kalerkantho


অন্য কোনোখানে

এ যেন এক লাল স্বর্গ

রফিকুল ইসলাম   

১৬ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



এ যেন এক লাল স্বর্গ

ছবি : আরিফুর রহমান

ভোরের আলো তখনো ভালো করে ফোটেনি। চারদিক আবছা অন্ধকার।

তারই মাঝে পিচঢালাইয়ের পথ মাড়িয়ে ছুটে চলছে আমাদের বাইক। অন্ধকারে প্রায়ই পথ ভুল হচ্ছে। মাঝেমধ্যে বিলে মাছ শিকারে যাওয়া লোকজন দেখে বুঝতে পারছি, না, ঠিক পথে যাচ্ছি। এমনই সময় দেখা এক জেলের সঙ্গে। তাঁর অবাক দুই নয়নের প্রশ্ন, ‘এত ভোরে এখানে!’ শাপলাবিলে বেড়াতে এসেছি শুনে হেসে দিলেন। বিড়বিড় করে বললেন, ‘আগে এখানে বিলের মানুষ আর জেলে ছাড়া অন্য কারোর টিকিটির দেখা মিলত না। কিন্তু এখন বছরের এই সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেকেই বেড়াতে আসে এখানে।

একসময় মেঠোপথ চিরে পৌঁছে গেলাম বিলের ধারে। বিলের চারপাশে মেঠোপথ।

এই পথগুলোর আশপাশেই এলাকাবাসীর বসবাস। এবার শাপলার রাজ্যে নামার প্রস্তুতি। দেরি না করে উঠে বসলাম এক নৌকায়। বিলের ভেতর ঢুকতেই মনে হলো, বাতাসের তালে তালে লাল শাপলাগুলো এপাশ-ওপাশ দুলে দুলে হাসিমুখে আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। সে হাসিতে বিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে আনন্দধারা। ভোরের সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে লাল শাপলার দল। আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে লোকজন ছোট ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। চলছে শাপলা তোলার প্রতিযোগিতা। কে কত বেশি শাপলা তুলবে, কার ডিঙি কত দ্রুত ভরে যাবে! শুধু বড়রা নয়, পরিবারের কিশোররাও যোগ দিয়েছে সেই প্রতিযোগিতায়। কিছুক্ষণের মধ্যে ডিঙিগুলো শাপলায় ভরে গেল।

এত শাপলা তোলার পরও চোখে পড়ল, বিলজুড়ে হাজার হাজার শাপলা ফুটে আছে। দূর থেকে দেখে মনে হয়, লাল গালিচায় ঢেকে আছে বিস্তীর্ণ মাঠ। প্রকৃতির বুকে শিল্পীর তুলিতে আঁকা এ যেন এক নকশিকাঁথা। বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসে দেখতে পাবেন এই লাল শাপলা। এ জন্য আপনাকে যেতে হবে খুব সকাল সকাল। রাতের স্নিগ্ধতায় ফুটে থাকা লাল শাপলা দিনের আলোয় পাপড়ি দিয়ে অনেকটা লুকিয়ে রাখে নিজেকে।

বিলটার দূরত্ব বরিশাল জেলা সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার। উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের উত্তর সাতলা গ্রাম। গ্রামের নামেই বিলের নাম, ‘সাতলা বিল’। তবে শাপলার রাজত্বের কারণে সেটি এখন ‘শাপলা বিল’ নামেই বেশি পরিচিত। ইতিমধ্যে বিলের নাম বরিশালের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।

চারপাশে গাঢ় সবুজের পটভূমিতে এ যেন এক লাল স্বর্গ। পূর্ব আকাশে সূর্যের আলোকেও হার মানায় বিলের শত-সহস্র রক্তিম লাল শাপলা। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল ছবি তোলায়। ছবি তোলার ফাঁকে ফাঁকে নৌকার মাঝির সঙ্গে জমে ওঠে গল্প। মাঝি জানালেন, ‘লাল শাপলার বিলে এই সময়ে আসতে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। ওদের কলতানে মুখর থাকে বিলগুলো। ’

মূলত শীত মৌসুমেই এখানে পর্যটকের ভিড় বাড়ে। আমাদের সঙ্গে অন্তত ১৫টি নৌকাবোঝাই পর্যটকদের দেখা মিলল। স্থানীয়দের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থাও করে থাকে এই বিল। স্থানীয়দের অনেকে জীবিকার জন্য বছরের একটা বড় সময় বিলের মাছ ও শাপলার ওপর নির্ভরশীল।

নৌকা নিয়ে শাপলা তুলছিলেন দক্ষিণ বাগদা গ্রামের বাসিন্দা আবদুল জব্বার। তিনি অন্যের জমিতে কাজ করেন। তবে শাপলার মৌসুমে শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করেন। সেই টাকায় তাঁর সংসার চলে। তাঁর মতো শতাধিক পরিবার এভাবে টিকে আছে। তিনি জানান, ১৫ থেকে ২০টি শাপলার একটি আঁটি তিন থেকে পাঁচ টাকায় বিক্রি হয়।

আট বছর ধরে এ বিল নিয়ে কাজ করছেন আরিফুর রহমান। পর্যটক নিয়ে এ বিলে তাঁর আসা-যাওয়া নিয়মিত। শনিবার ভোরে শাপলা বিলে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘উজিরপুরের সাতলা এবং পাশের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের বাগধা ও খাজুরিয়া গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে বিছিয়ে আছে শাপলার বিল। বিলের সঠিক আয়তন সেভাবে জানা নেই কারো। তবে স্থানীয়দের মতে, কয়েক শ একর জমির ওপর প্রাকৃতিকভাবে বিলটি গড়ে উঠেছে। ’

বিলে ঠিক কত আগে থেকে এভাবে শাপলা জন্মাতে শুরু করেছে, সে তথ্যও দিতে পারেননি স্থানীয়রা। সাতলার পাশের বাগধা গ্রামের যুবক সুমন পাটোয়ারী জানালেন, ‘তাঁদের জন্মের পর থেকেই বিলে এভাবে শাপলা ফুটতে দেখছেন তাঁরা। ’ এখানে তিন রঙের শাপলা জন্মে—লাল, সাদা ও বেগুনি। তবে লাল শাপলাই বেশি। বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসে দেখতে পাবেন এই লাল শাপলা। বিলসংলগ্ন পশ্চিম খাজুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা রমেশ ঘরামি তাঁর ছোট ডিঙি নিয়ে বিলের পানিতে মাছ ধরছিলেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন প্রায় ৩০০ বড়শি পেতে মাছ ধরেন। কই, খলিসা, টাকি, শোল, পুঁটিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে। ’

শাপলা তুলে ডিঙিগুলো ফিরছিল তীরের দিকে। মেঠোপথের ধারে নছিমন ও ভ্যানগাড়ি নিয়ে বসে আছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। তাঁরা শাপলাগুলো নিয়ে যাবেন স্থানীয় বাজার ও শহরে।

আমাদেরও ফিরতে হবে। পথটাও তো কম নয়।

কিভাবে যাবেন
সাতলা নানাভাবে যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে লঞ্চে বরিশালে গিয়ে নথুল্লাবাদ থেকে বাসে শিকারপুর পৌঁছবেন। এরপর অটোতে কিংবা ভাড়ায়চালিত মহেন্দ্রা গাড়িতে করেও আপনি যেতে পারেন। ঢাকা থেকে বাসে গেলে উজিরপুরের নতুনহাটে নেমে সেখান থেকে অটোতে যেতে পারেন।


মন্তব্য