kalerkantho


অন্য কোনোখানে

উত্তমাশা অন্তরীপে

আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল   

১ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



উত্তমাশা অন্তরীপে

গাড়িতে করে জোহানেসবার্গ পার্ক বাসস্টেশনে নামিয়ে দিল রানা ও তৌকির। এখান থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন শহরে বাস যায়।

লম্বা ভ্রমণে ঘুমানো মুশকিল, তবু আরামদায়ক একটা ঘুম দিলাম। সময় কাটাতে বাসের কাচ ভেদ করে রাস্তার দুই পাশের দৃশ্য অবলোকন করতে লাগলাম। ছোট ছোট টিলার সারি, মাঝেমধ্যে কিছু বসতবাড়ি ছাড়া পুরো এলাকাই ফাঁকা মরুভূমির মতো। জনমানবের কোনো চিহ্ন নেই। ১৮ ঘণ্টায় ১৪০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাস ঠিকঠাকই পৌঁছল কেপটাউনে। বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মাহমুদুল হাসান শিপলুর বন্ধু মাসুদ থাকে কেপটাউনে। নিজের গাড়ি নিয়ে বাসস্টেশনে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল সে। বাসায় যাওয়ার পথে একচক্কর শহরটা ঘুরিয়ে দেখাল। কিছু এলাকায় গাড়ির পার্কিংয়ের জায়গা পাওয়াটা বেশ কঠিন। পাঁচ-ছয়বারের চেষ্টায় পার্ক করা যায়। ওর বাসার সঙ্গেই আছে একটি সুন্দর মসজিদ। মাসুদ জানাল, এই এলাকায় প্রচুর মুসলমান রয়েছে। বাংলাদেশির মালিকানাধীন ৫০টির মতো গ্রোসারির দোকান রয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হলো, পুরো দক্ষিণ আফ্রিকার মুদি ব্যবসার পুরোটাই বোধ হয় আমাদের দখলে। ওই দেশের প্রতিটি শহরে বাংলাদেশি গ্রোসারির দোকান পাওয়া যায়। যদিও জীবন এখানে অনেক অনিশ্চয়তায় ভরা, তার পরও দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যবসা করাটা সহজ হওয়ায় বাংলাদেশিরা মোটামুটিভাবে সফল। যদিও এখন ইমিগ্রেশন আইন অনেক কড়াকড়ি। এরই মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার পাসপোর্টধারী অনেক বাংলাদেশি অন্য দেশে চলে গেছেন।

দুপুরে খাবার খেয়ে মাসুদ বলল, বিকেলে ‘টেবিল মাউন্টটেন’-এর পাশে ‘সিগন্যাল হিল’-এ ঘুরতে যাব। সঙ্গী হিসেবে মাসুদের চাচাতো ভাই বাবলু। সে-ও দীর্ঘদিন ধরে আছে কেপটাউনে। আসার পথে একটা মাজার দেখলাম। কেপটাউনে মাজার যে আছে জানা ছিল না। যদিও পরে জেনেছি, ত্রিশটির মতো মাজার রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। এগুলোকে বলা হয় ‘ক্রেগমাত’।

বিশ-পঁচিশ মিনিটের মধ্যে ‘সিগন্যাল হিল’-এ চলে এলাম। এখান থেকে একসঙ্গে টেবিল মাউন্টটেন ও কেপটাউনের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত। এখানে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত দেখতে প্রচুর দর্শনার্থীর সমাগম হয়। এ ছাড়া জায়গাটাকে লোকে ‘লাভারস লেন’ও বলে থাকে। বিকেল হলেই প্রেমিক-প্রেমিকাদের দেখা মেলে এখানে।

সিগন্যাল হিল থেকে গেলাম ‘ক্যাম্পাস বে বিচ’। যাওয়ার রাস্তাটি অসাধারণ। টেবিল মাউন্টটেনের পাশেই এই সমুদ্রতীরের অবস্থান। যাত্রাপথে বেশ কিছু বিলাসবহুল বাড়িঘর নজর কাড়ল। শৌখিন ধনকুবেরদের বাড়ি। সাধারণত ছুটি কাটাতে এঁরা এখানে আসেন। অনেক বাড়িতে দেখলাম অফ সিজনের জন্য টু-লেট লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। অনেক গাড়ি ও বিদেশি পর্যটকদের সমাগম চোখে পড়ল সৈকতে। কেউ শুয়ে আছেন, কেউ বা কুকুর নিয়ে জগিং করছেন আবার কেউ মোবাইলে সেলফি তুলতে ব্যস্ত। চারদিকে মানুষ এবং সবাই বিচ বিনোদনে ব্যস্ত।

