kalerkantho


অন্য কোনোখানে

শ্বাসরুদ্ধকর সান্দাকফু

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



শ্বাসরুদ্ধকর সান্দাকফু

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বুড়িমারী অথবা বাংলাবান্ধা বর্ডার ক্রস করে ট্যাক্সি অথবা শেয়ার জিপে শিলিগুড়ি কিংবা ঢাকা-কলকাতা, সেখান থেকে ট্রেন বা বাসে জলপাইগুড়ি অথবা শিলিগুড়ি। এরপর শিলিগুড়ি-দার্জিলিং ট্যাক্সি অথবা শেয়ার জিপে; দার্জিলিং থেকে ট্যাক্সি বা শেয়ার জিপে মানেভাঞ্জন। মানেভাঞ্জন স্ট্যান্ডেই ভাড়া পাওয়া যাবে সান্দাকফুর জন্য আপ-ডাউন ল্যান্ডরোভার জিপ। স্থানীয় চালকদের কাছ থেকে পরবর্তী গন্তব্যের ব্যাপারে যাবতীয় তথ্য পাওয়া যায়। মুফতানিয়া তানি

কোনো প্ল্যান-প্রগ্রাম ছাড়াই পড়ি মরি করে কিভাবে যে দার্জিলিং পৌঁছলাম, সেটি অন্য গল্প। শহরটি ঘোরা হয়ে গেল আড়াই দিনেই। দার্জিলিংয়ের তীব্র ঠাণ্ডায় নরমাল ফ্রিজের ফাংশন বোঝা হয়ে গেল সবার। এবার মনে হলো, ডিপ ফ্রিজটা বা তাহলে বাকি থাকে কেন? বরফ পড়াটাও দেখে যাই। বরফ পড়ছে কোথায়? বরফ পড়ছে গ্যাংটকে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গ্যাংটকে এখন বাংলাদেশিদের পারমিশন দেওয়া হচ্ছে না।

কী আর করা, সবাই মিলে ফাইনাল হলো সান্দাকফু। ১২ হাজার ফুট উঁচুতে পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ চূড়া। ওখান থেকে এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘাসহ বিশ্বের আরো দুটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ—লোেস, মাকালুর দৃশ্য দেখা যাবে। ট্রেকিং করে যেতে তিন-চার দিনের মতো লাগে। তবে গাড়িতে এক দিনেই যাওয়া যায়।

দার্জিলিং থেকে রওনা দিয়ে মেঘের রাজ্য আর দুই পাশে ঘন সবুজ পাইন বনের মধ্য দিয়ে পৌঁছলাম আরেকটি উঁচু শহর মানেভাঞ্জনে। এখান থেকেই আসল যাত্রা শুরু। আরো অনেক ওপরে উঠতে হবে। সেখানে যাওয়ার সাহস ও শক্তি যে একটি মাত্র গাড়ির আছে, ইংরেজ সাহেবদের তৈরি সেই ল্যান্ডরোভার ঠিক করা হলো।

রোড পিলারে লেখা আছে—সান্দাকফু ৩১ কিলোমিটার। কিন্তু সময় লাগবে নাকি সাড়ে চার ঘণ্টা। ঘটনা কী? ১৫ মিনিট পর থেকে শুরু হলো ঘটনা। রাস্তাজুড়ে পাথর পরিবারের রাজত্ব—দাদা পাথর, বাবা পাথর, মা পাথর, বাচ্চা পাথর। কিছু কিছু আছে পুরোই ভিলেন পাথর, যেগুলো গাড়ি উল্টিয়ে মৃত্যুস্বাদ পাইয়ে দেওয়ার জন্য ওত পেতে আছে। ১০ মিনিট পর পর হাজির হতে লাগল ইংরেজি এস অক্ষরের আদলে সরু, খাড়া বাঁক। কী ভয়ংকর! বাঁকগুলো উঠতে গিয়ে সবার কলিজা শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম। এদিকে প্রতি ১০ মিনিটে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। হাজারটা রকম আর হরেক রঙের বুনো ফুল-ফল, গাছ-লতাপাতা; ওক, ম্যাগেনালিয়া, রডোড্রেনডন, অর্কিডের মহাসমারোহ; ফাঁকে ফাঁকে ভ্যানিলা আইসক্রিমের মতো কাঞ্চনজঙ্ঘার মিষ্টি উঁকি। পাহাড়ি পথের বাঁকে বাঁকে ছোট্ট ঝিল, ঝিরি আর ধেয়ে আসা মেঘ মিলে অপূর্ব প্যানোরোমা। আমরা বুঝে পেলাম না—ভয়ে চিত্কার করতে থাকব, নাকি আনন্দে! একেই বুঝি বলে ভয়ংকর যোগ সুন্দর=ভয়ংকর সুন্দর!

