kalerkantho


অন্য কোনোখানে

মুক্তিসেনারা ঘুমিয়ে আছেন এখানে

সুমন্ত গুপ্ত

২৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মুক্তিসেনারা ঘুমিয়ে আছেন এখানে

স্থপতি রাজন দাশ সিলেটের জনপ্রিয় এক নাম। স্যারের বেশ কিছু স্থাপত্যকর্ম অনেক প্রশংসা অর্জন করেছে। অনেক দিন ধরে প্ল্যান করছি স্যারকে নিয়ে বের হবো তাঁর স্থাপত্যকর্মগুলো দেখতে। কিন্তু স্যার সব সময় ব্যস্ত থাকায় ব্যাটে-বলে মিলছিল না। তার পরও আশা ছাড়িনি। অবশেষে একদিন বিকেলে স্যারের কাছ থেকেই এলো ফোনটা। ঠিক হলো দিনক্ষণ। পরের দিন সকাল সকাল বের হচ্ছি। বন্ধের দিনে এত্ত সকালে ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছা করে না। তার পরও মায়ের তাড়ায় দ্রুত তৈরি হয়ে নিলাম। রাজন স্যারকে তাঁর বাসা থেকে তুলে নিয়ে শুরু হলো আমাদের যাত্রা। যাচ্ছি সুনামগঞ্জ জেলার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে ভারত সীমান্ত লাগোয়া ধর্মপাশা উপজেলার মহিষখোলা গ্রামে। সেখানে ঘুমিয়ে আছেন একাত্তরের বীর শহীদেরা। তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশে তৈরি করা হয়েছে ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ নামের চমৎকার এক স্মৃতিসৌধ।

স্নিগ্ধ সকাল। জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছি। মহাসড়কে সূর্যদেবের আভা পড়েছে তির্যকভাবে। পেটে দানাপানি দিতে যাত্রাবিরতি দিলাম পাগলা বাজারে। কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা ঢুকে পড়লাম দয়াল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে। ওখানকার গরম গরম পরোটা আর ভাজি এককথায় অমৃত। পেটে ক্ষুধা থাকায় সেসব শেষ হতে খুব একটা সময়ও লাগল না। পেট-পূজা শেষ করে আবার শুরু হলো আমাদের যাত্রা। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পৌঁছলাম সুনামগঞ্জ শহরে। এখান থেকে যেতে হবে তাহিরপুর। গ্রামীণ পথে চলার মজাই আলাদা। দুই পাশে ধানক্ষেত। সেসবের মাঝ দিয়ে সোজা এগিয়ে চলেছি। সুনামগঞ্জ থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে এসে পৌঁছলাম তাহিরপুর বাজারে। একটু অধৈর্য হয়ে রাজন স্যারকে বলেই বসলাম, ‘আর কতক্ষণ?’ স্যার বললেন, ‘এবার টাঙ্গুয়ার হাওয়ার হয়ে যেতে হবে। সময় লাগবে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা।’

বর্ষা ছাড়াও এই মৌসুমেও হাওয়ারের একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। সেটা দেখার জন্য স্পিডবোটের বদলে শ্যালো ইঞ্জিনের নৌকা করেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। টাঙ্গুয়ার ঢেউয়ের তালে তালে এগিয়ে চলছি। যেতে যেতে জলকেন্দ্রিক মানুষের জীবনধারার কিছু নমুনা আমাদের চোখে পড়ে। সেসব ধারণ করার জন্য ইচ্ছামতো ছবি তুলতে লাগলাম। দেখতে দেখতে কিভাবে যে আড়াই ঘণ্টা পেরিয়ে গেল টেরই পেলাম না। আমাদের নৌযানটি এসে ভিড়ল ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর গ্রামে। সেখানে অপেক্ষা করছিল রাজন স্যারের সহচর সোহাগ আর মুনিম। মোটরবাইকে চেপে বসলাম। এখান থেকে মহিষখোলা গ্রামের পথ ১০ মিনিটের। মোটামুটি সেই সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমাদের সেই গন্তব্যে, মহিষখোলা গ্রামে। চারদিকে শান্ত নীরব পরিবেশ। গ্রামের পশ্চিমে গা ঘেঁষে মহিষখোলা নদী, উত্তরে ২০০ গজের মধ্যেই ভারত সীমান্তে মেঘালয়ের পর্বতমালা, পূর্বে সংখ্যাতীত খাল-বিল আর সুবিশাল টাঙ্গুয়ার হাওর। এ হাওরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি নদী যাদুকাটা। শ্রীচৈতন্যের অন্যতম অনুগামী অদ্বৈতাচার্য এই নদীপারেরই সন্তান ছিলেন।

