kalerkantho


ঘুরতে যাওয়ার আগে

ভ্রমণটাকে আনন্দময় করে তুলতে আগে থেকেই কিছু প্রস্তুতি চাই, যাতে বাইরে গিয়ে সমস্যায় পড়তে না হয়। দেশের ভেতর ভ্রমণে দরকারি জিনিসগুলো নিয়েই এবারের প্রতিবেদন। লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ঘুরতে যাওয়ার আগে

গন্তব্য কোথায়

 

প্রথমেই ঠিক করতে হবে গন্তব্য কোথায়। ঋতুটা মাথায় রেখে ভাবুন, এই সময়টায় ভ্রমণের জন্য কোন জায়গাগুলো উপযোগী। কত দিনের জন্য বেড়াতে যাবেন, বাজেট কেমন; সাগর, পাহাড়, বন, হাওর কিংবা নদী—ঠিক কোন জায়গায় কাদের নিয়ে যাবেন, যেখানে যাবেন সেখানকার সুযোগ-সুবিধা কেমন, কোন মাধ্যমে যাবেন—এসব বিষয় মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজান।

ব্যাগ গোছানোর পালা

তিন-চার দিনের ভ্রমণে প্রতিদিনের জন্য আলাদা কাপড় নেওয়া ভালো। তাই বড় ব্যাগ সঙ্গে নিতে হবে। অনেকেই ঘুরতে গিয়ে কেনাকাটা করেন। এ জন্য ছোট এক বা একাধিক ব্যাগ ভাঁজ করে বড় ব্যাগে ঢুকিয়ে নিতে পারেন। কোথায় বেড়াতে যাচ্ছেন, সেখানে কত দিন থাকবেন, তার ওপর নির্ভর করবে ব্যাগে কী কী নেবেন। ইন্টেলিজেন্ট ট্যুরিস্ট এইড বা আইটিএয়ের সভাপতি সাফওয়ান মাহমুদ বলেন, ‘যেখানেই যান না কেন, ব্যাগভর্তি জিনিস না নিয়ে একান্তই দরকারি জিনিসগুলো নেওয়াই উত্তম। তাই কী কী লাগতে পারে, তার একটা তালিকা করুন। তালিকা ধরে একেকটা জিনিস ব্যাগে ভরুন। অপ্রয়োজনীয় জিনিস নেবেন না।’ পরিধেয় কাপড়গুলো গুছিয়ে নিন। সঙ্গে রাখতে পারেন গামছা বা তোয়ালে, লোশন, ক্রিম, বডি স্প্রে, টুথব্রাশ,  পেস্ট, শ্যাম্পু, ছোট আয়না, চিরুনি, লিপজেল, ক্যাপ বা হ্যাট, ছোট্ট ছাতা, রুমাল, ওয়েট টিস্যু ইত্যাদি। যাঁরা নিয়মিত সেভ করেন, তাঁরা রেজর-ফোম—এসব নিতে ভুলবেন না। প্রয়োজনীয় জামাকাপড়, জুতা, কসমেটিকস আলাদা করে প্যাক করুন। এতে স্থানসংকুলান হবে, আবার জিনিসপত্রও এলোমেলো হবে না। সহজে বহন করা যায় বলে ভ্রমণে চাকাযুক্ত ব্যাগ ব্যবহার করা ভালো। একটি কাগজে নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর লিখে ব্যাগের ভেতর সেঁটে রাখুন। সব সময় নিজের সঙ্গে যে ব্যাগ থাকবে, সেখানে ছোটখাটো দরকারি জিনিস রাখুন। ঝামেলা কমে যাবে। ইয়ারফোন বা এমপিথ্রি ভ্রমণের সময় নিয়ে যেতে পারেন। গানে গানে পথ চললে ভ্রমণ আরো উপভোগ্য হবে। সঙ্গে দু-একটা বইও নিন। কয়েক শ পৃষ্ঠার উপন্যাস নয়, হালকা ম্যাগাজিন বা তিন গোয়েন্দা টাইপের কিছু হলে ভালো। এ ছাড়া ডায়েরি ও কলম নিতে পারেন। জরুরি তথ্য পেলে টুকে রাখা যাবে।

