kalerkantho


বৈশাখী সাজে সারা দিন

পঞ্জিকা গুনতে গুনতে চলে এলো আরো একটি নববর্ষ। নতুন জামার সঙ্গে মিলিয়ে গয়নাও কিনে ফেলেছেন অনেকেই। রূপ বিশেষজ্ঞদের বয়ানে এবারে জেনে নিই বৈশাখের সাজ নিয়ে তাঁরা কে কী ভাবছেন। লিখেছেন মারজান ইমু

৯ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বৈশাখী সাজে সারা দিন

মডেল : আনিকা, শাড়ি ও গয়না : কে ক্রাফট, সাজ : শোভন মেকওভার, ছবি : কাকলী প্রধান

রেড বিউটি স্যালনের স্বত্বাধিকারী আফরোজা পারভীনকে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বাঙালি সাজেই বেশি দেখা যায়। বৈশাখ সাজের প্রসঙ্গ তুলতেই মিষ্টি হেসে জানালেন, ‘দিনের প্রথম প্রহরে বর্ষবরণের গান, মঙ্গল শোভাযাত্রা, মেলায় ঘুরে বেড়ানো আর বৈশাখের সাজপোশাক—এ সবই বাংলার বর্ষবরণের চিরায়ত চিত্র। বিশেষ কোনো ধর্ম বা গোত্রের নয়, বৈশাখ বাঙালি জাতির উৎসবের দিন। পহেলা বৈশাখ এখন আগের চেয়ে অনেক বর্ণিল। নববর্ষবরণে অনেকেই এখন একেক বেলায় ভিন্ন ভিন্ন সাজপোশাকে নিজেকে সাজাতে চান। বেশির ভাগই সকালবেলার সাজে শাড়ি বরাদ্দ রাখেন। সারা বছর পশ্চিমা পোশাকে সাবলীল বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়েটিও বৈশাখের সকালের জন্য পাটভাঙা শাড়ি কেনে। আবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা বা পারিবারিক দাওয়াতে সে হয়তো টপস বা স্কার্ট পরতে চাইবে। পোশাক যা-ই হোক, বৈশাখের সাজের মূলকথা হলো, সাজে বাঙালিয়ানার ছাপ থাকবেই। একটু টানা চোখ, কপালে টিপ, ঠোঁটে রাঙা লিপস্টিক বৈশাখ সাজের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এই সাজ যেকোনো শাড়ির সঙ্গেই মানিয়ে যায়। ওয়েস্টার্ন সাজে কাজলের বদলে শ্যাডো দিয়েই চোখে টানা লুক আনা যেতে পারে। এখন টিপেও অনেক বৈচিত্র্য। পোশাকের সঙ্গে থিম মিলিয়ে হ্যান্ড পেইন্টের টিপ পরতে পারেন। রঙিন নকশাদার স্টোনের টিপও বেমানান লাগবে না। রোদে গরমে স্থায়িত্ব পেতে ম্যাট লিপস্টিক বেছে নিন। এখন শিমারি বেইজের চল। তবে বেইজ খুব পুরু হবে না। হালকা বেইজে দিনের বেলায়ও সাজের শেষে একটু শিমারি পাউডার বুলিয়ে নিতে ভুলবেন না।’