মহিষখোলা নদীর পূর্বপার ঘেঁষে প্রায় নিশ্চিহ্ন একটি টিনের ঘর চোখে পড়ল। এই ঘরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে বিশ্রাম নিতেন; এমনকি পাকিস্তানি হানাদারদের ধরে এখানে বন্দি করে রাখা হতো। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের এক ভয়াল সংঘর্ষ হয়। অনেক যোদ্ধা মারা যান। মহিষখোলা নদীর পারঘেঁষা এই বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায় তখনই। আর শহীদ যোদ্ধাদের গণকবর রচিত হয় এরই আশপাশে।

ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম স্মৃতিসৌধের চারপাশ। এই স্মৃতিসৌধের পূর্ব-পশ্চিম দিকে সমান্তরাল দুটি সুউচ্চ দেয়াল ৯ ফুট বেদির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পূর্বদিকে তাকালেই চোখ চলে যায় নদীর পারে। সৌধের উত্তর-দক্ষিণের ২৭ ফুট উঁচু দেয়ালে অনেকগুলো ছোট-বড় জানালা খোলা দেখতে পেলাম। জানালাগুলো দেখে এই সমাধিক্ষেত্রের মূল ভাবনাটা ধরা যায়। ১৮ হাজার ৭০০ বর্গফুট জায়গার ওপর নির্মিত হয়েছে এই স্মৃতিসৌধ। খরচ হয়েছে দেড় কোটি টাকা।

পুবালী বাতাস বইছে। অসাধারণ পরিবেশ। এক ফাঁকে রাজন স্যারের কাছে জানতে চাইলাম, ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ এর স্থাপত্য ভাবনার কথা। স্যার বললেন, “এখানেই শুয়ে আছেন একাত্তরের শহীদ হওয়া বীর প্রাণ। যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে প্রাণ দিয়ে গেছেন তাঁরা কেন বদ্ধ ঘরে থাকবেন? তাঁরা যেন জীবনের ওপার থেকে স্বাধীন দেশটাকে দেখে যেতে পারেন সেই ভাবনা থেকেই এই ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’। বিষয়টাকে অনেকটা প্রতীকীই বলতে পারো।”

আশপাশ থেকে অনেকেই এসেছেন এই দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধ দেখতে। এই স্মৃতিসৌধের স্থপতিকে কাছে পেয়ে সবাই খুব খুশি। কেউ কেউ আবার স্যারের কাছে আবদার করে বসলেন ছবি তোলার জন্য। স্যারও তাঁদের নিরাশ করলেন না।

স্মৃতিসৌধ দর্শন শেষে তাহিরপুর বাজারের উদ্দেশে রওনা হলাম। ওখানকার হোটেলগুলোতে নাকি টাঙ্গুয়ার হাওরের টাটকা মাছ পাওয়া যায়। এ জন্য আবার আমাদের টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ি দিতে হলো। হাওরের শীতল হাওয়া খেতে খেতে পৌঁছে গেলাম তাহিরপুর বাজারে। ঢুকে পড়লাম এক হোটেলে। আমাদের পরিবেশন করা হলো রানি মাছ, টেংরা মাছ, পুঁটি মাছ, মলা মাছসহ নাম না জানা বেশ কিছু মাছ। প্রতিটি মাছের স্বাদ অসাধারণ। টাটকা বলে কথা। খাবারে বাটা মসলা ব্যবহার করায় স্বাদ যেন আরো বেড়েছে। আহার পর্বের সমাপ্তি টানলাম দুধের সর দিয়ে। এককথায় অসাধারণ। এদিকে সূর্যদেবের বাড়ি ফেরার সময়ও চলে এসেছে। আমরাও ফিরতি পথ ধরলাম।

ছবি : লেখক

 



মন্তব্য