kalerkantho


অন্য কোনোখানে

শিপচরে এক রাত

মো. জাভেদ হাকিম

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শিপচরে এক রাত

একসঙ্গে দুই দিন ছুটি মানেই আজকাল পথঘাটে যানজট আর বাস-নৌ টার্মিনালগুলো লোকারণ্য। আর হবেই বা না কেন? ঘরমুখো মানুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইদানীং ভ্রমণপাগলের সংখ্যাও যে বেড়েছে, এরা ছুটি পেলেই দেয় ছুট। আমাদের ভ্রমণসংঘ ‘দে ছুট’ও এ ধরনের সুযোগ নষ্ট করে না। এবারের বিজয় দিবসের ছুটিতে বেছে নেওয়া হয়েছে প্রমত্তা মেঘনা নদীর মোহনায় জেগে ওঠা এক চর। ভোলার সর্বদক্ষিণে অবস্থিত এই চরের নাম ‘শিপচর’। যা হোক, নানা ঝক্কিঝামেলা শেষে ভোলার বেতুয়াগামী জাহাজে চড়ে বসলাম।

ভোরে চরফ্যাশন উপজেলার বেতুয়ায় পৌঁছলাম। এরপর সেখান থেকে আবার ট্রলারযাত্রা। মাঝে ঢালচরে ছিল জুমার বিরতি। নামাজ শেষে অল্প সময়ের জন্য ছবির মতো সুন্দর গ্রামগুলো ঘুরে দেখি। নদীপাড়ের নারিকেল-খেজুরসহ নানা প্রজাতির গাছগাছালি নজর কেড়ে নেয়। মাথায় করে পাকা ধানের আঁটি নিয়ে কৃষকের বাড়ি ফেরার দৃশ্য আর সবুজে ঘেরা চারপাশ সৃষ্টি করেছে এক ভিন্ন জগত্। ঘোরাঘুরির ফাঁকে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে বেশ আলাপ জমে ওঠে। তাঁরা যখন জানতে পারলেন শিপচরে যাচ্ছি রাত্রি যাপন করতে, তখন নানা ভয়ানক তথ্য শোনাতে লাগলেন। তাঁদের সাবধানবাণীতে আমাদের কয়েকজন ভয়ে কুঁকড়ে উঠল। কিন্তু কিছু করার নেই। কারণ ‘দে-ছুট’-এর সংবিধান মেনেই সঙ্গী হয়েছেন তাঁরা। সুতরাং পিছু হটার সুযোগ নেই। আমাদের দুঃসাহসিক (!) অভিযানের কথা শুনে লোকজনের আনাগোনা বাড়তে থাকল। নানাজনের নানা মত। আমাদের মাঝির ভাবসাবও খুব ভালো ঠেকছিল না। তাঁর ভাষ্য, রাতে ওখানে থাকবেন কেমনে? জোয়ারে চর তলিয়ে যায়। চার্লস নর্ডহফ ও জেমস নরম্যান হলের লেখা সেই বিখ্যাত উপন্যাস ‘বাউন্টিতে বিদ্রোহ’র কথা মনে পড়ল। ট্রলারে বিদ্রোহ (!) দেখা দেওয়ার আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। ক্যাপ্টেন উইলিয়াম ব্লাইয়ের মতো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘বাউন্টি’, থুক্কু ট্রলার ছাড়তে বললাম।

অম্লবদনে ট্রলার ছাড়তে বাধ্য হয় মাঝি। আবার শুরু হলো ভেসে চলা। সাদা বক, পানকৌড়ি, কানিবকসহ নানা পাখির ওড়াউড়ি, ডলফিনের লুকোচুরি, সি-গালের খুনসুটি সঙ্গী করে শুধু ভেসেই চলছি। দুপুরে খাওয়াদাওয়া করার জন্য শপিং হলো নদীতেই। জেলেদের কাছ থেকে কেনা হলো তাজা মাছ। সেই মাছ দিয়ে রান্নাবাড়া চলল ট্রলারেই। রান্না শেষে খাওয়াদাওয়াও হলো সেখানেই।

একটা সময় দৃষ্টির সীমানা থেকে হারিয়ে গেল মানব বসতির চরগুলো। আশপাশে আর কোনো নৌযানও নেই। প্রকৃতির পিনপতন নীরবতা। হঠাত্ চোখে ধরা দেয় একঝাঁক পরিযায়ী। এক প্রায় ডুবন্ত চরে অবাধ বিচরণের নয়ন জুড়ানো দৃশ্য। দেখে মনে হলো, ইংরেজ কবি স্যামুয়েল টেলর কোলরিজের ‘দ্য রাইম অব দি এইনশ্যেন্ট মেরিনার’ কবিতার কয়েকটি লাইনের দৃশ্যয়ান যেন এসব।

ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল পৌনে ৫টা। তেজোদীপ্ত সূর্যটাও লাল আভা ছড়িয়ে অথই নোনা জলে ডুব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্য রকম এক অপার্থিব সুখভাব সবার মাঝে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ট্রলার চলার পর ঠিক সন্ধ্যায় সেই কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের শিপচরের দেখা মেলে। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে সবাই আটখানা। ভাটা থাকায় চর থেকে কিছুটা দূরে মাঝি নোঙর ফেলে। সিঁড়ি বেয়ে একহাঁটু শীতল জল ভেঙে চরে গিয়ে উঠি। চরটির চারদিকেই অথই পানি। শুধু মাঝে একখণ্ড বিস্তীর্ণ স্থলভূমি। দ্বীপ বললেও ভুল হবে না। সেখান থেকে যত দূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। সাগর ভেবে অনেকেই ভুল করবেন। নজরকাড়া সৌন্দর্যের এই চরের আয়তন জানার সুযোগ হয়নি। গুগল ম্যাপেও নেই এই চরের অস্তিত্ব। চরটির নামকরণ সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি, আজ থেকে বহু বছর আগে নাকি বিদেশি এক শিপ বা জাহাজ এখানে আটকা পড়েছিল বা ডুবে গিয়েছিল। সেই থেকেই নাকি এর নাম ‘শিপচর’।

পরের দিন ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। সবার মাঝে অন্য রকম এক অনুভূতি কাজ করছে। যেন আমরাও এই শিপচর জয় করেছি। সেই স্মৃতি ধরে রাখতে চলল ফটোসেশন। ইফতিকে পাঠানো হলো তাঁবু টানানোর জায়গা নির্ধারণ করার জন্য। তাঁবু টানানোর পর্ব শেষ হতেই শুরু হলো রান্না ও বারবিকিউয়ের জন্য দৌড়ঝাঁপ। কেউ বা লাকড়ি জোগাড়ে ব্যস্ত। ক্যাম্পফায়ার চলবে সারা রাত। আজ এই চরে আমরা ছাড়া আর কোনো মানবসন্তানের অস্তিত্ব নেই। চাঁদবিহীন আকাশে তারার মেলা। উপরি পাওনা হিসেবে ছিল উল্কাবৃষ্টি দেখার সুবর্ণ সুযোগ। ভাগ্যও ছিল সুপ্রসন্ন। শীতের তীব্রতা, হিমেল হাওয়া কিংবা কুয়াশা তেমন একটা ছিল না। বেসুরো গলায় গান-বাদ্য আর বারবিকিউ চলল সমান তালে। রাত ১টায় সবাই তাঁবুতে আশ্রয় নিল। অল্প সময়ের মধ্যে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেছি। এমন সময় শোনা গেল আর্তচিত্কার। হন্তদন্ত হয়ে উঠে বসলাম। ঘুমের ঘোরে দুর্জয় চিত্কার দিয়েছে। ভয় পেয়েছে বোধ হয়। ছেলেটা নিজের নামের কোনো সম্মান রাখল না দেখছি। রাত ৩টায় তাঁবু থেকে বের হলাম। চারপাশে নৈঃশব্দ্যরা রাজত্ব করছে। আকাশ পানে তাকিয়ে দেখি, লাখো কোটি তারা আসর জমিয়ে বসেছে। ওদের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার তাঁবুতে আশ্রয় নিই।

শীতের তীব্রতা থেকে রক্ষা পেতে সুদূর সাইবেরিয়াবাসী পাখিদের কিচিরমিচিরে শিপচরে ভোরের আলো ফোটে। দিগন্তে রক্তিম সূর্যোদয়। সূর্যটা দেখে মনে হয়, আস্ত একটা আগুনের কুণ্ডলী যেন জলের বুক চিরে আকাশ ছুঁতে রওনা হয়েছে। সে অন্য রকম শিহরণ জাগানো এক অনুভূতি। আর দিনটা বিজয় দিবসের। চরের বুকে তুলে ধরি লাল-সবুজের পতাকা। দক্ষিণা হাওয়ায় সেটি প্রবল বিক্রমে উড়তে থাকে। গুনগুন করে গেয়ে উঠি—আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...।


কিভাবে যাবেন
ঢাকার সদরঘাট নৌ টার্মিনাল থেকে রাত ৮টা ও ৮টা ৩০ মিনিটে ভোলার বেতুয়ার উদ্দেশে জাহাজ ছেড়ে যায়। ভাড়া ডাবল কেবিন ১৬০০ এবং সিংগল কেবিন ৯০০ টাকা। ডেক ভাড়া ১৫০ টাকা। বেতুয়া থেকে চরফ্যাশন বাজারে যাবেন মোটরবাইক বা অটোতে। সেখান থেকে আবারও যেকোনো বাহনে চড়ে কচ্ছপিয়া ঘাট। ঘাট থেকে রিজার্ভ ট্রলারে শিপচর। ভাড়া চার-পাঁচ হাজার টাকা। এসব ট্রলারে যাত্রী ধারণক্ষমতা ২৫-৩০ জন। আবার বেতুয়া থেকেও সরাসরি ট্রলারে করে শিপচর যাওয়া যায়।

ছবি : লেখক ও উজ্জ্বল ইসলাম



মন্তব্য