পোশাক : আনোখি

সাজ : প্রিভে স্যালন অ্যান্ড স্পা


টিনদের সাজপোশাক বড়দের থেকে খানিকটা আলাদা হয়। এখন বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস বিভিন্ন উৎসবে টিনএজারদের জন্য আলাদা করে পোশাক ডিজাইন করছে। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে টিনদের সাজ নিয়ে জানালেন প্রিভে স্যালন অ্যান্ড স্পার কর্ণধার নাহিলা হেদায়েত। তাঁর বয়ানেই জেনে নিই তরুণীদের বৈশাখের সাজের কথা। ‘টিনরা এমনিতেই প্রাণচঞ্চল আর স্বতঃস্ফূর্ত হয়। এই বয়সে ত্বকে দাগ-ছোপ বা অন্য সমস্যা তেমন থাকে না। তাই খুব বেশি মেকআপ না করে স্বাভাবিক সতেজ সাজ রাখলে ভালো দেখাবে। বেইজ হবে খুব হালকা। তার আগে ত্বক ভালো করে পরিষ্কার করে টোনার লাগালে সাজ অনেকক্ষণ সতেজ থাকবে। স্কিন টোনের সঙ্গে মিলিয়ে ফাউন্ডেশন বাছাই করতে হবে। হালকা লিকুইড বেইজ ফাউন্ডেশন লাগিয়ে তার ওপর কমপ্যাক্ট বা ট্র্যান্সলুসেন্ট পাউডার দিয়ে বেইজ শেষ করুন। শুষ্ক ত্বকের জন্য ট্রান্সলুসেন্ট পাউডার এবং তৈলাক্ত ত্বকে কমপ্যাক্ট পাউডার ভালো। চোখে শ্যাডোর বদলে কালারফুল লাইনারের রেখা টেনে দিতে বলব আমি। একটু বৈচিত্র্য চাইলে প্রথমে কালো আইলাইনার দিয়ে লাইন টেনে তার ওপর পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে এক বা দুটি রঙিন পেনসিলের রেখা টেনে দিলে বেশ সুন্দর একটা লুক আসবে চোখে। চোখের এই সাজের সঙ্গে ঠোঁটে পিংক, কোরাল, পিচ ধাঁচের রংগুলো ভালো মানাবে। লাল লিপস্টিক চাইলে চোখের রঙে একটু মিতব্যয়ী হতে হবে। সে ক্ষেত্রে চোখে যেকোনো একরঙা শিমারি শ্যাডো চলতে পারে। টিনদের সাজে এটুকুই যথেষ্ট। আর হ্যাঁ, অল্প একটু ব্লাশনের ছোঁয়া থাকতে পারে গালে। সাজে সতেজ একটা লুক আনে ব্লাশন।’

চুলের সাজ নিয়ে জানতে চেয়েছি পারসোনার পরিচালক নুজহাত খানের কাছে। জানালেন, বৈশাখের তপ্ত রোদে বাঁধা চুলের বিকল্প নেই। এখন বিভিন্ন ধরনের বেণির সাজ খুব চলছে। উল্টো বেণি, ফ্রেঞ্চ, খেজুর বেণিসহ বিভিন্ন ধরনের বেণি করা যেতে পারে। এক হেয়ার স্টাইলে একাধিক বেণির সাজও বেশ ট্রেন্ডি। পছন্দমতো সিঁথি করে দুই পাশের চুলে ফ্রেঞ্চ বেণি করে পেছনের চুলে খেজুর বেণি করতে পারেন। কম বয়সীরা ধুতি-টপস, বাহারি কাটের কুর্তার সঙ্গে চুল কয়েক ভাগে ভাগ করে ইচ্ছামতো বেণি করতে পারেন। বিভিন্ন আকার ও মাপের বেণি বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। চুলে ছোট কাট দেওয়া থাকলে চাইলে পছন্দমতো বেণি কিনে সেট করে নেওয়া যেতে পারে। শাড়ির সঙ্গে খোঁপার সাজেও রাখতে পারেন বেণির ছোঁয়া। সামনে বেণি করে পেছনে খোঁপা করলে দেখতে ভালো দেখাবে।



কিংবা পুরো চুলে বেণি করে বেণি দিয়েই খোঁপা করতে পারেন। খোঁপায় বৈচিত্র্য আনতে বিভিন্ন আকারের কৃত্রিম বেণি ব্যবহার করতে পারেন। বাঁধা চুলের সাজ এবার বৈশাখ মাতাবে। তাই বলে চুল একেবারেই খোলা রাখা যাবে না তা কিন্তু নয়। অল্প সময়ের জন্য, সন্ধ্যার পর ঘরোয়া দাওয়াতে কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোনো অনুষ্ঠানে পছন্দমতো খোলা চুলের সাজ রাখতে পারেন। খোলা চুলের সাজে কার্লি চুল এখনো জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। সামনে দুই পাশে বেণি করে পেছনের চুল কার্ল করে এক পাশে এনে ছেড়ে রাখলে বেশ ট্রেন্ডি লুক আসবে। স্বাভাবিকভাবে কার্লি চুলের অধিকারীরা লুক বদলাতে চাইলে চুলে আয়রন বা গ্রেট করতে পারেন। সাজ শেষে মনে করে চুলে ফুল পরতে ভুলবেন না। খোঁপার পাশে, বেণিতে মুড়িয়ে, কানে গুঁজে ইচ্ছামতো ফুল পরুন। ফুলের ক্রাউন বা ব্যান্ডেনাও উৎসব উপলক্ষে বেশ মানায়। এই সময় তাজা ফুলের আকাল দেখা দেয়। সহজ সমাধান কৃত্রিম ফুল। এখন বৈচিত্র্যময় কৃত্রিম ফুল কিনতে পাওয়া যায়। দেখতে তাজা ফুলের মতোই। বাড়তি পাওনা, এসব ফুল সংরক্ষণ করা যায়।


