kalerkantho


অন্য কোনোখানে

গুড়ের দেশে

ফখরে আলম

২৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



গুড়ের দেশে

খালি ভাঁড় নিয়ে গাছ কাটতে যাচ্ছেন গাছি আবু খায়ের বিশ্বাস

‘জাড়’ (শীত) পড়া শুরু হয়েছে। পৌষের খেজুর গুড়ের খুশবু পেতে যশোর শহরের জিরো পয়েন্ট দড়াটানা থেকে ইজি বাইকে মনোহরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করি। যশোর-মাগুরা মহাসড়ক দিয়ে মাগুরার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। রাস্তার দুই পাশে হলুদ সরিষা আর সবুজ বাঁধাকপি-ফুলকপির ক্ষেত ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ছে না। কুয়াশার চাদর সরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। রাখাল বালক শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য মাফলারে মুখ ঢেকে গরু নিয়ে যাচ্ছে মাঠে। ৯ কিলোমিটার পথ মাড়িয়ে মনোহরপুর বাজারে পৌঁছি। ছোট্ট বাজার। সবজি-আনাজের পাশাপাশি টিভি-ফ্রিজও বিক্রি হয় এ বাজারে। এই বাজারের পশ্চিম পাশ দিয়ে কাঁচা সড়ক চলে গেছে এনায়েতপুর গ্রামে। হেঁটে মনোহরপুর-এনায়েতপুর সড়ক ধরে ৫০০ গজ এগোতেই দেখি, রাস্তার দুই ধারে সারিবদ্ধ গাছ। চারদিকে যত দূর চোখ যায়, শুধুই খেজুরগাছ। প্রাকৃতিকভাবে এসব খেজুরগাছের জন্ম হলেও মনে হবে যেন কোনো নিপুণ শিল্পী গাছগুলো রোপণ করেছেন। রাস্তার দুই ধারের হলুদ সরিষাক্ষেত এক দৃষ্টিনন্দন জমিন সৃষ্টি করেছে। পুব আকাশে খেজুরগাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতে শুরু করেছে সুয্যিমামা। কুয়াশা তখনো প্রকৃতিকে জড়িয়ে ধরে আছে। আর এমন সময়ই কুয়াশা ডিঙিয়ে গাছে উঠে যাচ্ছেন সরুইডাঙ্গা গ্রামের অভিজ্ঞ গাছি আবু খায়ের বিশ্বাস। একের পর এক রসের হাঁড়ি পেড়ে আনছেন। সেসব ঢালছেন রাস্তায় একপাশে রাখা সারিবদ্ধ ভাঁড়ে। খুবই নিপুণ হাতে এই ৬০ বছরের বৃদ্ধ শিকে বাঁকে (বাঁশের তৈরি এক ধরনের লাঠি) ১২টি ভাঁড় ঝুলিয়ে সরিষাক্ষেতের মাঝ দিয়ে বাড়ির পথ ধরেছেন। আমরাও তাঁর পিছু নিই। বাড়ির উঠোনে এসে তিনি বাঁক নামান। শ্বশুরকে দেখে ছুটে আসেন পুত্রবধূ পলি আর শিলা। দুজন মিলে খেজুরের ফাতরায় (খেজুরগাছের উপরি অংশের বাকল। অনেকটা মশারির মতো) রস ছেঁকে তাপালে (টিনের তৈরি এক ধরনের কড়াই) ঢাললেন। এরপর খেজুরপাতা আর শুকনো নাড়া দিয়ে সেই রস জ্বাল দিয়ে একেবারে লাল করা হলো। এরপর সেটি নামিয়ে এনে ঠাণ্ডা করার সময় ক্রমাগত নাড়তে থাকেন গাছির স্ত্রী। একেই বলে ‘বীজ মারা’। এই বীজ মেরেই তৈরি করা হয় পাটালি। আহ! কী অপূর্ব খুশবুময় সেই পাটালির গন্ধ। গন্ধ পেয়েই সম্ভবত ছুটে এলেন কয়েকজন ক্রেতা। তাঁরা ১৫০ টাকা কেজি দরে উঠোন থেকেই পাটালি কিনে নিয়ে গেলেন।