 

যেমন পোশাক

বাইরে গেলে বাতাস, ধুলা আর রোদ থেকে ত্বকে নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে। এসব সরাসরি ত্বকে লাগতে না দেওয়াই উত্তম। সে জন্য ঢিলেঢালা শরীর ঢাকা পোশাক পরা ভালো বলে জানালেন ডিজাইনার লিপি খন্দকার। তিনি আরো জানালেন, তাপনিরোধক, দ্রুত পানি শুকিয়ে যায় এমন পোশাক বেছে নেওয়া ভালো। ভ্রমণের স্থান, পরিবেশ ও সংস্কৃতির বিষয়টিও বিবেচনা রেখে আবহাওয়া উপযোগী পোশাক পরার পরামর্শ দিলেন তিনি। খুব ভোরে বের হলে মাথার টুপি, হাত ও পায়ের মোজা নিতে পারেন। ঝলমলে রঙিন পোশাকে ছবি ভালো আসে বলে জানালেন আলোকচিত্রী তানভীর রোহান। তবে প্রচুর হাঁটতে হতে পারে এমন ট্যুরে সাদা রঙের পোশাক পরা ভালো। যদি নদী, ঝরনা বা সাগরে যান, তাহলে গোসলের জন্য বাড়তি পোশাক নেবেন। পাহাড়, সমুদ্র কিংবা হাওরে গেলে বাইনোকুলার সঙ্গে রাখতে পারেন।

 

জুতা জোড়া

জুতা একেবারে নতুন কিংবা শক্ত হলে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাচলায় সমস্যা হতে পারে। কিংবা হাঁটলেও পায়ে ফোসকা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এ ধরনের জুতাও এড়িয়ে চলুন। জুতাটা যেন নরম ও আরামদায়ক হয়। ছেলেদের জন্য কেডস ভালো। মেয়েরা হিল জুতার বদলে কনভার্স পরতে পারেন। স্যান্ডেল-জুতা পলিথিন বা কাগজে মুড়িয়ে লাগেজের একপাশে রাখুন।

 

ত্বকের যত্নে

ভ্রমণে গেলে দিনভর ছোটাছুটিতে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে ত্বক ও চুলের দিকে খুব একটা নজর দেওয়া যায় না। আর রোদে-ধুলায় ত্বক অনেকটা মলিন হয়ে পড়ে। অনেকের র‌্যাশও দেখা দিতে পারে। আবার কারো বা ত্বক বার্ন হয়ে যাওয়ার সমস্যা থাকে। এ জন্য বেড়াতে গেলে সঙ্গে রাখতে হবে ফেসওয়াশ, ময়েশ্চারাইজার, সানস্ক্রিন, ডে-নাইট ক্রিম। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে বাঁচতে পরতে পারেন সানগ্লাস। রূপবিশেষজ্ঞ জুলিয়া আজাদ জানালেন, ঘুরতে গেলে রোদটা যেন ত্বকে সরাসরি না পড়ে, সে ক্ষেত্রে ছাতা বা হ্যাট রাখতে পারেন। রোদে বের হওয়ার মিনিট ত্রিশেক আগে সানপ্রটেক্ট লোশন কিংবা ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন। ধুলাবালি ও সরাসরি বাতাস থেকে বাঁচতে শরীরের খোলা জায়গায় ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম লাগাতে পারেন। সারা দিন ঘুরে এসে রাতে মুখ পরিষ্কার করে অবশ্যই ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে। পাশাপাশি ভ্রমণের সময় প্রচুর পানি, ডাবের পানি, ফল—এসব খেতে হবে। আবহাওয়া আর পানির পরিবর্তনের ফলে অনেক সময় চুল হয়ে পড়ে রুক্ষ। তাই তেল, শ্যাম্পু আর কন্ডিশনার নিয়ে যাওয়া ভালো।

 

খরচ বাঁচাতে চাইলে

 

