kalerkantho


অন্য কোনোখানে

ভাস্কো দা গামার শহরে!

আসিফ সিদ্দিকী   

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ভাস্কো দা গামার শহরে!

মুম্বাই থেকে মাত্র ৪০ মিনিটে গোয়া। বিমানবন্দরে নামার আগেই বিমানের ঝাঁকুনি। কেবিন ক্রুর সিটবেল্ট বাঁধার নির্দেশনা শুনেই বুঝতে পারলাম, বাইরে আবহাওয়া খারাপ। মেঘের পর মেঘ ভেদ করে বিমান যতই নিচের দিকে নামতে লাগল, ততই গোয়ার স্থলভাগের ছবিটা স্পষ্ট হচ্ছিল। ওপর থেকে দেখছি বিশাল আরব সাগর এবং অপর পাশে সবুজ সব পাহাড়। সবুজের মাঝখানে খুব কমই জনবসতির দেখা মিলল। বিমান যখন রানওয়ে স্পর্শ করল, তখন বাইরে বেশ বৃষ্টি। রানওয়ে থেকে বিমানটি বোর্ডিং ব্রিজে গিয়ে থামার আগে অন্য রকম এক দৃশ্য চোখে পড়ল। বিমানবন্দরের মাঝখান দিয়ে গাড়ি চলাচল করছে!

প্রথমে মনে হচ্ছিল, সেগুলো বুঝি বিমানবন্দরের কোনো নিরাপত্তাকর্মীদের গাড়ি। কিন্তু সেই ভুল ভাঙল একটু পরই। গাড়ির জন্য বিমানের থেমে যাওয়ার এ দৃশ্য দেখে বেশ অবাকই হলাম।

রানওয়ে দিয়ে কেন গাড়ি চলাচল করছে? জানতে শেষ পর্যন্ত জেট এয়ারওয়েজের বিমানকর্মীদের শরণাপন্ন হলাম। তাঁরা জানালেন, বিমানবন্দরের ওপারে পাহাড়ের মধ্যে ভারতের নৌবাহিনীর একটি ঘাঁটি রয়েছে। সেখানকার কর্মীদের চলাফেরার জন্য এ ব্যবস্থা!

বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কার্যক্রম শেষে বাইরে বের হতে গিয়ে চোখে পড়ল একটি মানচিত্র। ওটার এক জায়গায় টিক চিহ্ন দিয়ে লেখা ‘ইউ আর হিয়ার, ভাস্কো দা গামা’। বুঝে উঠতে পারিনি, এখানে আবার গামা মশাই কোথা থেকে উদয় হলেন?

স্কুলের পড়ার বই থেকে প্রথম জেনেছিলাম পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামার কথা। জাহাজে করে ইউরোপ থেকে সমুদ্রপথে ১৪৯৮ সালের ২০ মে প্রথমবার ভারতের অঙ্গরাজ্য কেরালার কালিকট বন্দরে পৌঁছেন এই নাবিক। কিন্তু তাঁর নামে যে দক্ষিণ গোয়ায় একটা আস্ত শহর আছে, তা জানতাম না। পরে জেনেছি, গোয়া প্রদেশের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা হচ্ছে এই ‘ভাস্কো দা গামা সিটি’। পাশেই রয়েছে গোয়ার প্রধান ও সবচেয়ে বন্দর মরমুগাও। ভ্রমণ মৌসুমে ইউরোপ থেকে বিশাল যাত্রীবাহী (ক্রুজ) জাহাজ ভাড়া করে ভ্রমণপিপাসুরা এ বন্দরে হাজির হন।

ভাস্কো দা গামা সিটিটা সাগরের পাশে। আর সাগরের অনেকটা কাছেই গোয়া বিমানবন্দরও। পাশেই রয়েছে রেল নেটওয়ার্ক। ফলে রেল, সড়ক, সমুদ্র ও বিমানপথের সঙ্গে বহুমুখী যোগাযোগ রয়েছে এই শহরের। বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে দক্ষিণ বা উত্তর—যে দিকেই যান, চলতি পথেই চোখে পড়বে সারি সারি নারিকেলগাছ। আর সড়কগুলো সাগরের লাগোয়াই বলা চলে। তাই সাগরের পাশ ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে সব কটেজ, অভিজাত হোটেল ও রেস্তোরাঁ। বাড়িগুলোর ওপরের ছাদ সাজানো হয়েছে মাটির টালি দিয়ে। তবে সব ভবনই দুই থেকে তিনতলার বেশি নয়। এমনকি র্যাডিসন ও গ্র্যান্ড হায়াতের মতো পাঁচতারকা হোটেলও কটেজ টাইপের! চারতলার বেশি নয়।

