kalerkantho


অন্য কোনোখানে

মণিপুরিদের রাস উত্সবে

সুমন্ত গুপ্ত

৩০ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



মণিপুরিদের রাস উত্সবে

সকাল ৭টা। ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে মৃদু হাওয়া বয়ে যাচ্ছে।

শুয়ে আছি কাঁথা মুড়ি দিয়ে। হঠাত্ করেই মায়ের ডাক, ‘কি রে, উঠবি না? আর দেরি হলে তো ট্রেন ধরতে পারবি না। ’ মাকে জানালাম, ট্রেনের আরো এক ঘণ্টা সময় বাকি আছে। কিন্তু একটু পরই শুরু হলো ফোনের পর ফোন, ‘দাদা ঘুম থেকে ওঠেন... উঠেছেন তো?’ শেষমেশ এই ফোনের যন্ত্রণায় ঘুম থেকে উঠতে বাধ্য হলাম। আর মাত্র ২০ মিনিট আছে ট্রেন ছাড়ার। সিঁড়ি দিয়ে নামছি, অমনি ড্যানি শর্মার ফোন, ওরা নাকি সবাই স্টেশনে পৌঁছে গেছে। দৈবক্রমে একটা সিএনজি পেয়ে গেলাম। এদিকে আবার হাসনাতের ফোন, ‘কোথায় দাদা, ট্রেন তো হুইসেল দিয়ে দিয়েছে?’ স্টেশনের কাছাকাছি আসতেই দেখলাম ট্রেন চলা শুরু করেছে। দিলাম দৌড়। সেই দৌড়েই উঠে পড়লাম জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসে।

কার্তিকের মিষ্টি সকাল। ট্রেন চলছে ঝিক ঝিক ছন্দে। ও বলাই তো হলো না, আমাদের আজকের গন্তব্য ভানুগাছের কমলগঞ্জ। সেখানকার ঐতিহ্যবাহী মণিপুরি রাসনৃত্য দেখতে যাচ্ছি। ভ্রমণসঙ্গী ড্যানি শর্মার বাড়ি কমলগঞ্জে। প্রতিবছরই ভাবি, এবারই রাসনৃত্য দেখতে যাব; কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠছিল না। যাক এবার সেটা সম্ভব হলো। ট্রেনের সহযাত্রীদের মধ্যে বেশ কিছু মণিপুরির দেখা মিলল। সবার গন্তব্য সেখানকার সবচেয়ে বড় উত্সব মহারাসলীলা। এখানে বলে রাখা ভালো ‘রস’ থেকেই ‘রাস’ শব্দের উত্পত্তি। ‘লীলা’ মানে ‘খেলা’। ‘রাসলীলা’র মানে শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরাধা ও তাঁদের সখা-সখীদের লীলাখেলা। মণিপুরি সমাজে রাসনৃত্য আবার ছয়টি ভাগে বিভক্ত। এগুলো—মহারাস, বসন্তরাস, নিত্যরাস, কুঞ্জরাস, গোপীরাস ও উদখুলরাস। বিভিন্ন ঋতুতে হয় এসব রাস। এর মধ্যে মহা রাসলীলা হচ্ছে বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

মাইজগাঁও স্টেশন পেরিয়ে দেখতে দেখতে আমরা ভানুগাছে পৌঁছে গেলাম। রেলস্টেশনে নেমে গেলাম ড্যানির বাড়িতে। সেখান থেকে রাসনৃত্যের মণ্ডপ খুব কাছেই। ওদের বাসায় গিয়ে দেখি আমাদের জন্য বিশাল আয়োজন। হরেক রকমের নাম না জানা খাবার। নিমেষেই সেসব সাবাড় করে দিলাম। খানিক বিশ্রামের পর রওনা হলাম মণ্ডপের উদ্দেশে। একটু পরই শুরু হবে রাখালনৃত্য। ঘড়িতে তখন দুপুর ১২টা। পথেই দেখা মিলল ড্যানির কাকু অবনি সিনহের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ‘১৭৭৯ সালে প্রথম রাসনৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করেন ভারতের মণিপুরি রাজ্যের মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র। সেই অনুষ্ঠানে তিনি নিজেই ছিলেন মুখ্য মৃদঙ্গবাদক এবং মহারানি হীরামতি ছিলেন গোপীপ্রধান ললিতার ভূমিকায় আর রাজকন্যা বিম্বাবতী ছিলেন রাধার ভূমিকায়। রাসলীলা অনুষ্ঠিত হয় রাতের বেলায়। আর দিনে হয় রাখালনৃত্য। ছেলেদের অংশগ্রহণে হয় এ নৃত্য। ’

রাসনৃত্যের পোশাক পরিকল্পনাও করেছিলেন মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র। ছেলেদের পোশাক সবারই এক রকম। পরনে ধুতি, খালি গা, মাথায় ময়ূর পালকের চূড়া, তার মধ্যে ছোট ছোট আরশি বসানো জরির কারুকাজ, কপালে চন্দনের তিলক, গলায় মালা, হাতে বাঁশি, কোমরের কাপড়ের ওপর জরি বসানো, মাথায় লম্বা কৃত্রিম চুল এবং পায়ে নূপুর। অন্যদিকে মেয়েদের মুখের ওপর পাতলা সাদা বসনের আবরণ। ঘন সবুজ রঙের ভেলভেটের ব্লাউজ ও পরনে সবুজ সাটিনের পেটিকোটের জমিনের মাঝে অসংখ্য চুমকি এবং নিম্নাংশে পিতলের তবকমোড়া বিভিন্ন গোলাকার আয়না সমান্তরালভাবে বসানো থাকে। বর্ণাঢ্য এ বিচিত্র পোশাককে বলা হয় ‘কুমিন’। কুমিনের ওপর রুপালি কাজ করা আয়না বসানো সাদা স্বচ্ছ ঘাগরাটির নাম ‘পশুরাল’। কাঁধের ওপর থেকে পাশে ঝোলানো সোনালি ও রুপালি জরির কাজ করা অংশটিকে ‘খওল’ বলে। তা ছাড়া বিভিন্ন ধরনের অলংকারও পরা হয় সে সময়। মাথায় থাকে চূড়াসহ চমত্কার এক মুকুট।

