kalerkantho


বুনন উৎসব

চেনা তাঁতের নতুন চেহারা

সময় পরিক্রমায় পাওয়ার লুমের আধিপত্য বেড়েছে। যার প্রভাবে বিবর্ণ হয়েছে হ্যান্ডলুম (হাতে বোনা তাঁত) শিল্প। কয়েক বছর ধরে এর পুনর্জাগরণের কাজ করছেন ডিজাইনার আর উদ্যোক্তারা। এর আলোকেই দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বুনন উৎসব। এই উৎসবের আদ্যোপান্ত নিয়ে লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

১৩ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



চেনা তাঁতের নতুন চেহারা

মডেল : জেসমিন মৌসুমী, ছবি : কাকলী প্রধান, পোশাক : টুটলী রহমান, সাজ : জারা বিউটি লাউঞ্জ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চোরাই ধন’ গল্পের নায়িকা সুনেত্রা। ভালোবাসতো কালো পাড়ের সাদা জমিনের শাড়ি। বলত, ‘দিশি তাঁতির হাত, দিশি তাঁঁতির তাঁত, এই আমার আদরের। ’ একসময়ের আদরণীয় দেশি তাঁত অনেকটা বিলুপ্তির পথে। সেই তাঁত এবং তাঁতিদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন এসময়কার ডিজাইনাররা। বৈচিত্র্যময়রূপে তাঁত, মসলিন, সিল্ক, চেক, জামদানি, বেনারসি ও খাদি কাপড়কে তুলে ধরার নিত্যনতুন চেষ্টা তাঁদের। ‘আন্তর্জাতিক বুনন উৎসব ২০১৭’-কে সামনে রেখে উৎসবে অংশনেওয়া ডিজাইনারা আলাদা আলাদা থিম ও মোটিফ নিয়ে কাজ করেছেন।

ডিজাইনার টুটলী রহমান

উৎসবের ডিজাইনারদের ভাবনা

চট্টগ্রামের ফারজানা মালিক’স ক্লথিংয়ের ডিজাইনার ফারজানা মালিক কাজ করেছেন খাদিকে কিভাবে আধুনিকরূপে উপস্থাপন করা যায় । তিনি বলেন, ‘মিলের কাপড়ের তুলনায় খাদি কাপড় তৈরিতে এনার্জি খরচ কম। এটা বেশ আরামদায়ক, ত্বকের জন্যও ভালো। খাদি পোশাক সময় উপযোগী করেছি কাট প্যার্টানে নতুনত্ব দিয়ে।

শাড়ি, লং কামিজ, টপে ফ্লোরাল মোটিফের ব্যবহার থাকছে। শাড়িতে বৈচিত্র্য দিয়েছি ব্লাউজে লং কাট দিয়ে। কয়েক ধরনের প্রিন্সেস কাটসহ নানা কাটের ব্লাউজের ডিজাইন করেছি। রং হিসেবে সাদা-কালোর প্রাধান্য। এর সঙ্গে হালকা হলুদ, লালের ব্যবহার।

টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের সত্বাধিকারী ও ডিজাইনার মুনিরা এমদাদ কাজ করেছেন জামদানি শাড়ি নিয়ে। তিনি বললেন, ‘শাড়িতে তাঁতিদের মূল নকশাই থাকছে। শুধু রং নিয়ে নিরীক্ষা করেছি। শাড়িকে পার্টি উপযোগী করেছি সোনালি রং ব্যবহারের মাধ্যমে। কোনো শাড়িতে পাড়ে, কোনোটায় আঁচলে, কোনোটায় আবার জমিনের ফুল কিংবা মিনারে সোনালি রং আছে। ’

জামদানি আর বেনারসি কাপড়ে গাউন, কামিজ, সারারা, ক্রেপ বানিয়েছেন জেড অ্যান্ড জেড কালেকশনের ডিজাইনার মেহজাবিন মোস্তাফিজ সিমিলি। তিনি বললেন, ‘জামদানি-বেনারসির কথা বললে এত দিন শুধু শাড়ির কথাই মনে পড়ত। এবার এসব কাপড় দিয়ে পার্টিতে পরার উপযোগী ফিউশনধর্মী পোশাক বানিয়েছি। রংয়েরও বৈচিত্র্য রয়েছে। ’