রাস্তাটার বেশির ভাগ চলে গেছে ভারত, নেপালের সীমানার মাঝ দিয়ে। পথে তিনটি চেকপোস্টে থামতে হলো। ক্যাম্পগুলোও ঢেকে আছে ঘন মেঘে। দূর থেকে অবস্থান বোঝা যায় না। ওখানটায় পৌঁছতেই মেঘের ভেতর থেকে ভূতের মতো বেরিয়ে আসে ডিউটিরত সৈনিকরা। অতি ঠাণ্ডায় থেকে থেকে এদের মেজাজ আর গলার উত্তাপও বুঝি শীতল হয়ে গেছে। সবারই ব্যবহার অতি মিষ্টি। মায়াই লাগল। কত সুদূরের দেশ থেকে এসে স্বজন-যোগাযোগ-বিদ্যুৎ বঞ্চিত অবস্থায় কাটিয়ে দিচ্ছে বছরের পর বছর! নিজেদের উঠোন পেরিয়ে যাওয়া পর্যটকরাই এদের কাছে স্বজন।

অনেকটা দূরে দূরে স্বস্তিদায়ক নেপালি হোটেল। গাড়ি থামিয়ে, মগভর্তি গরম চা খেয়ে খেয়ে চার্জ নিয়ে নিলাম। মেঘ কেটে কেটে গাড়ি এগোচ্ছে। ঠাণ্ডা বাড়তে লাগল হু হু করে। ওপরে উঠছি তো উঠছিই। রাস্তা আর তো ফুরায় না। একসময় ঝুপ করে রাত নেমে এলো, সঙ্গে গা শিউরে ওঠা শীতল নির্জনতা। চালকের মধ্যে রাত বাড়ার আগেই গন্তব্যে পৌঁছার ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছিল। আর মাত্র কিছু পথ বাকি। হঠাৎ আমাদের ল্যান্ডরোভারটা বেঁকে বসল। সামনে ভিলেন পাথরদের পাথরবন্ধন! চালকের চেষ্টায় চাকার নিচ থেকে নিরীহ পাথররা নিচে গড়িয়ে যেতে লাগল। কিছু বড় ভিলেনকে রাস্তা থেকে হাত দিয়ে সরানোর পর চালক মশাই তাঁর সব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একটু একটু করে বেশ খানিকটা ওপরে উঠে গেলেন। পেছনে পেছনে আমরা গেলাম। কয়েক পা উঠতেই হঠাৎ টের পেলাম, নিঃশ্বাস নিতে পারছি না! কী হলো? আমার তো এ ধরনের কোনো সমস্যা নেই! বড় বড় করে শ্বাস নিতে গিয়ে মাইনাস ৩ ডিগ্রি শীতল বাতাস ফুসফুসে ঢুকে গেল। একে শ্বাসকষ্ট, তার ওপর পুরো শরীর জমে কুঁকড়ে যেতে লাগল। রাস্তায় পাথরের ওপরই শুয়ে পড়লাম। আর এক পাও এগোনো সম্ভব নয়! খুব কষ্ট হচ্ছে। আসলে এতক্ষণ গাড়িতে বসে থাকায় টের পাইনি। হাইয়েস্ট এলিভেশন এসে গেছে। সবারই কিছুটা সমস্যা হচ্ছে; কিন্তু আমার এতটা কেন?

