kalerkantho


আপনার শিশু

শিখতে শিখতে বেড়ে ওঠা

২ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



শিখতে শিখতে বেড়ে ওঠা

সন্তানের জন্য মা-বাবার যত্ন ও সচেতনতার কোনো ঘাটতি থাকে না। কখনো কখনো তাদের অতি সচেতনতা শিশুদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ শিশুকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা মা-বাবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ছোটবেলা থেকেই শিশুকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার উপায় জানাচ্ছেন সানশাইন চাইল্ড ডে কেয়ার সেন্টারের স্বত্বাধিকারী চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট এক্সপার্ট ফারহানা আহমেদ

 

যে বয়স থেকে শিশুরা ভাবের আদান-প্রদান, যেমন কথা ও নির্দেশ বুঝতে পারে, সেই সময় থেকে শিশুর স্বাবলম্বী হওয়ার প্রশিক্ষণ শুরু করতে হবে। একেবারে শুরুতে দুই বছরের পর থেকে খেলনা গুছিয়ে ঠিক জায়গায় রাখা। সঠিক স্থানে আবর্জনা ফেলা, নিজ হাতে পানি বা শুকনা খাবার খাওয়া—এ ধরনের কাজ করতে উৎসাহ দেওয়া উচিত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজ হাতে খাবার খাওয়া, নিজের জামা-কাপড় গুছিয়ে রাখা, পড়ার টেবিল, স্কুলব্যাগ গুছিয়ে রাখা। স্কুলে যাওয়ার জন্য নিজেই তৈরি হওয়া, ব্যাগ গোছানো, জুতা পরার মতো কাজগুলো শিশুকে করতে দিন। ভুল করলে হাসিমুখে শুধরে দিন। সঠিকভাবে করতে পারলে প্রশংসা করুন। ক্ষেত্রবিশেষে পুরস্কৃত করুন। এতে শিশু দ্রুত সফল হবে এবং নিজের প্রতি আস্থা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে। পরবর্তী সময়ে নতুন কাজের প্রতি আরো আগ্রহী হয়ে ওঠে। নিজের কাজ ছাড়াও পরিবারের অন্যদের কাজে সাহায্য করতে শিশুকে উৎসাহ দিন। এতে সে আনন্দিত হয় ও নিজেকে দায়িত্বশীলও মনে করে। যেমন—ফোন, ডায়েরি, কলম, জুতা, ব্যাগ এগিয়ে দেওয়া। ছয়-সাত বছরের পর শিশুকে টুকটাক ঘরের কাজ করতে দিন। ঘরের রান্নার কাজে যতটুকু সম্ভব সাহায্য করা। খাবারের পর টেবিল গুছিয়ে রাখা। গাছের পরিচর্যা করা। ছেলে-মেয়ে আলাদা বিচার না করে প্রত্যেককে ঘরের ও বাইরের সব ধরনের কাজে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। শিশুকে ধীরে ধীরে লক্ষ্য নির্ধারণ করা শেখাতে হবে, যাতে করে তার মধ্যে সময়মতো কাজ শেষ করার অভ্যাস তৈরি হয়। যেমন—নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খেলাধুলা করা, খাওয়া, ঘুমানোর অভ্যাস করলে পরিণত বয়সে তার জন্য সব কিছু অনেক সহায়ক হবে। দায়িত্বের পাশাপাশি শিশুকে কিছুটা কাজের স্বাধীনতা দিন। কিছু বিষয়ে তার মতামত নিন। যেমন—সে কী ধরনের পোশাক পরে বাইরে যেতে চায়, স্কুলে কী টিফিন নিয়ে যেতে চায়। বাইরে খেতে গেলে তার মত নিন যে সে কী খেতে চায় বা আজকে বাসায় কী রান্না করা যেতে পারে। কাউকে উপহার দিলে কী দেওয়া যেতে পারে, এ ব্যাপারেও তার মত নিন। এতে শিশু সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বাজেট করে চলা দুটিই শিখে যাবে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কাজের ধরন বদলে যাবে। টিনএজ বয়সের ছেলে-মেয়ে সবাইকেই নিজের ঘর নিজেই পরিষ্কার করা, সাধারণ কিছু রান্না, টুকটাক বাজার করা, ব্যাংকে বিল দেওয়া—এ ধরনের কাজে অভ্যস্ত করা ভালো।