একটু কম খরচে ভ্রমণ করতে চাইলে ট্যুরিস্ট রেস্টুরেন্টগুলো এড়িয়ে চলুন। যেখানে বেড়াতে গিয়েছেন, তার আশপাশে ঘুরে স্থানীয়রা যেখানে খাবার খায়, সেখানে খাওয়াদাওয়া সারলে খরচ কমবে। আপনি যদি শিক্ষার্থী হন, তাহলে একদম ভ্রমণ মৌসুমে না গিয়ে একটু আগে বা পরে যান। কারণ, ভ্রমণ মৌসুমে সব কিছুতেই একটু বেশি খরচ হয়। তবে একেবারে অফসিজনেও যাওয়া উচিত নয়।

 

শিশুর বাড়তি যত্ন

 

ভ্রমণের সময় যদি পরিবারের ছোট কারো সমস্যা হয়, তাহলে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়বে। তাই এ সময় সোনামণিদের জন্য চাই একটু বাড়তি যত্ন। রেড সান ডে কেয়ার অ্যান্ড প্রি স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হালিদা পারভীন জানালেন, শিশুদের কখনো গাড়ির সামনের আসনে বসানো ঠিক নয়। তাদের পছন্দের খেলনা যেমন—ব্যাট, বল, গাড়ি, পুতুল নিতে ভুলবেন না। শিশুদের জন্য বাড়তি পোশাক নেবেন। ভ্রমণের সময় ভারী পোশাক পরাবেন না। পাতলা সুতি কাপড় পরাবেন। ওদের পোশাক এমন হওয়া উচিত যেন তারা ছোটাছুটি করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ওদের ডায়াপার নিতে ভুলবেন না। শোভন স্কিন কেয়ার স্টুডিওর স্বত্বাধিকারী শোভন সাহা বললেন, শিশুদের ঘন ঘন বিশুদ্ধ পানি খাওয়াবেন। মাঝেমধ্যে ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দেবেন। ভ্রমণের সময় বাইরের খাবার ও ভারী গুরুপাক খাবার না খাওয়ানোই ভালো। শুকনা ও হালকা খাবার খাওয়াবেন।’ হাওর, সমুদ্র বা যেকোনো জলাশয়ের কাছে ঘুরতে গেলে সব সময় শিশুদের দিকে খেয়াল রাখুন। না হলে আপনার অগোচরেই শিশু দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে।

 

বিয়ন্ড অ্যাডভেঞ্চার অ্যান্ড ট্যুরিজমের সিইও সৈয়দ আখতারুজ্জামান বলেন, ভ্রমণস্থানে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা ভালোভাবে জেনে নিন। এতে কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি আগে দেখতে হবে। অপরিচিত ও দুর্গম এলাকায় অবশ্যই গাইডের সহায়তা নেবেন।

 

