kalerkantho


নতুন খাদি

দিন দিন খাদির চেহারা নতুনত্ব পাচ্ছে। অমসৃণ থেকে মসৃণ টেক্সচার। মোটিফ, প্যাটার্ন, রং—সব কিছুতেই ঐতিহ্যের ছোঁয়া। আসছে খাদি উত্সব নিয়ে বিস্তারিত জানালেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

৩০ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



নতুন খাদি

মডেল : মাইশা, ছবি : কাকলী প্রধান, পোশাক : আলমিরা, মেকআপ অ্যান্ড হেয়ার স্টাইল : বানথাই

খাদি বলতে চোখের সামনে ভেসে উঠত অফহোয়াইট চাদর কিংবা পাঞ্জাবি। সেই সময় পেরিয়ে এসে খাদি কাপড়ে তৈরি হচ্ছে শাড়ি, কামিজ, পনচো, টপ, কুর্তা, গাউন, লং জ্যাকেট, কামিজ, পাঞ্জাবি, কটি, ক্রেপসহ সব ধরনের পোশাক। মোটা কাপড় বলে আগে শুধু শীতের সময় খাদি কাপড়ের চাহিদা হতো। এখন সুতা আর বুননে নানা ধরনের নিরীক্ষা করে পাতলা করে সব ঋতুতে পরার উপযোগী করা হয়েছে খাদি কাপড়কে। উত্সবকে কেন্দ্র করে খাদির ভিন্ন রূপ, বহুমাত্রিক ব্যবহার আর নানা ভাবনা তুলে ধরছেন ডিজাইনাররা। মোটিফ, প্যাটার্ন, রং—সবই নিয়েছেন বাংলাদেশেরই লোকজ ঐতিহ্য থেকে।

তৃতীয়বারের মতো খাদি উত্সব
খাদিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াসে ২০১৫ সাল থেকে ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব বাংলাদেশ (এফডিসিবি) আয়োজন করছে খাদি উত্সবের। প্রতিপাদ্য ‘ট্রেসেমি খাদি, দ্য ফিউচার ফ্যাব্রিক শো ২০১৭’। এবারও থাকছে খাদির পোশাক প্রদর্শনী ও ফ্যাশন শো। আগামী ৩ ও ৪ নভেম্বর এই ফ্যাশন শোর আয়োজন করা হয়েছে রাজধানীর বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে ৩ নম্বর মিলনায়তনে। প্রতিদিন বিকেল  সাড়ে ৫টা থেকে শুরু হবে অনুষ্ঠান।

এবারের আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন মোট ২৬ জন ডিজাইনার। এর মধ্যে ১৯ জন বাংলাদেশি। এ ছাড়া ভারত থেকে দুজন, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের একজন করে মোট সাতজন ডিজাইনার অংশ নেবেন এবারের উত্সবে। ফ্যাশন শোতে প্রদর্শিত পোশাক নিয়ে প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে ১০ ও ১১ নভেম্বর। গুলশানের গার্ডেনিয়া মিলনায়তনে। চলবে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ চাইলে এখান থেকে খাদির পোশাক কিনতে পারবেন। এবারের উত্সবে সহযোগিতা করছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বেঙ্গল গ্রুপ লিমিটেড, আইপিএবি, সেনোরা, মাইক্রোসফট ও বার্জার।

অংশগ্রহণকারী ডিজাইনার
দেশি

মাহিন খান, কুহু, এমদাদ হক, চন্দনা দেওয়ান, শৈবাল সাহা, বিপ্লব সাহা, লিপি খন্দকার, নওশিন খায়ের, ফারাহ আনজুম বারী, শাহরুখ আমিন, আফসানা ফেরদৌসি, তেনজিং চাকমা, ফারাহ দিবা, ফায়জা আহমেদ, রিফাত রেজা রাকা, মারিয়া সুলতানা, সারাহ করিম, রুপো শামস ও রিমা ইমতিয়াজ।
বিদেশি
সৌমিত্র মণ্ডল, হিমানশু সানি (ভারত), নেলুন হারাসগাভানা (শ্রীলংকা), চিম্মি চোডেন (ভুটান), রাসনা শ্রেষ্ঠ (নেপাল), জ্যাকুলিন ফঙ (মালয়েশিয়া), সুকিজিত্ দাংচাই (থাইল্যান্ড)।



