kalerkantho


অন্য কোনোখানে

ভুবন ভোলানো ভুবনেশ্বর

ফখরে আলম   

১৩ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ভুবন ভোলানো ভুবনেশ্বর

খণ্ডগিরি পাহাড় থেকে পুরো ‘উদয়গিরি’ গুহা দেখা যাচ্ছে

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পাশের রাজ্য ওড়িশা। এই রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বর যাওয়ার উদ্দেশ্যে কলকাতার হাওড়া স্টেশন থেকে সন্ধ্যারাতে ট্রেনে চাপি।

এসি কামরা। খুবই পরিষ্কার-পরিছন্ন। সব যাত্রীর জন্য ঘুমানোর ব্যবস্থা রয়েছে। আছে লেপ-তোশকও। ট্রেনে উঠেই ঘুমিয়ে পড়ি। ৩৭০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ভোরে পৌঁছি ভুবনেশ্বর। রেলস্টেশন থেকে অটোতে করে পান্থনিবাসে গিয়ে উঠি। এখানে অনেক হোটেল। ভাড়া ৫০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে।

সকালে ট্যাক্সি রিজার্ভ করে ভুবনেশ্বর শহর দেখতে বের হই। চওড়া রাস্তা। যানবাহন আর লোক-চলাচল খুবই কম। লোকগুলো কৃষ্ণ বর্ণের। ভাষা খুবই জটিল। ট্যাক্সিচালক গণেশ থাপা বললেন, “ওড়িশার আরো নাম রয়েছে—‘কলিঙ্গ’, ‘উত্কল’, ‘উড্রদেশ’। কলিঙ্গ রাজার দেশ বলে এর নাম ‘কলিঙ্গ’। ২৬১ খ্রিস্টপূর্বে এই কলিঙ্গ রাজার সঙ্গে সম্রাট অশোকের যুদ্ধ হয়। তাতে মৃত্যু হয় দেড় লাখ মানুষের। এত প্রাণহানির ঘটনায় অশোক বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি শপথ নেন, আর অস্ত্র নয়, আর যুদ্ধ নয়, ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মন জয় করতে হবে। সাত শতকে ওড়িশা থেকে বৌদ্ধ ধর্মকে উত্খাত করে হিন্দু ধর্ম। এরপর হিন্দু রাজারা ৫০০ বছর তাঁদের রাজত্বে ওড়িশাকে দৃষ্টিনন্দন মন্দির দিয়ে সাজান। বারো শতকে এসব মন্দিরের সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়ে যায়। ” ট্যাক্সিচালকের কথায় আরো জানতে পারি ভুবনেশ্বর হচ্ছে পাহাড়, সমুদ্র, মন্দিরের রাজধানী। ওড়িশা সরকারের ট্রাভেল অফিসে গিয়ে ভুবনেশ্বর দর্শনের টিকিট কাটি। এসি বাসের টিকিটের দাম ৫০০ টাকা।

সকালে পান্থনিবাস থেকে স্ত্রী আর ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাসে চাপি। কয়েক মিনিট চলার পর গাইড নারায়ণ বললেন, ‘এই সফরে ভুবনেশ্বরের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে মন্দির, চিড়িয়াখানা, সাফারি পার্ক, গুহা ছাড়া আরো কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরিয়ে দেখানো হবে। ৫০০ টাকার এই প্যাকেজের জন্য দর্শনীয় স্থানে ঢুকতে আর কোনো টিকিট লাগবে না। ’ ১০ মিনিট পরেই তিনি বললেন, ‘১৫ মিনিটের বিরতি। পেট পূজা করে নিন। ’ বাস থেকে নেমেই দেখি, দুটি হোটেলে ভিড়। খাবারদাবারে ধোঁয়া উড়ছে। ভাপা পিঠার মতো ইডলি আর আলুর পাকোড়া ছাড়া অন্য কোনো খাবার নেই। নানা রকম চাটনি দিয়ে তা-ই খেয়ে নিলাম।

বাস আবার ছুটছে। বেশ কয়েক কিলোমিটার পর আমাদের বাস থামল। ফুল বাগান আর পাহাড়ের পাথর ডিঙিয়ে আমরা হাঁটতে থাকি। গাইড বললেন, এ হচ্ছে উদয়গিরি আর খণ্ডগিরি গুহা। প্রথমে অনেক সিঁড়ি ডিঙিয়ে ডান পাশের উদয়গিরির ভেতর ঢুকি। এটি হচ্ছে বৌদ্ধ গুহা। দুই শতকে পাথর খুঁড়ে ১২৩ ফুট উঁচুতে বৌদ্ধ সাধুদের বসবাসের জন্য এই উদয়গিরি তৈরি করা হয়। লালচে রঙের পাথরের গুহার ভেতর নানা ধরনের টেরাকোটাসদৃশ কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হই।

উদয়গিরির পাশে খণ্ডগিরিও অনেক উঁচু। ১১৩ ফুট উঁচু এই জৈন গুহাও রহস্যঘেরা। এর চূড়ায় রয়েছে জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর হিন্দু মন্দির। দুই গিরি দেখতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এরপর আমাদের বাসে করে একটি পাহাড়ের পাদদেশে নামিয়ে দেওয়া হয়। গাইডের পিছু পিছু সিঁড়ি ভেঙে এগোতে থাকি। প্যাঁচানো অনেক সিঁড়ি ভেঙে ধৈলী পাহাড়ের শান্তি স্তূপের পাদদেশে এসে পৌঁছি। এখানেই সম্রাট অশোকের সঙ্গে কলিঙ্গ রাজার যুদ্ধ হয়েছিল। আর যুদ্ধের পর অশোক এখানেই ধ্যানে বসেন। ১৯৭০ সালে এই স্থানে খুবই সুন্দর সাদা ধবধবে শান্তির প্রতীক ‘পিস প্যাগোডা’ নির্মাণ করা হয়। প্যাগোডার ভেতর গৌতম বুদ্ধ বসে আছেন। শান্তির এই স্থাপনা দেখে নামার সময় চোখে পড়ে পাহাড়ের ভেতরে ছোট ছোট দোকান। সেখানে কাজুবাদাম, পোস্তদানা, এলাচ, জায়ফল বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি কাজুবাদামের দাম নাকি ২০০ টাকা। এখানে প্রচুর কাজুবাদামের চাষ হয়। ফলে দামটা বেশ কম। এই সুযোগ তো আর হারানো যায় না। কিনে ফেললাম এক কেজি।