অসুখবিসুখের সঙ্গী

ভ্রমণে যাওয়ার সময় দরকারি ওষুধ সঙ্গে নিয়ে নিন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল জানালেন, ভ্রমণে মাথা ব্যথা, এসিডিটি আর ধুলাবালিতে অ্যালার্জি হতে পারে। তাই প্যারাসিটামল, অ্যান্টিহিস্টামিন ও ওমিপ্রাজল গ্রুপের ওষুধ সঙ্গে রাখলে কাজে লাগবে। যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা বা হাঁপানি আছে, তাঁরা সঙ্গে রাখা হাতব্যাগে ইনহেলার ও অন্য যেসব ওষুধ নিয়মিত সেবন করেন, সেগুলো নিতে ভুলবেন না। ভ্রমণে বমিভাব হলে আদা চিবাতে পারেন। যাঁদের বেশি সমস্যা হয়, তাঁরা গাড়িতে ওঠার আধাঘণ্টা আগে ডমপেরিডন, মেক্লিজিন বা মেটাক্লোপ্রামাইড-জাতীয় ওষুধ সেবন করতে পারেন। পাহাড়ি এলাকায় মশার উপদ্রব বেশি। তাই ফুলহাতা জামা ও মোজা ব্যবহার করতে পারেন। রাতে অবশ্যই মশারি ব্যবহার করবেন। প্রয়োজনে আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ম্যালেরিয়া প্রতিরোধক ওষুধ সেবন করে নিতে পারেন। মশা নিধনের স্প্রে বা অ্যারোসল, হাতে-পায়ে মাখার জন্য বিশেষ মশানিবারক ক্রিম সঙ্গে রাখুন। যেখানে থাকবেন, সেখানকার বিছানার চাদর বা বালিশের কভার পরিষ্কারভাবে ধোয়া আছে কি না, তা নিশ্চিত হয়ে নিন। না হলে খোসপাঁচড়া ও দাদের মতো চর্মরোগে আক্রান্ত হতে পারেন। সেই সঙ্গে  খাওয়ার স্যালাইন, ব্যান্ড এইড, অ্যান্টিসেপটিক এবং পরিমাণ মতো তুলা ও গজ নিয়ে নিন। এ ছাড়া পানির বোতল, বিস্কুট কিংবা চিপসের মতো কিছু শুকনা খাবার রেখে দিতে পারেন। খাবার ও পানির পরিবর্তনের কারণে ভ্রমণে অনেকের ডায়রিয়া হতে পারে। তাই খাবার ও পানির ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। আকাশপথে ভ্রমণের সময় অনেকের মাথা ঘোরা, কানে তালা লাগা, বমি বমি ভাব হওয়াসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ থেকে মুক্তি পেতে চুইংগাম চিবানো, ঘন ঘন ঢোক গিলা ও জুস পান করতে পারেন। দীর্ঘ ভ্রমণে একটানা বসে না থেকে একটু হাঁটাচলা করুন। তা সম্ভব না হলে কিছু সময় পর পর হাত-পা নাড়ান।

জেনে রাখা ভালো

কোথায় কোথায় ঘুরবেন, কবে কখন কী করবেন—আগেই খোঁজখবর নিয়ে একটা খসড়া তালিকা তৈরি করুন। ওই এলাকার কোথায় কী পাওয়া যায়, তা-ও জানা থাকলে ভালো। না হলে বিড়ম্বনায় পড়তে পারেন। তাই নিকটস্থ থানা কিংবা ট্যুরিস্ট পুলিশের হেল্প ডেস্ক নম্বর, হাসপাতাল, আবাসিক হোটেল, ফায়ার সার্ভিস, ব্যাংকসহ সেখানকার জরুরি ফোন নম্বর ও লোকেশন সম্পর্কে তথ্য আগে থেকে সংগ্রহ করে রাখুন। এতে সময় বাঁচবে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির হাত থেকেও মুক্তি মিলবে। কখন কোন হোটেলে থাকছেন বা কোথায় ক্যাম্প করছেন, বাড়ির লোক বা কাছের মানুষদের তা জানিয়ে দেবেন। এবং ফোন নম্বরটাও। যে গাড়িতে যাচ্ছেন, তার নম্বরটাও জানিয়ে রাখতে পারেন। জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সঙ্গে নিতে ভুলবেন না। এখন অনেক হোটেলে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ছাড়া রুম ভাড়া দেওয়া হয় না।

 

আরো যা কিছু

রওনা দেওয়ার আগে মোবাইল ফোন ও ক্যামেরার ব্যাটারি ফুল চার্জ করে নিন। চার্জার নেবেন। পাওয়ার ব্যাংক ও ক্যামেরার অতিরিক্ত ব্যাটারি থাকলে ভালো। প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কিছু টাকা সঙ্গে রাখুন। তবে সব টাকা মানিব্যাগে না রেখে কিছু টাকা অন্য কোথাও রাখুন। একটি কার্ডে আপনার ঠিকানা লিখে রাখবেন। ব্যাগ হারিয়ে গেলে কেউ পেয়ে থাকলে ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। মোবাইলে পর্যাপ্ত ব্যালান্স ভরে নেবেন। সব কিছু তো গোছানো শেষ। এবার তাহলে বেরিয়ে পড়ুন মনের আনন্দে।

 

মডেল : পায়েল ও শামীম

ছবি : কাকলী প্রধান

সাজ : শোভন মেকওভার স্কিন স্টুডিও

পোশাক : ইজি, ব্যাগ : ম্যাক্স



মন্তব্য