kalerkantho


আপনার সন্তান

বাচ্চাকে শাসন করলে

নানা কারণে আপনি হয়তো বাচ্চার ওপর বিরক্ত হন। হয়তো গায়ে হাত তোলেন না; কিন্তু বাচ্চার ওপর অত্যধিক চিৎকার করেন। এর ফলে বাচ্চার কী ধরনের ক্ষতি হয় তা হয়তো আপনি জানেন না। বাচ্চার এ ধরনের সমস্যা কী করে সমাধান করবেন—জানালেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট খাদিজা ফাল্গুনী

১৬ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



বাচ্চাকে শাসন করলে

সন্তানের ওপর কখনো বিরক্ত হয়ে হয়তো মেজাজ হারিয়ে ফেলেন এবং তার ওপর চিৎকার করলেন। অথচ চিৎকার করার আগে আপনি হয়তো একবারও ভাববেন না বাচ্চার ওপর এর কী প্রভাব পড়ছে।

এখনকার অনেক মা-বাবা বাচ্চার গায়ে হাত তোলেন না। হয়তো মনে করেন গায়ে হাত তোলার বদলে তাদের ওপর চিৎকার করে বা বাচ্চাকে বকাঝকা করলে অনেক বেশি কার্যকর হবে। এভাবে হয়তো শারীরিকভাবে সে আঘাত পাবে না; কিন্তু বাচ্চা মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হবে। আত্মসম্মানবোধ নষ্ট হয়ে যাবে। এ ছাড়া বাচ্চার ওপর চিৎকার বা অহেতুক পরামর্শ দিলে কিংবা অন্য বাচ্চার সঙ্গে তুলনা করলে এর বিরূপ প্রভাব ফেলে বাচ্চার মনে। তাই বাচ্চাকে শাস্তি দেওয়ার সময় কিছু বিষয় এড়িয়ে চলবেন।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে সন্তান জন্মানোর পর নতুন মায়ের অবসাদ তৈরি হয়। ফলে তিনি তাঁর সদ্যোজাত বাচ্চার সামান্য যন্ত্রণাতেই তার ওপর চিৎকার করেন। কিন্তু মাথায় রাখবেন, এভাবে মোটেই সমস্যার সমাধান হবে না। উপরন্তু আপনি আরো বিরক্ত ও ক্লান্ত বোধ করবেন। সদ্যোজাত বাচ্চা কিছুই বুঝতে পারবে না। উল্টো আপনার চিৎকারে বাচ্চার স্লিপিং সাইকেল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
যখন এক থেকে তিন বছরের মধ্যে বাচ্চার বয়স থাকে, তখন কিন্তু সে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত থাকে। ফলে আপনি তার সঙ্গে কিভাবে ব্যবহার করছেন তার ছাপ পরবর্তী সময়ে মুছে ফেলা কঠিন। এই সময়টায় বাচ্চাদের ওপর চিৎকার করে তাকে শৃঙ্খলিত করা যাবে না। বাচ্চারা যাতে সুরক্ষিত থাকে, এটাই প্রধান বিষয় হবে। যেমন ধরুন সে অযথাই ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করছে। আর আপনি তার ওপর চিৎকার করে উঠলেন বা টয়লেট ট্রেনিং দিতে গিয়ে চিৎকার করলেন বা খাবার খেতে না চাইলে চিৎকার করছেন। কিন্তু আপনি কেন চিৎকার করছেন আপনার বাচ্চার কিন্তু তা বোঝার ক্ষমতা এই বয়সে তৈরি হবে না। এর ফলে বাচ্চারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠবে। আর অত্যধিক বকাঝকার ফলে আত্মবিশ্বাস একেবারেই নষ্ট হয়ে যাবে। অনেক ক্ষেত্রে বাচ্চা ভীত ও চুপচাপ হয়ে যেতে পারে।
কী করবেন?
*    বাচ্চাকে বুঝিয়ে বলুন। প্রয়োজনে ছোটখাটো ধমক দিন। পরক্ষণে আপনি তাকে খুব ভালোবাসেন এটা বুঝিয়ে দিন এবং তার ভালোর জন্যই আপনি যে তাকে বকেছেন তাও বুঝান। সঙ্গে সঙ্গে না করে কিছুক্ষণ পরে বলুন।
*    বাচ্চার বয়স যখন তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে থাকে, তখন কিন্তু সে সব সময় আপনার ব্যবহার অন্যদের সঙ্গে তুলনা করবে। তাই আপনি বাচ্চার সঙ্গে কিভাবে কথা বলছেন তা সে তুলনা করবে তার দাদা, দাদু বা পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে। এই সময় বাচ্চার ওপর চিৎকার করলে বা বকলে আপনার এবং আপনার সন্তানের সম্পর্ক কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এটা মাথায় রেখেই তার সঙ্গে মেলামেশা করুন।
*    বাচ্চারা তাদের মা-বাবাকে খুশি করার জন্য সব কিছু ঠিকমতো করার চেষ্টা করবে। এটা কিন্তু বাচ্চার বিকাশের জন্য মোটেই ভালো নয়। এ ছাড়া আপনি যাতে তাকে না বকেন এর জন্য সে আপনাকে মিথ্যা বলাও শুরু করবে। এর ফলে আপনিও যেমন আপনার বাচ্চাকে আর বিশ্বাস করবেন না, তার ক্ষেত্রেও কিন্তু একই জিনিস হবে।
*    এ ক্ষেত্রেও বাচ্চাকে বকলে বা শাস্তি দিলে তাকে বুঝিয়ে দিন আপনি এমনটা কেন করলেন। যেমন ধরুন আপনার বাচ্চা যদি কিছু জিনিস ভেঙে ফেলে, তাহলে দুজনে মিলে একসঙ্গে পরিষ্কার করুন। বাচ্চার সঙ্গে এমন আচরণ করুন যে জিনিসটা অসাবধানতার কারণেই ভেঙেছে। ভবিষ্যতে কাজ করার সময় সাবধান হতে হবে।
*    একটা জিনিস মাথায় রাখুন, এর মানে কিন্তু এই নয় যে আপনি আপনার বাচ্চাকে কোনোরকম শাসনই করবেন না। তার ওপর সব সময় চিৎকার করা বা শাস্তি দেওয়া যেমন খারাপ, তেমনি তাকে অত্যধিক আদর দেওয়াও খারাপ। ছোটবেলায় বাচ্চাকে বেশি আদর দিলে পরবর্তী সময়ে কিন্তু সে আপনার শাসন মানবে না। এর ফলে বাচ্চার মধ্যে  জেদিভাব বা নিজেকে সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। সব থেকে ভালো হয় আগে থেকে পরিকল্পনা করে নিন কোন সময়ে বাচ্চার সঙ্গে কিভাবে ব্যবহার করবেন। বাচ্চাকে শাসন করলে বা বকলে তার কিছুক্ষণ পরে তাকে কাছে টেনে আদর করতে ভুলবেন না।

 


মন্তব্য