রাজশাহী সিল্ক দিয়ে পশ্চিমা পোশাক বানাচ্ছেন ক্যাটস আই এর ডিজাইনার রুম্মাইলা সিদ্দিকী। তিনি বললেন, ‘রাজশাহী সিল্ক দিয়ে এত দিন সাধারণত পাঞ্জাবিই হতো। এখনকার তরুণদের কথা মাথায় রেখে এবার শেরওয়ানি, প্রিন্সকোট, জ্যাকেট করছি। রেগুলার ফিট পোশাকে নীল এবং সোনালি এই দুটো রঙের প্রাধান্য থাকবে। ’

জে এস ফ্যাশন বাই ঝুনুর ডিজাইনার জাহানারা রহমান ঝুনু ডিজাইন করেছেন বিয়ে এবং পার্টিতে পরার উপযোগী পোশাক। তিনি বললেন,‘ মসলিন,র’চেক আর জামদানি নিয়ে কাজ করেছি। শাড়ির পাশাপাশি পোশাকের তালিকায় লং কামিজ,গাউন আর বিয়ের লেহেঙ্গা থাকছে। পোশাকের নকশায় রেখেছি সম্পূর্ন দেশীয় হাতের কাজ। যার মধ্যে আছে জারদৌসি,মিরর ওয়ার্ক ও সুতার কাজ। ’

 

আন্তর্জাতিক বুনন উৎসব-২০১৭

ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াসে আবারও শুরু হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক বুনন উৎসব-২০১৭’। আগামী ১৭ নভেম্বর রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে এ উৎসব। এবারের প্রতিপাদ্য, ‘দেশি কিনুন, দেশি পরুন। ’

তাঁতশিল্পের প্রসারে অবদান রাখার জন্য দুজন গুণীকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হবে। তাঁরা হলেন শাহীদ হোসাইন শামীম ও মালেকা খান। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে তাঁতশিল্প নিয়ে কাজ করার জন্য নারায়ণগঞ্জের আবুল কাশেম, ইমান আলী ও মো. ফজলুল নামে তিনজন তাঁতিও পাবেন আজীবন সম্মাননা পুরস্কার। সহজ ডটকমের মাধ্যমে নিবন্ধন করে যেকেউ উৎসবে যোগ দিতে পারবেন। উৎসব চলবে বিকেল ৪টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত।

 

অংশগ্রহণকারী ডিজাইনাররা

এবার দেশি-বিদেশি মোট ১৭ জন ডিজাইনার অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের ১২ জন। তাঁরা হলেন মুনিরা এমদাদ, টুটলী রহমান, রুম্মাইলা সিদ্দিকী, তেনজিং চাকমা, মেহজাবিন মোস্তাফিজ সিমিলি, নাহিদ, নাজমি, সোনিয়া পান্নি, জাহানারা রহমান ঝুনু, ফারজানা মালিক, শাহার রহমান, সারা করিম। এ ছাড়া  ভারত, পাকিস্থান, ভুটান, দক্ষিণ কোরিয়া ও পর্তুগাল থেকে একজন করে ডিজাইনার ও তাদের প্রতিনিধিরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক নিয়ে হাজির হবেন।