এরপর আমাদের নামিয়ে দেওয়া হলো বিরাট আকৃতির একটি মন্দিরের সামনে। এই মন্দিরের নাম ‘লিঙ্গরাজ মন্দির’। গাইড বললেন, ‘হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ছাড়া এই মন্দিরে অন্য ধর্মের কেউ প্রবেশ করতে পারে না। এ ছাড়া চামড়াজাত দ্রব্য নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ নিষেধ। ’ মন্দিরের বাইরে দাঁড়াই আমরা। মন্দিরের এক সেবায়েত জানালেন, ‘১০৮টি মন্দির নিয়ে এই লিঙ্গরাজ মন্দিরের সৃষ্টি। এক হাজার সালে গঙ্গা রাজা ললাট কেশরী এই মন্দির তৈরি করেন। এখানে ভগবান শিবের লিঙ্গ বিগ্রহ আছে। ’ এই মন্দির দেখার পর আমাদের ভুবনেশ্বর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের নন্দনকানন চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই চিড়িয়াখানার ভেতর সামুদ্রিক মাছের একটি জাদুঘর আছে। চিড়িয়াখানার প্রবেশমূল্য ১০০ টাকা। প্রথমে মাছের জাদুঘরে অপরূপ অ্যাঞ্জেল ফিশ, শার্ক, গোল্ডফিশ, স্টারফিশসহ নানা প্রজাতির দুর্লভ সব সামুদ্রিক মাছ দেখি। এরপর ছোট একটি ব্যাটারিচালিত বাহনে চড়ে হারিয়ে যাওয়া শকুন, লাভ বার্ড, সাদা বাঘ, সাদা কুমির, গরিলা, গণ্ডার, চিতাবাঘ ছাড়াও নানা রকম জীব-জন্তু দেখি। ঘণ্টাখানেক পর আমাদের একটা জেল কয়েদি নেওয়ার বাসে তোলা হয়। পুরো বাস মোটা মোটা লোহার শিক দিয়ে ঘেরা। গাইড বললেন, ‘আমরা লায়ন সাফারি পার্কের উদ্দেশে যাত্রা করছি। ’ কয়েক মিনিট ছোটার পর বিরাট একটি লোহার গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় বাসটি। আমাদের অবাক করে দিয়ে প্রবেশপথটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায়। কয়েক হাত পরে ফের আরেকটি গেট পার হয়ে গভীর অরণ্যের ভেতর তৈরি লাল পথ ধরে ধীরে ধীরে বাস ছুটতে থাকে। বাসচালক জানান, ‘এখন সিংহ দেখতে পাবেন। জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকুন। ’ একটু পরেই শোনা যায় সিংহের গর্জন। একটা সিংহ আমাদের বাসের দিকেই তেড়ে এলো। খানিকটা পথ যাওয়ার পর দেখি, এক সিংহ দম্পতি রাস্তার পাশেই বসে খুনসুটি করছে। বাস এখানে থামে। এখানে খানিকটা সময় কাটিয়ে গেলাম বাঘের সাফারি পার্কে। সেখানে বহু বাঘ দেখতে পাই। বেশির ভাগ সাদা রঙের। কিন্তু বাঘের পার্কেই দেখি একটি বিশাল আকৃতির ভালুক আমাদের বাসের পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে। হাত বাড়িয়ে কিছু একটা চাইছে যেন। দু-একজন অতিউৎসাহী চিপস ছুড়ে দিল। সেগুলো দিব্যি খেয়ে নিল ভালুকটা। বোঝাই যাচ্ছে, এসবে ও বেশ অভ্যস্ত।

সন্ধ্যা নেমে আসে। চারদিকে বাঘের গর্জন শোনা যেতে লাগল। গাইড বললেন, ‘১৯৬০ সালে এই নন্দনকানন চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা হয়। এখানে ২০০ সাদা বাঘ রয়েছে। কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শাল-সেগুন অরণ্যের এই দুটি সাফারি পার্ক ভারতের অন্যতম। ’ নন্দনকানন ঘুরে সেই দিনের মতো হোটেলে ফিরি।

কলকাতা ফেরার পথে রেলস্টেশনে দেখি, ফুটপাতে ট্রের মধ্যে সাজিয়ে রাখা হয়েছে রসগোল্লা। শুনেছি, ওড়িশা নাকি রসগোল্লার আঁতুড় ঘর। এখানকার রসগোল্লার স্বাদ না নিলে কি চলে? শেষমেশ মিষ্টিমুখ করে ভুবেনশ্বরকে বিদায় জানাই।

 

 

 

 

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে কলকাতা ভাড়া এক হাজার ৭০০ টাকা। কলকাতার হাওড়া রেলস্টেশন থেকে পুরি এক্সপ্রেস, ভুবনেশ্বর এক্সপ্রেস, শতাব্দী এক্সপ্রেসসহ আরো অনেক ট্রেন রয়েছে।

৯-১০ ঘণ্টার ভ্রমণ, ভাড়া ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা


মন্তব্য