এভাবেই ১২টা বেজে গেল। গাছির স্ত্রী খালি ভাঁড় (খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য গাছে যেটা পাতা হয়) ধুয়ে নাড়া (ধানের বিচলি) দিয়ে পুড়িয়ে দিলেন। এটা না করলে রস নষ্ট হয়ে যায়। নাওয়া-খাওয়া সেরে আবু খায়ের ফের গাছ কাটতে ছুটলেন। এই ব্যস্ততার মধ্যেই কথা হলো তাঁর সঙ্গে। ৪০ বছর ধরে তিনি গাছ কাটছেন। আবু খায়ের বললেন, ‘আমার নিজের ১০ গণ্ডা (৪০টি) গাছের পাশাপাশি আরো ৪০টি গাছ ভাগে নিয়েছি। পালায় পালায় (চার দিন অতিক্রম হলে হয় এক পালা) প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি গাছ কাটি। রসও বিক্রি করি। পাটালিও বিক্রি করি।’

খেজুরের রসের জন্য গাছ কাটছেন গাছি
গাছির গাছ কাটা দেখতে মেঠোপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে এনায়েতপুর এসে পৌঁছি। এ গ্রামের ইউপি সদস্য ইনছার আলী। তাঁদেরও ১০০টির মতো খেজুরগাছ রয়েছে। তিনি বললেন, ‘মনোহরপুর থেকে সরুইডাঙ্গা, জগিপাড়া, কাশিমপুর, মনোহরপুর, এনায়েতপুর—এই তিন কিলোমিটার মেঠোপথের দুই পাশে হাজারেরও বেশি খেজুরগাছ আছে। শীত মৌসুমে এই খেজুরগাছ নিয়ে এলাকায় উত্সব শুরু হয়।’ 

ইনছার আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পিঠা বানানোর উত্সব শুরু হয়েছে। ভাপা পিঠা, রস পিঠা, পাকান পিঠার ঘ্রাণে ম ম করছে চারপাশ। হেঁটে এ গ্রামের সবচেয়ে বড় গাছি আকবর বিশ্বাসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর স্ত্রী সুফিয়া বেগম তাপালে রস জ্বাল দিয়ে ভাঁড়ে ভরছেন। তৈরি করছেন বিখ্যাত নলেন পাটালি। দুপুর গড়িয়ে গেছে। আকবর একটি ধামায় সুনিপুণ হাতে পাটালি সাজিয়ে বিক্রির জন্য যশোর শহরের দিকে রওনা দিলেন। আকবর প্রতিদিন ৫০টির মতো গাছ কাটেন। আধা মণ পাটালি গুড় তৈরি করেন।

খেজুরের রস আর গুড়ের দৃশ্য দেখে যশোরের ঐতিহ্যবাহী খেজুরের গুড়ের স্মৃতি হাতড়ানো শুরু করি। কোনো এক বইয়ে যেন পড়েছিলাম, ১৯০০-১৯০১ সালে পূর্ববঙ্গে মোট ২১ লাখ ৮০ হাজার ৫৫০ মণ খেজুরের গুড় তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে শুধু যশোরেই তৈরি হয় ১৭ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ মণ গুড়। ১৮৬১ সালে প্রথম চৌগাছার তাহিরপুরে মিস্টার নিউ হাউস একটি খেজুরের গুড় তৈরির যান্ত্রিক কারখানা গড়ে তোলে। এখানকার উত্পাদিত গুড় ইউরোপেও রপ্তানি হতো। পরবর্তী সময়ে যশোরে আরো ১১৭টি গুড় তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পর সাদা চিনির কাছে লালচে গুড় পরাজিত হয়। কিন্তু সেই ১৯০০ সাল থেকেই কলকাতার বিখ্যাত মিষ্টির দোকান ভীমনাগে যশোরের নলেন গুড় দিয়েই সন্দেশ তৈরি হচ্ছে। এখন যশোর থেকে নলেন গুড়ের সন্দেশ কলকাতায় গিয়ে ভোজন রসিকদের মন জয় করেছে।

বাড়ি ফেরার পথে সন্ধ্যায় দেখি, একজন গাছি গাছ কাটছেন। নির্জন রাস্তা, কোনো সাড়া-শব্দ নেই। গ্রামের রাজমিস্ত্রি টুটুল বললেন, “গাছি আরজান হচ্ছে ‘জেন’ (জিন)। ওর কোনো ভয়-ডর নেই। ও দিনেও গাছ কাটে, রাতেও গাছ কাটে। গুড় পাটালি বানিয়ে বিক্রি করে ও সংসারের অভাব দূর করেছে।’           


কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাসে ৬০০-১১০০ টাকা ভাড়ায় যশোর। যশোর শহর থেকে ১০০ টাকায় ইজি বাইকে মনোহরপুর। 

ছবি : ফিরোজ গাজী



মন্তব্য