বোনেরা দিশাহারা, কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। অসহায়ের মতো চারদিকে তাকালাম। রহস্যময় নির্জন রাত, দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া তখনো রুপায় মোড়ানো, ওপরেই অপেক্ষমাণ না-দেখা এক মায়াপুরী। এই অসহ্য সুন্দরের মধ্যেই কি আজ চলে যেতে হবে? পরম করুণাময়কে ডাকলাম, ‘আল্লাহ! অন্তত এখানে এভাবে নিয়ো না। এখনো তোমার সৃষ্টির কত মহিমা দেখা বাকি! চারপাশে এত বাতাস, আমি কেন শ্বাস নিতে পারছি না, আমাকে একটু অক্সিজেন দাও!’

তিনি শুনলেন। কারো একজনের মাথায় বুদ্ধি এলো মুখ থেকে মুখে শ্বাসপদ্ধতি কাজে লাগানোর। বাকি পথটা এক বোনের থেকে শ্বাস ধার নিয়ে নিয়ে একটু করে এগোলাম।

চূড়ায় মূলত কোনো লোকালয় নেই, আছে শুধু হাতে গোনা কয়েকটা লজ। সবাই দৌড়াদৌড়ি করে লজ ঠিক করে এলো। লজের একটা বড় ডরমিটরি ডাইনিংয়ে অনেকে আপাতত আশ্রয় নিয়েছে উষ্ণতা আর খাবারের জন্য। প্রাণোচ্ছল এক ট্রেকিং গ্রুপের সঙ্গে দেখা এবং গল্প হলো। তারা নাকি তিন-চার দিন ধরে ট্রেকিং করে এখানে পৌঁছেছে! তাদের দেখার পরিধিটা তাহলে আমাদের থেকেও বেশি!

ডিপ ফ্রিজ ফাংশনের নমুনা পাওয়া গেল। বাইরের বহমান বাতাস এখন রূপান্তরিত হয়েছে মৃদু তুষারপাতে। নিম্নতাপমাত্রায় জমে গেছে বালতির পানি, আমাদের সব কসমেটিকস; বদলে গেছে নাক-মুখের নকশাও। যেন জাদুবলে হঠাৎ অন্য গ্রহে চলে এসেছি। নেটওয়ার্ক নেই, বিদ্যুৎ বন্ধ, নেই হিটারের ব্যবস্থা। হট ওয়াটার প্যাড ভাড়া পাওয়া যায়, দুটি নিয়ে নিলাম হাতে-পায়ে চেপে ঘুমানোর জন্য। তার আগে অনেকক্ষণ কয়লার আগুনে নিজেকে রুটিছেঁকা ছেঁকে কিছুটা স্বাভাবিক হলাম। কিন্তু আমার অক্সিজেন সাপ্লাইয়ের স্ট্যাটাসটা রয়ে গেল দুর্বল নেটওয়ার্কের মতোই—নড়লেই চলে যায়, কী মুশকিল!

অভিজ্ঞতাপূর্ণ সফর এবং রোমাঞ্চিত রাতটির বিনিময়ে পরদিন ভোরে সান্দাকফু যে অমূল্য দৃশ্য উপহার দিল, সেটি বর্ণনাতীত। সারা জীবনের জন্য স্মৃতির একটা অংশ স্থায়ীভাবে দখল করে নেওয়ার মতো। সেটি অনুভব করতে হলে দাঁড়াতে হবে সান্দাকফুর চূড়ায়, সশরীরে, ভোরের তুষারে...বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে।

কিছুক্ষণ পর সবাই খেপাতে লাগল—‘মরতে বসছিলি। আবার যাবি?’

কলার ঝাঁকিয়ে বললাম—অবশ্যই! এবার ট্রেকিং করে যাব। শুধু একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার সঙ্গে নিয়ে নিলেই তো হচ্ছে!

ছবি : লেখক



মন্তব্য