মডেল : এফা, পোশাক : কুহু’স ওয়ারেবল আর্ট, ছবি : তারেক আজিজ নিশক

অনুপ্রেরণা নিয়েছি বাংলার ঐতিহ্যবাহী গয়না থেকে
কুহু
কুহু’স ওয়ারেবল আর্ট

সোনাকে শক্তি ও সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের কাছে সোনার আবেদন এতটুকু কমেনি। বাংলাদেশেও এটা সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু অধিকাংশ সোনার কারিগর দরিদ্র ও কাজের প্রাপ্য মজুরি পায় না। একজন শিল্পী হিসেবে আমি সোনার নান্দনিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর নেতিবাচক দিকটার ওপরও আলো ফেলতে চেয়েছি। গোলাপ বালা, সীতাহার, বাজুবন্দ, ঝুমকা, ময়ূরমুখ বালা, কানবালি, রুলি, অমিত্রপাক বালা, হাঁসুলির মতো বাংলার ঐতিহ্যবাহী গয়না থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে পোশাকের নকশা করেছি। শুধু তরুণীদের পোশাকই থাকছে। নীল, কালো, কমলা ও বেগুনি—পোশাকের রং হিসেবে এই চারটি রংকেই বেছে নিয়েছি। নীল রং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরছে। কমলা এবং বেগুনির মাধ্যমে নারীদের সৌন্দর্য ও দৈনন্দিন জীবনযাপনকে দেখাতে চেয়েছে। আর কালো রংটা অত্যাচার, ভয় ও নিষ্ঠুরতাকে প্রতীকায়িত করেছে।

দেশীয় ঘরানার সঙ্গে ওয়েস্টার্ন ঘরানার মিশ্রণ আছে কাট প্যাটার্নে
শাহরুখ আমিন
আলমিরা

খাদি উত্সবে এবার আমাদের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি নিয়ে কাজ করেছি। শীতল পাটির মোটিফকে ভাগ করেছি লাল, ছাই ও অফহোয়াইট—এই তিন রঙে। এর মধ্যে লালের মধ্যে লাল, সাদার মধ্যে সাদা এভাবে এমব্র্রয়ডারির নকশা ব্যবহূত হয়েছে। খাদির সঙ্গে হাতে বোনা সুতি ও মসলিন কাপড়ের মিশ্রণ ঘটেছে। এবার মোট ১৪টি পোশাক বানিয়েছি। এর মধ্যে ১২টি মেয়েদের ও ছেলেদের দুটি। পোশাকগুলোতে ১১০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার করা হয়েছে। দেশীয় ঘরানার সঙ্গে ওয়েস্টার্ন ঘরানার মিশ্রণ আছে কাট প্যাটার্নে। পুরো শাড়িজুড়েই শীতল পাটির নকশা ব্যবহার করেছি। আঁচল ও পাড়েও শীতল পাটির আলাদা নকশা চোখে পড়বে। নকশার প্রয়োজনে চুমকি, পাথর ইত্যাদির ব্যবহার হয়েছে। মেয়েদের পোশাকের কোমর থেকে নিচের অংশে এবং হাতায় কুঁচির ব্যবহার নজর কাড়বে।

মডেল : মাইশা, পোশাক : আলমিরা, আলমিরার ছবি : কাকলী প্রধান

পুরনো বাড়ির জানালার গ্রিলের  নকশা নিয়ে কাজ করেছি
বিপ্লব সাহা
বিশ্বরঙ
পানাম নগরের বাড়িগুলোর জানালার গ্রিলে যে নকশা আছে সেটাকেই বেছে নিয়েছি মোটিফ হিসেবে। খাদির ওপর স্ক্রিন প্রিন্ট বেইজড কাজ থাকছে। দরকারমতো এমব্রয়ডারি, প্যাচওয়ার্ক, টাইডাইয়ের কাজও হয়েছে। এ ছাড়া খাদিতে নানা ধরনের বুনন নকশাও রেখেছি। খাদির নিজস্ব রং—অফহোয়াইট তো থাকছেই। পাশাপাশি পানাম নগরের দেয়ালের যে তামাটে রং সেটাও থাকছে। আছে গ্রিলের চকলেট ও কালো রংও। ছেলে-মেয়ে উভয়ের পোশাকই আছে। তবে মেয়েদের পোশাকই বেশি। বেশির ভাগ পোশাকই লং প্যাটার্নের। শাড়ি-পাঞ্জাবির মতো ঐহিত্যবাহী পোশাক যেমন রয়েছে, তেমনি ওয়েস্টার্নের সঙ্গে ফিউশন করা পোশাকও আছে।

পোশাক : বিশ্বরঙ, ছবি : সালেক বিন তাহের

ফিরে যাচ্ছি প্রকৃতির কাছে
মাহিন খান, সভাপতি, এফডিসিবি
এবারের আয়োজনের থিম কী?
বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহ্যকে ঘিরেই আমাদের কাজ।   এবারের থিম ‘লোকজ মোটিফ’। শীতল পাটি, হাতপাখা, হাতে তৈরি গয়না, বাংলা ক্যালিওগ্রাফি, আলপনার মতো ঐতিহ্যবাহী লোকজ উপকরণগুলোকে নানা ফর্মে খাদি কাপড়ের ক্যানভাসে উপস্থাপন করেছেন ডিজাইনারা।

