kalerkantho


আপনার সন্তান

শিশুর পরীক্ষাভীতি

অনেক শিশুরই পরীক্ষাভীতি থাকে। এই ভীতির কারণ এবং তা দূর করার উপায় জানা জরুরি। জানালেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট খাদিজা ফাল্গুনী

১ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



শিশুর পরীক্ষাভীতি

মাধ্যমিকে পড়া ঈষিতা লেখাপড়ায় খুব মনোযোগী। ছোট থেকেই মন দিয়ে পড়াশোনা করেছে।

কিন্তু কোনো দিনই সে অনুপাতে ভালো রেজাল্ট করতে পারে না। এর মূল কারণ পরীক্ষাভীতি। পুরো সিলেবাস শেষ করেও পরীক্ষার হলে গিয়ে ঠিকমতো লিখতে পারে না। পরীক্ষায় বসলেই তার মধ্যে অদ্ভুত ভীতি কাজ করে। প্রশ্নপত্র হাতে পেলেই হাত-পা ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এদিকে সব উত্তরই জানা থাকে। কিন্তু লিখতে পারে না। লিখতে লিখতে এই ভেবে টেনশন হয়, সময় চলে যাচ্ছে, এতে ভয় আরো বেড়ে যায়। এর ফলে এমনও হয়েছে যে শরীর খারাপ হয় এবং পরীক্ষা পুরো না দিয়েই হল থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। এ রকম ঘটনা ঈষিতার মতো অনেকের জীবনেই ঘটে।

স্কুল-কলেজপড়ুয়াদের পরীক্ষা নিয়ে টেনশন নতুন কিছু নয়। যেসব স্কুলে বছরে একটি বা দুটি প্রধান পরীক্ষার ফল অনুযায়ী ছাত্র-ছাত্রীর অর্জিত জ্ঞান মাপা হয়, সেসব স্কুলের ছেলে-মেয়ের মধ্যে পরীক্ষাভীতি বেশি দেখা যায়। তুলনায় যেসব স্কুলে নিয়মিত ক্লাস টেস্টের ব্যবস্থা থাকে, অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষার মতো ক্লাস টেস্টের রেজাল্টকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানকার পড়ুয়ারা পরীক্ষা নিয়ে তেমন উৎকণ্ঠায় ভোগে না।

সব ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার ধরন একরকম নয়। আইকিউর দিক থেকে মাঝারি বা খাটো পড়ুয়ারা কোনো কিছু জানার ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহী হয় না। পড়ার বই তো বটেই, গল্পের বই পড়ার ক্ষেত্রেও তাদের অনীহা থাকে। তাদের মধ্যে অনেকে নিচু ক্লাসে ভালো রেজাল্ট করলেও যতই ওপরের ক্লাসে উঠতে থাকে, ততই তাদের রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে।

সারা দিন বই খুলে বসে থাকলেও পরীক্ষার সময় কিছুতেই সুবিধা করতে পারে না। স্বাভাবিক বুদ্ধির ছাত্র-ছাত্রীর একদল সারা বছরই কমবেশি খাটে, ফলে তারা পরীক্ষার সময় বাড়তি কোনো টেনশনে ভোগে না। অন্য দল সারা বছর ফাঁকি দিলেও পরীক্ষার কিছুদিন আগে থেকে দিন-রাত এক করে পড়াশোনা করে। যেহেতু অল্প কিছুদিনের মধ্যে অনেকটা পড়া তৈরি করতে হয়, ফলে তাদের অনেকেই পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারবে কি না তা নিয়ে আশঙ্কায় থাকে। বুদ্ধির দিক থেকে যারা উঁচু ধাপে থাকে, পড়ার পেছনে অনেক কম সময় দিয়েও তারা ভালো রেজাল্ট করার ক্ষমতা রাখে। মজার কথা, পড়াশোনার নিজস্ব ধরন-ধারণটা ছেলে-মেয়েরা সাধারণত পাল্টাতে চায় না। পরীক্ষায় টেনশনের মুহূর্তে যারা প্রতিজ্ঞা করে, পরের বছর থেকে তারা নিয়মিত পড়াশোনা করবে। কিন্তু পরীক্ষা শেষ হতেই তা তারা বেমালুম ভুলে যায়।

 

কারণ

তবে ঈষিতার মতো যারা, তাদের বিষয় অন্য। কারণ নিয়মিত পড়াশোনা করেছে এবং ক্লাসে সব সময় ঠিকঠাক পড়া পেড়েছে। পরীক্ষা নিয়ে তাদের ভীতির পেছনে পরিবেশের বড়সড় প্রভাব রয়েছে। বাবা বা মা যদি উৎকণ্ঠাপ্রবণ হন, যদি ছোটবেলা থেকেই ভালো রেজাল্ট করার ব্যাপারে চাপ দেয়। যদি অন্যের সঙ্গে বারবার তুলনা করে। যদি নিজেই অন্যদের সঙ্গে তুলনা টেনে হীনম্মন্যতায় ভোগে, তাহলে পরীক্ষাভীতি তার মধ্যে পাকাপাকিভাবে থাকাটাই স্বাভাবিক। তারা যতই প্রস্তুতি নিক না কেন, আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগবে, মনে হবে পুরনো পড়া বুঝি ভুলে যাচ্ছে, পরীক্ষায় জানা প্রশ্নগুলো বোধ হয় একটাও আসবে না অথবা এলেও কিছু মনে পড়বে না। এমন একটা টানাপড়নের মধ্যে পরীক্ষা দিতে বসলে ফল ভালো হবে না, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

