kalerkantho


টিনের রূপ রুটিন

স্বাস্থ্যসচেতনতা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও সু-অভ্যাস গড়ে তোলার শিক্ষা টিনএজ বা কৈশোরকালেই দিতে হয়। কারণ এর ওপরই নির্ভর করে পরবর্তী জীবনের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলতা। টিনদের সুন্দর থাকার উপায় বাতলে দিলেন রূপবিশেষজ্ঞ আফরোজা পারভীন

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



টিনের রূপ রুটিন

মডেল : মারিয়া সাজ : শোভন মেকওভার স্কিন স্টুডিও ছবি : কাকলী প্রধান

টিন সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটা মানুষের জন্য। এই বয়সের প্রভাব পরবর্তী জীবনে ছাপ ফেলে। তাই পারসোনাল ও বিউটি কেয়ার দুটোই শিখতে হয় একজন টিনকে। এর জন্য মা-বাবা বা পরিবার-পরিজনেরও ভূমিকা রাখতে হয় কম-বেশি।

 

পারসোনাল কেয়ার

নিজেকে জানতে শেখান

অনেক মা-বাবা আছেন টিন সন্তান কী করে নিজের যত্ন নিজে নেবে তা শেখান না। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে কোনো জ্ঞানই দেন না। মনে করেন সন্তান এমনিতেই দেখে দেখে শিখে ফেলবে। এর ফলে কেউ প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিখে নিজের বিড়ম্বনা ডেকে আনে। আর কেউ উদাসীন থেকে নিজের ক্ষতি করে। এই বয়স থেকে নিজের যত্ন নেওয়া না শিখলে একটু বয়স বাড়লে যে রোগ-ব্যাধিগুলো হবে তার মুখোমুখি হওয়াও কঠিন।

 

খাওয়াদাওয়ায় উদাসীনতা কিংবা অতিরিক্ত খাওয়া

অনেক টিনের মধ্যে রাগ বা অভিমান করে না খেয়ে থাকাটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আবার কারো কারো জাংক ফুডে আসক্তি দেখা যায়। কেউ আছেন সময়মতো খাবেন না। ক্লাস, পরীক্ষা, কোচিং—এসবের অজুহাত দিয়ে খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম করেন। এসব বাজে অভ্যাসের কারণে গ্যাস্ট্রিক, এসিডিটি এই বয়সেই হয়ে যায়। শরীরে পুষ্টি ঘাটতি দেখা দেয়। উচ্চতা বাড়ে না। সুগঠিত ফিগারও হয় না।

 

জাংক ফুড কম খান

বিভিন্ন হরমোনাল কারণে এমনিতেই এই বয়সে ব্রণ, র‌্যাশ ইত্যাদি হয়। আর এই সমস্যা বেশি হয় যখন অতিরিক্ত জাংক ফুড খাওয়া হয়। অনেক টিন আছেন ব্রণ হয়েছে আর তা দূর করার জন্য বয়সের আগেই ফেসিয়াল করেন কিংবা ব্রণ নিরাময়ের জন্য নানা ধরনের ক্রিম ব্যবহার করেন। অথচ এসব কোনো কিছুই ব্রণ কমাতে পারে না। যদি না শরীরের ভেতর থেকে পরিষ্কার রাখা না যায়। তাই এসব না করে তেল-চর্বি আর রিচ জাংক ফুড খাওয়া কমাতে হবে।

 

প্রতিদিন আড়াই লিটার পানি পান

জানেন, বোঝেন কিংবা সবাই বারবার বলার পরও পানি খান না? অথচ এক সপ্তাহ প্রতিদিন ২ লিটার পানি খেয়ে দেখতে পারেন চুল, ত্বক আর স্বাস্থ্যে কী পরিবর্তন আসে। পানি শরীর থেকে টক্সিন বের করে দিয়ে ত্বকের ব্রণ ও র‌্যাশ হওয়ার আশঙ্কা কমিয়ে দেয়।

 

চুল পড়ছে

টিন বয়সে চুল পড়লে বুঝতে হবে শরীরে দরকারি পুষ্টির ঘাটতি রয়েছে। খাবারের মাধ্যমে শরীর যে অল্পটুকু পুষ্টি পায় সেটা চুলের পেছনে খরচ না হয়ে দেহের অন্যান্য জরুরি কাজে ব্যয় হয়। আর তখনই চুল পড়তে শুরু করে। জেনে রাখবেন মিনারেল আর পুষ্টির অভাবেই মূলত চুল পড়ে। তাই চুলের যত্নে নানা ধরনের হেয়ার ট্রিটমেন্ট, ক্যাস্টর অয়েল, অলিভ অয়েল, মেহেদি, ডিম মাখলেও চুল পড়া কমবে না। বরং ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে খাবারের মাধ্যমে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি দূর করতে হবে।