মণ্ডপে গিয়ে দেখলাম, রাখালনৃত্য শুরু হয়ে গেছে। এই নাচে মূলত শ্রীকৃষ্ণের বাল্যকালের কাহিনি বর্ণনা করা হয়। যারা রাখালনৃত্য করে, তারা প্রথমে মণ্ডপে গোল হয়ে গোপী ভোজন করে। গোপী ভোজন হলো বিভিন্ন সবজি দিয়ে রান্না করা তরকারি ও ভাত। এ খাবার খেয়েই রাখালনৃত্য শুরু করে শিল্পীরা। ছোট ছোট শিশুর সুন্দর নৃত্যের ভঙ্গিমা দেখলেই মনটা জুড়িয়ে যায়। এই নৃত্য একটানা চলে বিকেল পর্যন্ত।

রাখালনৃত্য দেখে আবার চলে এলাম ড্যানির বাসায়। সেখানে আমাদের জন্য করা হয়েছে বিশেষ এক আয়োজন—জনপ্রিয় মণিপুরি খাবার ‘ইরল পা’ বা ‘ইরম্বা’র। এটি মূলত আলু, বরবটি, টমেটো, বেগুন, চ্যাপা শুঁটকি, কাঁচা মরিচ দিয়ে তৈরি খুব সুস্বাদু এক পদ। পেটপুরে খেয়ে সবাই রাত জাগার প্রস্তুতি নিতে লাগল। তবে আমি বের হলাম আশপাশটা একটু ঘুরে দেখার জন্য। ঘড়ির কাঁটা রাত ১১টা যেতেই রাতের খাবার খেয়ে আমরাও চলে এলাম মণ্ডপে। শুরু হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত রাসনৃত্য। মণ্ডপটি সাজানো কাগজের ফুল ও কাপড় দিয়ে। আলো জ্বলছে মণ্ডপের চারপাশে। আর মণ্ডপ ঘিরে বসে আছেন নানা বয়সের নারী-পুরুষ। তাঁদের সবার দৃষ্টি মণ্ডপের মাঝখানে নৃত্যরতদের প্রতি। নৃত্য করছে ১৫ থেকে ২০ জন মণিপুরি কুমারী মেয়ে। আর এক কোণে বসে পাঁচ-ছয়জন বৃদ্ধ নারী-পুরুষ বিশেষ বাজনা সহকারে গান গাইছেন। সে গান ও বাজনার তালেই চলে এ নৃত্য। এ এক অপূর্ব দৃশ্য। চারপাশের মানুষজন একাগ্রচিত্তে মগ্ন হয়ে আছে রাধা-কৃষ্ণের লীলা কীর্তনে। মাঝেমধ্যে নৃত্যশিল্পীদের উদ্দেশে বাতাসাসহ শুকনা মিষ্টিজাতীয় খাবার ছুড়ে দিচ্ছে শ্রোতা-দর্শকরা। কেউ কেউ নৃত্যশিল্পীদের পায়ে প্রণাম করে নগদ টাকাও দিচ্ছে। কেউ বা আবার টাকার মালা বানিয়ে তা নৃত্যশিল্পীদের গলায় পরিয়েও দিচ্ছে। ধীরে ধীরে সূর্যদেবের দৃষ্টি মেলে তাকানোর সময় ঘনিয়ে এলো আর রাসনৃত্যানুষ্ঠানও সমাপ্তির পথে। চলছিল অন্তিম মুহূর্তের আরতি কীর্তন। কীর্তন শেষ হওয়ার পর আবার ফিরে গেলাম ড্যানিদের বাসায়। এবার নগরজীবনে ফেরার পালা, সঙ্গে নিয়ে নিলাম অসাধারণ কিছু স্মৃতি।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে ট্রেনে সরাসরি কমলগঞ্জ যাওয়া যায়। সিলেটগামী পারাবাত ও জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস কমলগঞ্জ (ভানুগাছ) স্টেশনে থামে। এ ছাড়া অন্যান্য ট্রেনে শ্রীমঙ্গল এসে সেখান থেকেও সহজেই কমলগঞ্জ যাওয়া যায়। ঢাকার কমলাপুর থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্ত নগর ট্রেন পারাবাত এক্সপ্রেস। আর প্রতিদিন দুপুর ২টায় ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস। এ ছাড়া ঢাকার ফকিরাপুল ও সায়েদাবাদ থেকে বাস যায় শ্রীমঙ্গল। ভাড়া ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা। শ্রীমঙ্গল থেকে কমলগঞ্জ যাওয়া যায় বাস কিংবা অটোরিকশায়।
এবারের রাসমেলা অনুষ্ঠিত হবে ৪ নভেম্বর।

ছবি : কাজী সোহেল তানভির মাহামুদ ও লেখক


মন্তব্য