সমাধান

ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনার জন্য অনেক পরীক্ষা দিতে হবে। তাই পরীক্ষার ভয় কাটানো তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য বারবার লেখার ওপর জোর দিতে হবে। প্রাইভেট শিক্ষক, কোচিং বা পরিবারে কারো কাছে বারবার ‘মডেল টেস্ট’ দিতে হবে। অন্যের সঙ্গে পড়ার বিষয়ে নিজেকে প্রতিযোগিতায় শামিল না করা; বরং কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে মিলে কোনো কোনো বিষয়ে গ্রুপ স্টাডি করা। বাড়িতে ঘড়ি ধরে পরীক্ষার উত্তর লেখার প্রস্তুতি নেওয়া। সবার আগে আমি পারি এই আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে।

 

ভীতি কাটাতে

 

♦          রুটিনমতো পড়াশোনা করতে হবে। পড়াশোনার জন্য নির্দিষ্ট সময় ভাগ করে নেওয়া। রাত জেগে পড়াশোনা করা অনেকে কঠোর ও কার্যকর প্রস্তুতির নির্দেশক মনে করলেও আদতে সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা- এ সময়টুকুই পড়াশোনার জন্য বেছে নেওয়া ভালো। রাত হবে ঘুমের জন্য। দিন-রাত টানা পড়াশোনা করা উচিত নয়। মস্তিষ্কের বিশ্রাম প্রয়োজন। লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শুধু পড়লেই হবে না। সময় ধরে উত্তর লেখার চর্চা করতে হবে। সুযোগ থাকলে অন্যের সঙ্গে আলোচনা করে পড়া যেতে পারে, অন্যের পড়া শোনা এবং পঠিত বিষয় নিয়ে আলোচনা  করলে পড়া মনে রাখতে সুবিধা হয়।

♦          কিছু সময় রাখতে হবে সুস্থ বিনোদনের জন্যও। বিশ্রাম-বিনোদনহীন একঘেয়ে পড়াশোনা মস্তিষ্ক ক্লান্ত করে দেয়।

♦          শারীরিক সচলতার দরকার আছে। প্রতিদিন নিয়ম করে কিছুটা সময় হালকা শরীরচর্চা করা উচিত। এই শরীরচর্চা  দেহের উপকারী নানা হরমোনের নিঃসরণ ঘটিয়ে শারীরিক ও মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করে।

♦          সুষম খাবার গ্রহণ করা উচিত। মস্তিষ্ক সুস্থ ও কার্যকর রাখার জন্য শাকসবজি, ফল, দুধ, ডিম খাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত চা-কফি পান এ সময় নিদ্রাহীনতা,   কোষ্ঠকাঠিন্যসহ নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। কফির ক্যাফেইন চিন্তাশক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। অতিরিক্ত চা-কফি এড়িয়ে চলতে হবে।

♦          অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষাভীতি ও মানসিক অস্থিরতা কমাতে ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

 

 

কেন্দ্রে করণীয়

♦          পরীক্ষার হলে ঢোকার আগে নতুন কোনো বিষয় পড়তে যাওয়া ঠিক নয়। অন্য শিক্ষার্থী বা বন্ধুদের প্রস্তুতি কেমন, কে কী পড়েছে, প্রশ্ন  কেমন কঠিন হতে পারে—এসব বিষয় আলোচনা করা উচিত না। এতে উদ্বেগ বাড়বে।

♦  প্রশ্ন্নপত্র হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকার সময় বা উত্তর লেখা শুরু করার আগে ধীরে লম্বা গভীর করে কয়েকবার শ্বাস নেওয়া যেতে পারে। সহজ এই কাজটি উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করবে।

♦          কঠিন প্রশ্ন দেখে ঘাবড়ে যাওয়া চলবে না। কঠিন প্রশ্নগুলো নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট না করে  যেসব প্রশ্নের উত্তর সহজতর, সেগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে শেষদিকে। ইতিমধ্যে বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া হয়ে যাওয়ায় আত্মবিশ্বাস বাড়বে, মস্তিষ্কও কার্যকর থাকবে, উত্তর লেখা সহজ হবে।

♦          পরীক্ষার হলে খাতার ওপর পূর্ণ মনোযোগ রাখতে হবে। অন্যরা কী করছে, কেমন লিখছে,  কে কতগুলো অতিরিক্ত পৃষ্ঠা নিল—এসব ব্যাপারে মনোযোগ দেওয়ার দরকার নেই।

♦          এক বিষয়ের পরীক্ষা শেষে কী ভুল হলো মেলানোর প্রয়োজন নেই। যা লিখে আসা হয়েছে, পরীক্ষা শেষে আর পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। সুতরাং বাড়ি ফিরে পরবর্তী বিষয়ে মনোযোগ দেওয়াই ভালো।


মন্তব্য