কৌতূহলী মনের প্রশ্নের জবাব খুঁজতে শরণাপন্ন হলাম গাড়িতে থাকা ভ্রমণসঙ্গী তপন চক্রবর্তীর। তিনি বললেন, ‘গরম থেকে বাঁচতে বোধ হয়!’ তবে বিষয়টা নিশ্চিত করল আমাদের গাড়ির চালক জন গোমেজ। সে জানাল, গরম থেকে বাঁচতে তাদের পূর্বপুরুষরা এই কৌশলে ঘর-বাড়ি-কটেজ বানিয়েছেন। প্রচণ্ড গরমে প্রাকৃতিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আর কি! কথায় কথায় আরো জানাল, গোয়ায় ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এ তিন মাস বিদেশি পর্যটকে সরগরম থাকে গোয়া। আর বছরের বাকিটা সময় থাকে একেবারে নিস্তব্ধ কোলাহলমুক্ত। পর্যটন মৌসুমের তিন মাসের আয় দিয়েই বছরের বেশির ভাগ সময় পার করতে হয়। তাতে না চললে পেশা পরিবর্তন করতে হয় শেষমেশ।

সড়কপথে যাচ্ছি বিমানবন্দর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের কেবলোসিম সমুদ্রসৈকতে। চলার পথে চোখে পড়ল একের পর এক দৃষ্টিনন্দন গির্জা। বেশির ভাগই শত বছরের পুরনো। বুঝতে বাকি রইল না গোয়া খ্রিস্টানপ্রধান এলাকা। চলতি পথেই বিলবোর্ড, পোস্টারে ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি চোখে পড়ল আরেকটি ভাষা। দেখে মনে হচ্ছিল ইউরোপীয় কোনো ভাষা!

আমাদের আরেক সঙ্গী ডাক্তার আসিফ আহমেদ খান গাড়িচালকের সঙ্গে বাতচিত করে নিশ্চিত করলেন—ভাষাটা রুশই। কথা প্রসঙ্গেই জানা গেল, প্রতিবছর যত পর্যটক গোয়ায় আসে তার ৫৫ শতাংশই রুশ। তাদের সুবিধার কথা ভেবেই বিলবোর্ড থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁর মেন্যুতে থাকে রুশ ভাষার উপস্থিতি। ডান্স ক্লাবে রুশ গানের পাশাপাশি সমুদ্রসৈকতেও শোনা যায় রুশ ভাষায় পণ্য বিক্রির হাঁকডাক। ভারতীয়দের এই রুশ ভালোবাসার পেছনে অর্থটাই মূল কথা। কেননা প্রতিবছর ৬০ হাজার রুশ গোয়ায় আমোদ-ফুর্তি করতে হাজির হয়!

গোয়া প্রদেশের এক পাশের পুরোটাই আরব সাগরের লাগোয়া। এই বিশাল সাগরতীরবর্তী এলাকায় আছে ৩৫টির বেশি সৈকত। প্রতিটির সৌন্দর্য প্রায় কাছাকাছি হলেও বিনোদন সুবিধায় ভিন্নতা রয়েছে। ফলে নিজের জন্য যথাযথ সৈকত বাছাই করাও পর্যটকদের জন্য একটি কঠিন বিষয়। সৈকতে একজন বিদেশি পর্যটকের জন্য যত রকম বিনোদন প্রয়োজন, তার সবই আছে গোয়ার সৈকতে। সেই বিনোদন উপভোগের জন্য নেমে পড়লাম সৈকতে। হাজারো নারী-পুরুষের ‘রৌদ্রস্নান’ উপভোগের দৃশ্যের মধ্যে আমাদেরই খানিকটা বেমানান লাগছিল!

পর্যটন মৌসুমে সৈকতেই গড়ে ওঠে লাইভ রেস্টুরেন্ট। যেখানে থাকে সামুদ্রিক মাছের বাহারি খাবারদাবারের ব্যবস্থা। বালুর ওপর ফেলে রাখা বেতের সোফায় বসে গেলাম আমরাও। সামুদ্রিক মাছ ভাজা সহযোগে লাঞ্চ করতে করতে সাগর দেখার মজাই আলাদা।

এ তো গেল দিনের মজা। রাত যতই বাড়ে, নাইট ক্লাবের গানের মূর্ছনায় মুখরিত হয়ে জেগে ওঠে গোয়া। যেন আরেক গোয়া। আর সেই গোয়ার কথা না হয় তোলা থাকুক আরেক দিনের জন্য?

 

কিভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে সরাসরি বিমানে গোয়া যাওয়া যায়। আড়াই ঘণ্টার যাত্রায় ভাড়া ছয় হাজার রুপি। মুম্বাই হয়েও গোয়া যাওয়া যায়। এ ছাড়া গোয়া যাওয়ার একমাত্র ট্রেন হচ্ছে ‘অমরাবতী এক্সপ্রেস’। সোম, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় ছেড়ে পরদিন বিকেলে পৌঁছে সেই ট্রেন। এ ছাড়া মুম্বাই অথবা পুনে থেকেও গোয়া যাওয়া যাবে।


মন্তব্য