শুধু ঘুরলেই তো চলবে না, আর তাই পেটপূজার জন্য গেলাম নান্দোসে। দক্ষিণ আফ্রিকায় এটা বেশ জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড শপ। সত্যিই ওদের খাবার বেশ সুস্বাদু! দোকানগুলো খুবই সুন্দর, সার্ভিসও বেশ ভালো। মজার ব্যাপার হলো, খাবার শেষে আমাদের দুই লিটারের কোকা-কোলার অর্ধেকটা অব্যবহৃত ছিল, সেটি দিয়ে দেওয়া হলো ওয়েটারকে। সে তো ওটা পেয়ে দারুণ খুশি।

ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও নাকি ধান ভানে। বাঙালি-বাঙালি আড্ডা হবে না তা কি হয়? ওদের নিয়ে গেলাম স্থানীয় এক বাংলাদেশি ক্লাবে। ওখানে দল-মত-নির্বিশেষে কেপটাউনের বাংলাদেশিরা একত্রিত হয়, আড্ডা মারে, পুল খেলে। ওখানকার বেশির ভাগ লোকই দেখলাম শরীয়তপুর ও ফরিদপুর জেলার। সবার আন্তরিক ব্যবহার ও আতিথেয়তা ছিল মনে রাখার মতো। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ক্লাবটিতে রাজনৈতিক পোস্টারে ভরপুর থাকলেও দলীয় আলাপ-আলোচনার চেয়ে আড্ডা, খেলাধুলায় মশগুল সবাই।

পরদিন গেলাম উত্তমাশা অন্তরীপে। ইংরেজিতে অবশ্য জায়গাটাকে বলে ‘কেপ অব গুড হোপ’। সঙ্গী হিসেবে যোগ দিলেন অরুণ। মাসুদের বন্ধু। প্রথমেই ‘বোল্ডার বে বিচ’ গেলাম। ওখানকার ‘জ্যাকঅ্যাস পেঙ্গুইন’ দেখতে প্রতিবছর ৬০ হাজার পর্যটক আসেন। প্রবেশমূল্য ৭০ র‌্যান্ড। ভেতরে গিয়ে দেখতে পেলাম প্রচুর চীনা পর্যটক। কলকাতার এক বয়স্ক দম্পতিরও দেখা মিলল। এই সৈকতে অনেকে এক দিনের জন্য ক্যাম্প করে থাকেন। বড় বড় পাথরের পাশে ছোট ছোট পরিবারগুলো এক দিনের জন্য সংসার পাতে। পুকুরে গোসল করার মতো করে সাগরে যায় গোসল করতে।

ওখান থেকে এবার যাব উত্তমাশা অন্তরীপে। কেপ পয়েন্টে আসার পথে রাস্তার এক জায়গায় দেখলাম, সব গাড়ির গতি কমে যাচ্ছে। সামনে ভালো করে তাকাতেই দেখতে পেলাম, বেশ কিছু বানর রাস্তার মাঝখানে বসে আছে। মাসুদ সবাইকে সাবধান করে বলল—যার যার মোবাইল ও ক্যামেরা যেন পকেটে রেখে দিই, কারণ সুযোগ পেলেই এসব কেড়ে নিয়ে পালায় বানরগুলো। বাবলু আস্তে করে গাড়ির জানালা বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে উত্তমাশা অন্তরীপে এসে পৌঁছলাম। প্রবেশ করার জন্য টিকিট কাটতে হলো। চারদিকে বিশাল পাহাড়ের মাঝে গাড়ি দারুণ গতিতে ছুটে যাচ্ছে। দিগন্তজোড়া খালি মাঠ। দূর থেকে মনে হলো, আকাশে ছুঁয়ে আছে পাহাড়। প্রচুর দর্শনার্থীর আগমন হয়েছে। সিটি সাইট সিয়িংয়ের দ্বিতল বাসও প্রচুর। তবে বেশির ভাগই চীনা পর্যটক দিয়ে বোঝাই। আজকাল ওরাই নাকি দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি দেশ ভ্রমণ করে থাকে।

এখানে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগর এসে মিলেছে। নাবিকদের কাছে এই জায়গাটি বেশ বিখ্যাত। উত্তমাশা অন্তরীপের পার্কিংয়ে বাবলু বসে ছিল। তবে যাঁরা হেঁটে যেতে ইচ্ছুক নন, তাঁদের জন্য রয়েছে ট্রাম সার্ভিস। আমরা হেঁটেই ধীরে ধীরে ওপরে উঠে গেলাম। ওপর থেকে চোখে পড়ল নিচের মনোরম দৃশ্য। এককথায় অসাধারণ।

ছবি : লেখক


মন্তব্য