পোশাক : আনোখি

সাজ : প্রিভে স্যালন এন্ড স্পা


সারা দিনের ঘোরাঘুরি, রোদ-গরম আর ঘামে সাজের সতেজতা কিভাবে বজায় থাকবে, এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন বিন্দিয়া বিউটি স্যালনের কর্ণধার শারমিন কচি। তিনি জানান, আগের দিন থেকেই বৈশাখের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। সম্ভব হলে এক দিন আগে ত্বকের ধরন বুঝে ফ্যাসিয়াল করে নেওয়া ভালো। সম্ভব না হলে আগের দিন একটু সময় করে ঘরেই কিছু পরিচর্যা করতে হবে। স্ক্রাবার দিয়ে ম্যাসাজ করে ত্বকের মরা কোষগুলো তুলে ফেলুন। তারপর ত্বকের ধরন অনুযায়ী ফেস মাস্ক লাগিয়ে ২০ মিনিট অপেক্ষা করে ধুয়ে নিন। সব শেষে ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে। রাতে ঘুমানোর আগে মুখ ধুয়ে প্রথমে টোনার, তারপর ময়েশ্চারাইজার লাগান। পরের দিন সকালে মেকআপ সহজেই ত্বকে বসে যাবে। অনেকক্ষণ সাজ ভালো রাখতে মেকআপের আগেও ত্বক ধুয়ে টোনার লাগিয়ে নিতে হবে। এরপর নরম সুতি কাপড়ে এক টুকরো বরফ নিয়ে ত্বকে বরফের ছেঁক দিন। মেকআপের আগে ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন ব্যবহার করে তারপর বেইজ শুরু করুন। সারা দিনের জন্য বের হলে টাচআপের জন্য ব্যাগে লিপস্টিক, কাজল, পাউডার আর ব্লাশন রাখুন। মেকআপ নষ্ট হয়ে গেলে ওয়েট টিস্যু দিয়ে মুছে প্রথমে পাউডার বুলিয়ে নিন। তারপর ব্লাশন ব্রাশ বুলিয়ে নিলেই সতেজ দেখাবে। প্রয়োজনে লিপস্টিক আর কাজলও ঠিকঠাক করে নিতে পারেন। শরীরে পানির অভাব হলে ত্বক ক্লান্ত দেখায়। তাই বেড়ানোর আনন্দে পানি খাওয়ার কথা ভুলে গেলে চলবে না। সারা দিনে গুনে গুনে ১০ গ্লাস পানি খেতে হবে। পানির বোতল সঙ্গেই রাখুন। আশপাশে ডাবের ভ্যান দেখলে চট করে একটা ডাব খেয়ে নিন। শরীর আর ত্বকের সঙ্গে মনটাও সজীব থাকবে।

শেষ কথা হলো, পোশাকের মতো সাজেও এখন আর বিশেষ কোনো ধরাবাঁধা ট্রেন্ড নেই। ইচ্ছামাফিক সাজের এই সময়ে নিজের পছন্দ আর স্বাচ্ছন্দ্যকেই প্রাধান্য দেন সবাই। সাজের ধারা একটা ধারণা মাত্র। সেখান থেকে মনমতো করে নিজের জন্য পোশাকের সঙ্গে মানানসই সাজ বেছে নিন। সবাইকে বাংলা নববর্ষের অগ্রিম শুভেচ্ছা।



মন্তব্য