 

অবশ্যই ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম

শরীরের জন্য যেটুকু ঘুম দরকার হয় সেটা না ঘুমিয়ে মোবাইল, কম্পিউটার, টিভি অথবা পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকলে দেহের বৃদ্ধি প্রতিহত হয়। অন্যদিকে ত্বক ও চুলে নানা সমস্যা দেখা দেয়। ক্ষুধামান্দ্য ভাব দেখা দেয়। তাই রুটিনমতো জীবন যাপন ও নিয়ম করে ঘুমাতে হবে। না ঘুমিয়ে চোখের নিচে কালো দাগ ফেলে শসার টুকরা, আই ক্রিম মাখলেও চোখের সৌন্দর্য ফিরে আসবে না। ত্বক ও চুলও ভালো থাকবে না।

 

বিউটি কেয়ার

ত্বকের যত্ন কতটুকু

সকালে ঘুম থেকে উঠে সরাসরি মুখ না ধুয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টিস্যু পেপার মুখে চেপে ধরে থাকুন ১০ সেকেন্ড। এরপর টিস্যুটি ভালো করে দেখুন। যদি টিস্যুর কোথাও তেলের ছাপ না থাকে তবে বুঝবেন আপনার ত্বক শুষ্ক, যদি শুধু নাকে এবং কপালের অংশটুকুতে তেলের ছোপ থাকে, বাকিটা শুষ্ক তবে তা মিশ্র ত্বক, আর যদি কপাল, থুতনি ও নাকসহ নাকের আশপাশে তেলের ছোপ থাকে তবে আপনার ত্বক পুরোপুরি তৈলাক্ত।

অন্যদের মতো টিনদের ত্বকেরও প্রতিদিনই যত্ন নিতে হবে। ভাবছেন প্রতিদিন যত্ন কী করে সম্ভব! আসলে এখন থেকে নিয়মিত ত্বকের যত্ন না নিলে, পরিচর্যার উপায় জানা না থাকলে একটু বড় হয়ে যত যত্নই করুন না কেন, ত্বকের সমস্যা থেকেই যায়। শুরুতেই ত্বক কী করে পরিষ্কার করতে হয় এটা জানতে হবে।

 

ত্বক পরিষ্কার

মুখের ত্বক প্রতিদিন পরিষ্কার করাটা কতটা জরুরি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ত্বক পরিষ্কার করতে কী ব্যবহার করছেন তার থেকে জরুরি কিভাবে পরিষ্কার করছেন। খুব বেশি বাইরে থাকতে হলে সকালে, দুপুরে ও রাতে অর্থাৎ তিন বেলায়ই ত্বক পরিষ্কার করতে হবে। তবে ত্বক যদি শুষ্ক হয় তাহলে সকালে ও রাতে পরিষ্কার করলেই যথেষ্ট। মুখের ত্বক পরিষ্কার করার আগে হাত ভালো করে পরিষ্কার করে নিতে হবে। সাধারণত অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে হাত পরিষ্কার করা ভালো। এরপর হাতে অল্প পরিমাণে ফেসওয়াশের সঙ্গে সামান্য পানি দুই হাতের তালুতে নিয়ে ফেসওয়াশ ঘষে ফেনা তৈরি করুন। তারপর মুখে লাগান। মনে রাখবেন মুখে ফেসওয়াশ লাগিয়ে ত্বকে ঘষে ফেনা তৈরির চেষ্টা করবেন না। এতে ত্বকে অতিরিক্ত টান পড়ে চামড়া ঝুলে ত্বকে ভাঁজ পড়তে পারে। এবার তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম আঙুল দিয়ে আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো মুখে ফেনা ম্যাসাজ করুন। এক হাত দিয়ে মুখ পরিষ্কারের কাজটি করবেন না। আর দ্বিতীয় আঙুল ব্যবহার করবেন না। কারণ এই আঙুলটিতে অনেক জোর থাকে। ত্বকে অযথা চাপ তৈরি করে। তাই দ্বিতীয় আঙুল বাদ দিয়ে পরের আঙুল ব্যবহার করবেন। এক মিনিট ম্যাসাজের পর ধুয়ে ফেলুন। সাধারণ তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করুন। যাঁদের ত্বক তৈলাক্ত ও ব্রণ আছে, তাঁরা এভাবে দুবার ত্বক পরিষ্কার করুন। তবে দুবার ত্বক পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে ত্বকে ক্লিনজার ১ মিনিটের বেশি রাখবেন না। এতে ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে ইরিটেশন তৈরি হয়। মুখ ধোয়ার পর মুখ না মুছে এমনিই শুকাতে দিন। এতে ত্বকে ব্রণ ও হোয়াইট হেডস হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।