ডিজাইনার : ফারজানা মালিক, ছবি : মিনহাজুল হৃদয়, মডেল : নওশীন ও অমিত

সাহিত্য আর ফ্যাশনের মেলবন্ধন

বরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা উপন্যাসের লাবণ্য স্নিগ্ধতার প্রতিচ্ছবি হয়ে আজও পাঠকের মন জুড়ে। তেমনি একই উপন্যাসের কেটি চরিত্র। কিংবা ‘চোখের বালি’র আশালতা। কেমন হবে যদি লাবণ্য, কেটি কিংবা আশালতার সাজ পোশাকে মডেলদের দেখা যায় উৎসবের মঞ্চে। শুধু লাবণ্য, কেটি কিংবা আশালতা নয়, নৌকাডুবির কমলা, নষ্ট নীড়ের চারুলতা, নৃত্যনাট্য শ্যামার শ্যামা, ভগ্নহৃদয়ের চপলাসহ রবিঠাকুরের সৃষ্টি করা কালজয়ী মোট ১২ নারী চরিত্রকে সেকালের সাজ পোশাকে উপস্থাপন করবেন ডিজাইনার টুটলী রহমান। বুনন উৎসবে ‘রবি অনুরাগী’ শিরোনামে ফ্যাশন ড্রামায় মডেলদের দেখা যাবে এই কালজয়ী নারীদের সাজ-পোশাকে। টুটলী রহমান বলেন, কবিগুরু তাঁর রচনায় নারী চরিত্রগুলোকে শোভিত করেছেন স্বমহিমায়। তাঁর সময়কার সেই ফ্যাশন স্টাইল একালের নারীদের কাছেও অনুকরনীয়। এ কারণেই চরিত্রগুলো জীবন্ত করে তোলার প্রয়াস। ’ তিনি আরো জানালেন, তখনকার নারীরা শাড়িই পরতেন। তাঁত, জামদানি কিংবা বেনারসি শাড়ি ছিল জনপ্রিয়। বেশির ভাগ শাড়িই এক প্যাঁচে কিংবা সামনে আচল এনে ব্ররুস দিয়ে আটকে রাখা। শাড়িতে নকশার বাহুল্য নেই। বেশির ভাগই ছিলো বুননের নকশা। জমিনের চেয়ে পাড় ও আঁচলের হালকা কাজই প্রধান্য পেতো। বেশিরভাগ জামদানি শাড়ি ছিলো অফহোয়াইট জমিন আর পাড়-আচলে রঙিন সুতার  নকশা। নকশা অনুযায়ী বিভিন্ন জামদানি বিভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন পান্না হাজার, দুবলি জাল, বুটিদার, তেরছা, জালার, চারকোণা, ময়ূর প্যাঁচ, কলমিলতা, পুঁইলতা, কাটিহার, কলকা পাড়, আঙুরলতা, সন্দেশ পাড়, প্রজাপতি পাড়, দুর্বা পাড়, শাপলাফুল, বাঘনলি, জুঁইবুটি, চন্দ্রহার, হংস, ঝুমকা ইত্যাদি । আর বেনারসি শাড়ি মানেই জরি পাড়। দু-একটায় চুমকির ব্যবহার আছে। স্কার্ট পাড় কিংবা গঙ্গাযমুনা পাড় ছিলো বেনারসি শাড়ির বৈশিষ্ঠ্য। গয়না বলতে সোনা রুপা দুটোই পরতো তখনকার নারীরা। এর মধ্যে হাঁসুলি, পুষ্পহার, কানবালা, ঝুমকা, চুড়ি, সীতাপাটি, সীতাহার, গোলাপ বালা, মাকড়ি, কানপাশা ইত্যাদি বেশ জনপ্রিয় ছিল। শাড়ির আঁচলে ছিলো রুপার চাবির গোছা, হাতভর্তি সোনার চুড়ি, নাকে বড় নথ, পায়ে নূপুর, উঁচু খোঁপায় রুপার নকশি কাঁটা।   উৎসব উপলক্ষে সেভাবেই শাড়ি এবং গয়নাগুলো তৈরি করেছি। রবীন্দ্র সাহিত্যের নারীরা দেশি কাপড় আর দেশি গয়নাতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত। তাই আমি চেয়েছি, সাহিত্যের সঙ্গে ফ্যাশনের একটা মেলবন্ধন ঘটাতে। ’

ডিজাইনার মুনিরা এমদাদ


ডিজাইনার মেহজাবিন মোস্তাফিজ সিমিলি

 

হেরিটেজ ভিলেজ করার লক্ষ্যে কাজ করছি

টুটলী রহমান

ফ্যাশন ডিজাইনার ও উৎসবের উদ্যোক্তা

যন্ত্রচালিত তাঁতের সঙ্গে টিকতে না পেরে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁতশিল্প। যে কয়জন এ শিল্পকে আঁকড়ে ধরে আছেন, তাঁদের লড়তে হচ্ছে উচ্চমূল্যের কাঁচামালসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে। পরিচর্যা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেকে এই পেশা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কাজ করা তাঁতিদের প্রণোদনা দেওয়ার মাধ্যমে এখনো তাঁতশিল্পের বিকাশের সুযোগ রয়েছে। যে কয়েকটি জিনিস বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বাংলাদেশকে পরিচিত করেছে, তাঁতশিল্প তার মধ্যে অন্যতম। এই উৎসব বাংলাদেশের তাঁতশিল্প ও এর সঙ্গে জড়িত শিল্পীদের বিশ্বের দরবারে নতুন করে তুলে ধরবে। সারা দেশের তাঁতিদের একটা প্ল্যাটফর্মের মধ্যে আনার চেষ্টা করছি। দেশীয় কাপড়কে চলতি সময়ের উপযোগী করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটা উদ্যোগ। আমাদের বিশ্বাস, ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি আবার নতুন করে জেগে উঠবে। আরো অনেকে এগিয়ে আসবেন তাঁতশিল্প নিয়ে কাজ করতে। একটা হেরিটেজ ভিলেজ করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি আমরা।


মন্তব্য