 

মাথায় রাখুন

নতুন যেকোনো কাজ শুরুর দিকে ভুল হবেই। হয়তো একই কাজ বারবার দেখিয়ে দেওয়ার পরও ভুল হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোনো অবস্থায়ই রেগে যাবেন না কিংবা বকা দেবেন না। বকাঝকা করলে বা বিরক্তি প্রকাশ করলে শিশু কাজের প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। নিজের প্রতি অনাস্থা ও হীনম্মন্যতা তৈরি হতে পারে। শিশুর মনে হতে পারে যে তাকে দিয়ে কিছু হবে না। যা শিশুমনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বরং ধৈর্য নিয়ে শিশুর পাশে থেকে তাকে সহযোগিতা করুন। অভিভাবক নেতিবাচক মন্তব্য না করলেও বারবার অসফলতায় শিশুর মধ্যে হতাশা আসতে পারে। তখন তার পাশে বন্ধুর মতো থাকুন, তাকে আগের সফলতার কথা মনে করিয়ে দিন এবং পূর্ণোদ্যমে নতুন করে চেষ্টা করতে উৎসাহিত করুন। সব সময় বিজয়ী হওয়ার জন্য চাপ না দিয়ে দক্ষতা অর্জনে উৎসাহিত করুন। বারবার অনুশীলনে উৎসাহিত করুন। আবার অনেক অভিভাবক ভাবেন, যতক্ষণে শিশুকে শেখাবেন ততক্ষণে নিজেই কাজটি করে ফেলতে পারবেন। এটা খুব বড় ভুল। ভবিষ্যতের আত্মবিশ্বাসী, কর্মঠ সন্তানের জন্য এটুকু সময় প্রত্যেক অভিভাবককে দিতেই হবে। সময় নিয়ে যতবার প্রয়োজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সন্তানকে শেখাতে হবে। শিশুর কৌতূহলে ভাটা না দিয়ে যেকোনো নতুন বিষয়ে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে উৎসাহ দিন। অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দিন তাকে। কাজ যত ছোটই হোক, তার জন্য প্রশংসা করুন। দিনে কয়েকবার তাকে জানান, তার কাজগুলো পরিবারের সবাইকে অনেক সাহায্য করছে। তাকে নিয়ে পরিবারের সবাই গর্বিত। তবে এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। শিশুকে শেখাতে গিয়ে কখনোই অন্য কারো সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। অমুক এই কাজ করছে, তুমি কেন পারছ না—এ ধরনের কথা শিশুর বিকাশে ভয়ংকর প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে আমার সন্তান সব পারে, অন্যরা কিছুই পারে না—এমন ধারণাও শিশুকে অহংকারী করে তুলতে পারে। তাই কোনো অবস্থায়ই তুলনা করা যাবে না। শিশুর কাছে মা-বাবাই তার আদর্শ। তাই শিশুকে স্বনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে নিজেকে সেভাবে শিশুর সামনে উপস্থাপন করুন। শিশুর যেকোনো শিক্ষার ভিত তৈরি হয় শৈশব থেকে। প্রস্তুতির শুরুতে খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনো বিষয়ে শেখাতে গিয়ে তাদের শৈশবের অনাবিল আনন্দ বা সুন্দর শিশুকাল যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়। মা-বাবাকে খেয়াল রাখতে হবে, এই শেখার মধ্যেই যেন শিশু আনন্দ খুঁজে পায়।


মন্তব্য