 

চুলের যত্ন

ত্বকের ধরনের ওপর চুলের ধরনও অনেকটা নির্ভর করে। তবু যদি দেখেন চুল একদিন শ্যাম্পু না করলেই তেল চিটচিটে এবং স্কাল্প তৈলাক্ত হয়ে গেছে, তবে আপনার চুল তৈলাক্ত। আর যদি চুলের রং লালচে হয়ে যায় এবং চুলের আগা ফাটা থাকে, তবে চুল শুষ্ক।

অনেকের এমনও হতে পারে যে চুলের আগা অনেক ফাটে এবং স্কাল্প অনেক বেশি তৈলাক্ত। এ ধরনের চুল মিশ্র। তাই শ্যাম্পু বাছাইয়ে চুলের ধরন ও চুলের সমস্যা দুটি দিকই বিবেচনা করতে হবে। চুলের স্বাস্থ্য ভালো করতে কী ধরনের শ্যাম্পু দরকার, তা জানা প্রয়োজন। প্রোটিনসমৃদ্ধ শ্যাম্পু যেমন ‘এগ প্রোটিন’ শ্যাম্পু শুষ্ক চুলের জন্য ভালো। আমলাসমৃদ্ধ শ্যাম্পু ভালো, শুষ্ক ও মিশ্র প্রকৃতির চুলের জন্য। আর তৈলাক্ত চুলের জন্য এমন শ্যাম্পু এড়িয়ে চলতে হবে, যেগুলো অতিরিক্ত পুষ্টি দেয়। যেমন আমন্ডসমৃদ্ধ যেকোনো শ্যাম্পু, তেল, কন্ডিশনার এড়িয়ে চলুন। না হলে তৈলাক্ত চুলে ঝরঝরে ভাব আসবে না। ভেষজ শ্যাম্পুগুলোও ব্যবহার করতে পারেন।

 

কন্ডিশনার

কন্ডিশনার চুলকে ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। তাই চুল যে ধরনেরই হোক, কন্ডিশনার সবারই ব্যবহার করা উচিত। খুশকিযুক্ত ও তৈলাক্ত চুলের অধিকারীরা নিয়মিত কন্ডিশনার ব্যবহার না করলেও চলবে। তৈলাক্ত চুলের জন্য প্রতিবার শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার ব্যবহার না করে কয়েকবার বিরতি দিয়ে ব্যবহার করুন। আলাদা কন্ডিশনার ব্যবহার না করে কন্ডিশনারযুক্ত যেসব শ্যাম্পু আছে, তাও লাগাতে পারেন। বাজারে তেলসমৃদ্ধ শ্যাম্পুও পাওয়া যাচ্ছে, শুষ্ক চুলের জন্য সেসব শ্যাম্পু বেছে নিতে পারেন।

 

হেয়ার প্যাক

টিনদের খুব বেশি চুল পড়লে বাড়িতে বানানো হেয়ার প্যাক ব্যবহার করতে পারেন। তিলের তেল চুলপড়া রোধে খুব উপকারী। চুলপড়া কমাতে ও ক্ষতিগ্রস্ত চুলের যত্নে করতে পারেন অয়েল ম্যাসাজ আর হট টাওয়াল ট্রিটমেন্ট। সপ্তাহে এক দিন ঘরেই প্যাক বানিয়ে লাগানো যায়। রুক্ষ ও শুষ্ক চুলকে স্বাস্থ্যকর ও উজ্জ্বল করতে দুই রকম প্যাক ব্যবহার রয়েছে। যেমন—অর্ধেকটা পাকা পেঁপে ও ১ কাপ টক দই মিশিয়ে ২০ মিনিট চুলে লাগিয়ে শ্যাম্পু করে ফেলুন। আবার মিশ্র ফলের প্যাক তৈরির জন্য পেঁপে, কলা, আপেল, অ্যাভোকাডো একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। এটি ২০ মিনিট চুলে রেখে ধুয়ে ফেলুন। চাইলে ২ চা চামচ মধুও দিতে পারেন। তৈলাক্ত চুলের জন্য মিশ্র ফলের প্যাকে কলা, পেঁপে ও অ্যাভোকাডো বাদ দিতে হবে। বদলে গাজর দিতে পারেন বেশি করে।


মন্তব্য