এটা তো তৃতীয়বারের মতো আয়োজন। গত দুই বছরের অর্জনকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আমরা প্রকৃতির কাছে ফিরে যাচ্ছি। আমাদের কাজ সচেতনতা সৃষ্টি করা। দেশীয় কাপড়কে সবার সামনে তুলে ধরা। আমার মনে হয়, নতুন প্রজন্মের কাছে আমরা খাদিকে পৌঁছে দিতে পেরেছি। খাদি নিয়ে নতুন নতুন কাজ হচ্ছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ আমাদের নীতিনির্ধারকরা খাদি নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। তারা আমাদের ডেকেছেন। এখনকার খাদির সমস্যা তুলে ধরতে বলেছেন। এই সব সমস্যা নিরসনে তারাও আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন। এটা আমাদের বড় পাওয়া।

সমস্যাটা আসলে কোথায়?
বিদেশি কাপড়ে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে আমাদের বাজার। আমাদের দেশের পাওয়ার লুমের কাপড় উত্পাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত নানা পর্যায়ে রাসায়নিকের ব্যবহারের কারণে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। তাছাড়া এ কাপড় টেকসই হয় না। অন্যদিকে খাদি আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি। পরিবেশবান্ধব কাপড়। খাদিকে আমরা বলছি, ‘ফিউচার ফেব্রিক’। কিন্তু তাঁতিরা যোগ্য মজুরি না পাওয়ায় এবং উত্পাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাঁত। এদিকটাতে মনোযোগ দিতে হবে।  

মোটা কাপড় বলে অনেকে খাদি পরতে চান না?
আমাদের এখানে চরকায় যে খাদি হয় সেই সুতা কিছুটা মোটা। আমাদের দেশিয় চরকার সুতা ব্যবহার করে খাদি উত্সবের কাপড় বোনানো হয়েছে। এবার আমরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে খাদির সুতা নিয়ে এসে এখানে বুনন করেছি। ১৫০ কাউন্টের সুতা। বেশ নিখুঁত। প্রায় ৩০ বছরে খাদির শাড়ি হয়নি। এবার আমরা খাদির শাড়ি বানিয়েছি। খাদি কাপড়ে এখন সব ধরনের পোশাক হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। ফলে খাদি নিয়ে প্রচলিত ধারণা বদলে যাচ্ছে।

প্রায় তিন হাজার গজের মতো খাদি কাপড় বুনেছি
এবারের খাদি উত্সবের পোশাকগুলোর কাপড় বোনা হয়েছে টাঙ্গাইলে। ৩০ জন তাঁতি তিন মাস ধরে চরকায় বুনেছেন প্রায় তিন হাজার গজের মতো খাদি কাপড়। টাঙ্গাইলের তাঁতি নিমাই বসাক বলেছেন তাঁর বুনন পর্বের অভিজ্ঞতার কথা।
প্রায় ৩০ বছর ধরে আমি তাঁত ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সেই সূত্রে ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব বাংলাদেশের সঙ্গে পরিচয়। এবারও প্রায় চার মাস আগে তারা যোগাযোগ করল। আমি রাজি হলাম। আমাদের এখানে খাদি সুতার কাউন্ট একটু কম। কম কাউন্টের সুতা বলে কাপড় একটু মোটা এবং খসখসে হয়। তাই তাঁরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে কিছু সুতা এনে দিয়েছিলেন। যেটা প্রায় ১৫০ কাউন্টের মতো। এর সঙ্গে দেশিয় চরকার সুতা আর কটন সুতা মিলিয়ে খাদি উত্সবের কাপড় তৈরি করেছি। আমার অধীনে প্রায় ৩০ জনের মতো তাঁতি তিন মাস কাজ করেছে। প্রায় তিন হাজার গজের মতো খাদি কাপড় বুনেছি। ডিজাইনারদের সঙ্গে আলাপ করে কাপড়গুলো বানিয়েছি। প্রতিটি শাড়ির দৈর্ঘ্য ছিল সাত গজ করে। থান কাপড়গুলো একই মাপের। কাপড়ে ন্যাচারাল যে কোরা রং সেটাই রেখেছি। শাড়ির আঁচল ও বডিতে অ্যান্ডি সুতা ব্যবহার করেছি। এই অ্যান্ডি সুতা কাপড়ে একটু হলদেটে ভাব এনেছে। এর ওপরই ডিজাইনাররা বিভিন্ন নকশা করেছেন। দেশে এখন হাত তাঁতের সংখ্যা বিলুপ্তির পথে। সেখানে স্বপ্ন দেখাচ্ছে এই খাদি উত্সব।

 


মন্তব্য