচাক মার্কেটে। বাজেটবান্ধব ছেলেদের পাঞ্জাবি পাবেন সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড়, মালিবাগ আয়েশা সুপার মার্কেটে।



মন্তব্য